ছুরি দিয়ে ড্যামিয়েনের চেহারায় যে-আঘাত করা হয়েছে, তার ফলে উপড়ে গেছে ওর একটা চোখ, সেদিকের চামড়া অনেকখানি কেটে গিয়ে ঝুলে আছে মুখের উপর। আরও যেসব আঘাত করা হয়েছে ওকে, সেগুলো হয়তো ওর কাপড়ের কারণে বোঝা যাচ্ছে না, তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, যে-ই করে থাকুক খুনটা, পাগলের মতো ছুরি চালিয়েছে সে ড্যামিয়েনের উপর। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে ওর, ফলে একদিকের গাল লেগে আছে মেঝের সঙ্গে; এই অবস্থায় ওর মাথাটা দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে বাতাস বেরিয়ে-যাওয়া কোনো চুপসানো ফুটবলের কথা। জীবিত অবস্থায় যে-রকম ছিল, খুন হওয়ার পর মোটেও সে-রকম দেখাচ্ছে না ওকে। ওর কাপড় আর কালো চুল দেখে ওকে চিনে নিতে হচ্ছে আমার।
রক্তের গন্ধে কেমন যেন ভরাট হয়ে গেছে আমার নাক। মনে হচ্ছে, এমন কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে এইমাত্র গভীর করে কোনো গর্ত খোঁড়া হয়েছে, ফলে মাটির গন্ধ পাচ্ছি। রক্তের গন্ধ যে ও-রকম, আগে কখনও জানা ছিল না। কিন্তু বিচ্ছিরি এই গন্ধ যেন বড় বেশি পেয়ে বসছে আমাকে। ফ্ল্যাটের ভিতরটা গরম, জানালাগুলো বন্ধ, দেয়ালগুলো কেমন যেন বেঁকে আসছে আমার দিকে…
‘টনি? কী হয়েছে? যিশুর দোহাই লাগে…
জানি না কেন, কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। আমার মাথার পেছনদিকটা কেমন যেন ব্যথা করছে। আমার উপর ঝুঁকে আছে হোথর্ন। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুললাম, কিন্তু থেমে গেলাম। না, জ্ঞান হারাতে পারি না আমি। সেটা অসম্ভব। যা ঘটছে আমার সঙ্গে, তা পাগলামি হয়ে যাচ্ছে। বিব্রতকর একটা অবস্থায় পড়তে যাচ্ছি।
শেষপর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
১৩. নরা মানুষের জুতো
‘টনি? আপনি ঠিক আছেন?’
আমার উপর ঝুঁকে আছে হোথর্ন, আমার দৃষ্টিপথের পুরোটা জুড়ে দিয়েছে। তবে তেমন একটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে না ওকে। বরং, মনে হচ্ছে, হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, বীভৎস, ক্ষতবিক্ষত, এবং এখনও-রক্ত-পড়ছে এ-রকম কোনো লাশ দেখে জ্ঞান হারানোটা যেন অদ্ভুত কোনো ব্যাপার ওর কাছে।
সে জিজ্ঞেস করেছে, আমি ঠিক আছি কি না। না, ঠিক নেই আমি। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছি ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটের মেঝেতে, মাথায় ব্যথা পেয়েছি। রক্তের গন্ধে এখনও যেন বন্ধ হয়ে আছে আমার নাক। সেই রক্তের উপরই পড়ে গেছি কি না, ভেবে কেমন যেন আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। না-দেখেও টের পেলাম চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে আমার। নিজের আশপাশের খানিকটা জায়গা হাতড়ালাম। না, আমার আশপাশ শুকনোই আছে।
‘আমাকে উঠতে বসতে সাহায্য করতে পারেন?’ বললাম হোথৰ্নকে।
‘অবশ্যই।’ দ্বিধা করল সে, কিন্তু তারপর আমার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিল আমাকে।
