ইতোমধ্যেই হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে সে। ওর সামনে হাজির হয়েছিল এক ওয়েইটার, ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল লোকটাকে। সোজা এগিয়ে যাচ্ছে দরজার দিকে।
দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে তখন পরিচিত কাউকে বিদায় জানাচ্ছিলেন কেনওয়ার্দি দম্পতি, তাঁদেরকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমরা হুড়মুড় করে। হাজির হলাম এককোনায়, সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হোথর্ন। রাগে ফুঁসছে।
‘সারা রাস্তায় কোনো ট্যাক্সি নেই কেন?’
ঠিকই বলেছে সে। অনেক যানবাহন চলাচল করছে রাস্তায়, কিন্তু একটা ট্যাক্সিও নজরে পড়ছে না।
কিছুক্ষণ পরই আমাদের উল্টোদিকে, রাস্তার আরেক ধারে একটা ট্যাক্সি থামল। ওটা থামিয়েছে এক মহিলা… তার দু’হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ।
ট্যাক্সিচালকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য চিৎকার করে উঠল হোথর্ন। ছুট লাগিয়েছে, কোন্ গাড়ি কোন্দিক দিয়ে আসছে সে-ব্যাপারে যেন কোনো পরোয়াই নেই… সে যেন অন্ধ। ওর চেয়ে একটু সতর্ক হয়ে রাস্তাটা পার হওয়ার চেষ্টা করলাম আমি… মনে পড়ে যাচ্ছে কবরস্থানটা খুব বেশি দূরে না এখান থেকে। শুনতে পেলাম রাস্তার সঙ্গে গাড়ির চাকার জোরালো ঘর্ষণের আওয়াজ… হঠাৎ ব্রেক চেপেছে কোনো ড্রাইভার; কেউ আবার সমানে বাজাচ্ছে হর্ন। কিন্তু যেভাবেই হোক শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম রাস্তার অপরপ্রান্তে।
হোথর্ন ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে ওই মহিলা আর ট্যাক্সিচালকের মাঝঝানে। মিটার চালু করে দিয়েছে লোকটা, নিভিয়ে দিয়েছে হলুদ বাতিটা।
‘এক্সকিউয মি,’ বলে উঠল মহিলাটা, তার কণ্ঠে একইসঙ্গে ঘৃণা আর ক্রোধ। ‘পুলিশ,’ মুখ ঝামটা মারল হোথর্ন, ‘ব্যাপারটা জরুরি।’
ওর আইডি কার্ড দেখতে চাইল না ওই মহিলা।
ট্যাক্সির ভিতরে ঢুকে বসেছি আমরা, এমন সময় ড্রাইভার জানতে চাইল, ‘কোথায় যেতে চান আপনারা?’
‘ব্রিক লেন,’ বলল হোথর্ন।
তার মানে ড্যামিয়েন ক্যুপারের বাসা।
সেদিনের সেই ট্যাক্সিযাত্রার কথা কখনও ভুলতে পারবো না আমি। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে কয়েক মিনিট, রাস্তায় যানজট তেমন বেশি না। তারপরও যখন দাঁড়িয়ে পড়ছে আমাদের ট্যাক্সি, অথবা যখনই লাল বাতি জ্বলে উঠছে সিগনালে, তখনই দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন অত্যাচার চালাচ্ছে হোথর্নের উপর। আমার পাশেই বসে আছে সে, কেমন কুঁজো হয়ে গেছে পিঠটা। একটু পর পর মোচড়ামোচড়ি করছে।
হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মনে ভিতরে… সেসব জিজ্ঞেস করতে চাইছি হোথৰ্নকে। গাড়ির চাবি দেখে এমন কী কথা মনে পড়ে গেল ওর? ওই চাবি ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা মনে করিয়ে দিল কেন ওকে? নাকি কোনো বিপদে পড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপার?
মনে যত প্রশ্নই থাকুক, চুপ করে আছি। হোথর্নের মেজাজ কেমন সেটা ভালোমতোই জানা আছে আমার, কাজেই আমার উপর ওকে চটিয়ে দেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তা ছাড়া… জানি না কেন… আমার মনের ভিতরে কেউ একজন যেন ফিসফিস করে বলছে, যা ঘটছে, আমারই কোনো ভুলের কারণে ঘটছে।
ফুলহ্যাম থেকে ব্রিক লেনের রাস্তাটা বেশ লম্বা। পশ্চিমদিক থেকে পুবদিক পর্যন্ত সারা লন্ডন পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হলো আমাদেরকে। আমরা যদি টিউব ট্রেনে করে আসতাম, তা হলে আমার ধারণা আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারতাম। কয়েকটা স্টেশন পার হতে হলো আমাদেরকে… দক্ষিণ কেনসিংটন, নাইটসব্রিজ, হাইড পার্ক কর্নার… প্রতিবারই খেয়াল করলাম, মনে মনে কী যেন হিসেব করছে হোথর্ন। আমাদের সামনে গাড়িঘোড়ার সংখ্যা কত, সেটাই ভাবছে বোধহয়।
যা-হোক, শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম আমরা ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটের কাছে। একলাফে ট্যাক্সি থেকে বেরিয়ে গেল হোথর্ন, ভাড়া দেয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিল আমার উপর। ৫০ পাউন্ডের একটা নোট ধরিয়ে দিলাম আমি ড্রাইভারের হাতে, ভাংতির জন্য অপেক্ষা করলাম না।
একধারের দুটো দোকানের মাঝখান দিয়ে সরু একটা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে, সেদিকে ছুট লাগিয়েছে হোথর্ন, আমিও ছুটলাম ওর পিছু পিছু। দ্বিতীয় তলার প্রবেশপথের কাছে হাজির হতে বেশি সময় লাগল না।
আশ্চর্য, দরজাটা আধখোলা।
ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা।
প্রথমেই আমার নাকে বাড়ি মারল রক্তের গন্ধ। হত্যাকাণ্ডের উপর কম করে হলেও ডজনখানেক বই লিখেছি আমি, টেলিভিশনের জন্য নাটকও লিখেছি কিছু। কিন্তু বাস্তবজীবনে যে এ-রকম কোনো ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে, কল্পনাও করিনি কখনও।
ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। রক্তের ছোটখাটো একটা পুকুরের পাশে পড়ে আছে সে। ওর শরীর থেকে বেরিয়ে সে-রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে; ঢুকে যাচ্ছে ফ্লোরবোর্ডের ভিতরে। এমনভাবে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, কিছু একটা ধরার জন্য বাড়িয়ে দিয়েছে একটা হাত। সে-হাতের দুটো আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে প্রায়। আমার ধারণা, যে-ছুরি দিয়ে কমপক্ষে ছ’বার আঘাত করা হয়েছে ওকে, সেটার কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে ওই অবস্থা হয়েছে আঙুল দুটোর। ছুরিটা শেষপর্যন্ত ঠাঁই নিয়েছে ওর বুকে… অনেকখানি ঢুকে আছে বুকের গভীরে ছুরির একটা ঘা ওর চেহারাতেও লেগেছে, এবং এই আঘাতটাই বেশি ভয়ঙ্কর লাগছে আমার কাছে। কারণ কেউ যদি একটা হাত অথবা একটা পা হারিয়ে ফেলে, তা হলেও তার পরিচয়টা রয়ে যায়। কিন্তু যদি কারও চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে তার পরিচয়টাও নষ্ট হয়ে যায়।