আশ্চর্য, দ্বিধা করল কেন সে? হঠাৎ করেই প্রশ্নটা জাগল আমার মনে… নতুন কোনো উপলব্ধি হলো যেন। এই কেসের তদন্তের সময় এবং আমার রিসার্চের কাজে আমাকে যে-ক’দিন সাহায্য করেছে সে, আমাদের মধ্যে শারীরিক সংস্পর্শ বলতে গেলে ঘটেনি। একবারও আমার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কি না, সন্দেহ। কারও সঙ্গেই হাত মেলাতে, অথবা অন্য কোনো রকম শারীরিক সংস্পর্শে যেতে দেখিনি আমি ওকে। তা হলে সে কি একজন জার্মোফোব… মানে, জীবাণুভীতি আছে ওর? নাকি পুরোপুরি অসামাজিক কেউ? যেটাই হোক, সমাধান করার জন্য নতুন আরেকটা রহস্য জুটল আমার কপালে।
একধারে কয়েকটা লেদার আর্মচেয়ার আছে, একটাতে বসে পড়লাম। ড্যামিয়েন ক্যুপারের লাশ আর রক্ত থেকে দূরে সরে এসেছি।
‘পানি খাবেন?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।
‘না। আমি ঠিক আছি।’
‘বমি-টমি করে দেবেন না তো? এই জায়গা এখন একটা ক্রাইম এরিয়া, এটা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’
‘না, বমি করবো না।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘কারও লাশ দেখাটা চমৎকার কোনো কাজ না। আর… দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুনি তার ঝাল ঝেড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারের উপর।’ মাথা নাড়ল। ‘লাশ ক্ষতবিক্ষত করে ফেলার ঘটনা আগেও দেখেছি। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাশের চোখও উপড়ে ফেলা হয়েছিল…
‘ধন্যবাদ!’ টের পেলাম, বিবমিষা জেগে উঠছে আমার ভিতরে। লম্বা করে দম নিলাম।
‘কেউ একজন প্রচণ্ড ঘৃণা করত ড্যামিয়েন ক্যুপারকে।’
‘বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা,’ বললাম আমি। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর গ্রেস কী বলেছে, মনে পড়ে গেল। ‘পূর্বপরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে, ঠিক না? কেউ একজন ওই মিউযিক প্লেয়ারটা রেখে দিয়েছিল কফিনের ভিতরে। কারণ সে জানত, বিশেষ ওই সুর পেয়ে বসবে ড্যামিয়েনকে। জানত, ওই সুর শুনে আপসেট হয়ে পড়বে ড্যামিয়েন, আলাদা হয়ে পড়বে সবার কাছ থেকে। আর সে-সুযোগই নিতে চেয়েছিল লোকটা… নাগালের মধ্যে একা পেতে চেয়েছিল ড্যামিয়েনকে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ড্যামিয়েনকে কেন? পুরো ব্যাপারটা যদি ডিলের সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়, তা হলে ড্যামিয়েনকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। যখন ঘটেছিল ঘটনাটা, তখন গাড়ির ভিতরে ছিল না সে।’
‘হুঁ, ভালো বলেছেন।
ব্যাপারটা ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছেন একজন মহিলা। তাঁর সেই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেল একটা বাচ্চা। দশ বছর পর শাস্তি দেয়া হলো মহিলাকে। কিন্তু সে-শাস্তি কেন তাঁর ছেলেকেও দেয়া হবে? বাইবেলে যেমনটা বলা হয়েছে… চোখের বদলে চোখ… সে-রকম কিছুই কি ঘটছে? কিন্তু কেন যেন পুরো ব্যাপারটার কোনো মানেই দাঁড় করাতে পারছি না। ডায়ানা ক্যুপার ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। ড্যামিয়েন ক্যুপারকে খুন করার মাধ্যমে ডায়ানা ক্যুপারের মনে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা যদি থাকে কারও, তা হলে তার উচিত ছিল আগে ড্যামিয়েনকে খুন করা।
