হোথর্ন বলল, ‘সেই দুর্ঘটনার পরে যখন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল মিসেস ক্যুপারকে, তখন কি তাঁকে আইনি শলাপরামর্শও দিয়েছিলেন?’
‘অবশ্যই। সত্যি বলতে কী, মিসেস ক্যুপারের বিরুদ্ধে আসলে কোনো কেসই ছিল না। বিচারক যা-রায় দিয়েছিলেন, সেটা একদম ঠিক ছিল।’
‘সেই বিচারকের সঙ্গে কি পূর্বপরিচয় ছিল আপনার?’
‘কে, ওয়েস্টন? পূর্বপরিচয় মানে একবার কি দু’বার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল আমাদের মধ্যে। লোকটা ভালো মনের মানুষ। যা-হোক, ওই সময়ে আমি ডায়ানাকে বলেছিলাম, চিন্তার কিছু নেই… পত্রপত্রিকায় যে-খবরই বের হোক না কেন, বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। তারপরও সময়টা খুব খারাপ গেছে বেচারীর। খুবই আপসেট হয়ে পড়েছিলেন তিনি।’
‘তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল আপনার?’
‘গত সপ্তাহে… যেদিন তিনি মারা গেছেন সেদিন। বোর্ড মিটিং ছিল আমাদের। আমরা দু’জনই ছিলাম গ্লোব থিয়েটারের বোর্ডে। জানেন কি না জানি না… ওই থিয়েটার কিন্তু একটা শিক্ষামূলক দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান। কাজকর্ম চালিয়ে নেয়ার জন্য লোকজনের দান-খয়রাতের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয় আমাদেরকে
‘আপনারা সাধারণত কোন্ ধরনের নাটক করেন?’
‘মূলত শেক্সপিয়ার।’
আশ্চর্য লাগছে আমার। হোথর্নের মতো একজন মানুষ কিনা জানতে চাইছে গ্লোব থিয়েটারের ব্যাপারে! ওই থিয়েটারের ব্যাপারে আসলেই কিছু জানে না, নাকি না-জানার ভান করছে… নিশ্চিত হতে পারলাম না। আজ থেকে চার শত বছর আগে থেমস নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠেছিল ওই থিয়েটার, পরে পুনঃনির্মিত হয়েছে। রানি এলিযাবেথের আমলের নাটকগুলোর নির্ভরযোগ্য মঞ্চ- উপস্থাপনার জন্য থিয়েটারটাকে বিশেশায়িত বলা চলে। যা-হোক, হোথর্নের মধ্যে এখন পর্যন্ত এমন কিছু দেখতে পাইনি যার ফলে মনে হতে পারে, নাটক, সাহিত্য, সঙ্গীত বা আর্টের প্রতি আগ্রহ আছে ওর। আবার, একইসঙ্গে, অনেক কিছুর ব্যাপারে অনেক কিছু জানে সে। কাজেই, হতে পারে, উকিল সাহেবকে বাজিয়ে দেখতে চাইছে আসলে।
বলল, ‘শুনলাম, সেদিনের বোর্ড মিটিঙে আপনাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল?’
‘না তো! কথাটা কে বলেছে আপনাকে?’
জবাব দিল না হোথর্ন। ব্রম্পটন সেমেট্রি’র ব্যাপারে জানার জন্য ডায়ানা ক্যুপারকে ফোন করেছিল রবার্ট কর্নওয়ালিস, তখন ফোনের ও-প্রান্ত থেকে বাকবিতণ্ডার আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেছে। কথাটা কর্নওয়ালিস নিজে বলেছে আমাদেরকে।
‘বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছিলেন মিসেস ক্যুপার,’ বলল হোথর্ন।
‘হ্যাঁ। তবে সেটা বিশেষ কোনো মতানৈক্যের কারণে না।’
‘তা হলে কেন করেছিলেন কাজটা?’
কোনো ধারণা নেই আমার। তিনি শুধু বলেছিলেন, পদত্যাগের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু দিন ধরে ভাবছিলেন। তাঁর সেই ঘোষণা শুনে আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে যাই। কারণ একনিষ্ঠ সমর্থক বলতে যা বোঝায়, আমাদের থিয়েটারের জন্য তিনি ছিলেন ঠিক সে-রকম। বিভিন্ন সময়ে চাঁদা তুলবার ব্যাপারেও চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতেন। শুধু তা-ই না, শিক্ষামূলক যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, সেগুলোতেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর।’
‘কোনো কিছু নিয়ে নাখোশ ছিলেন তিনি?’
‘না… মোটেও না। ছ’বছর ধরে থিয়েটারের বোর্ডে ছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, যথেষ্ট হয়েছে… আর না।’
অস্বস্তি দেখা দিয়েছে উকিল সাহেবের স্ত্রীর চেহারায়। ‘চার্লস, আমার মনে হয় আমাদের যাওয়া উচিত।’
‘ঠিক আছে, প্রিয়তমা।’ হোথর্নের দিকে তাকালেন কেনওয়ার্দি। ‘ওই বোর্ডের ব্যাপারে আপনাকে আর বিশেষ কিছু বলার নেই আমার। ব্যাপারটা গোপনীয়।
‘মিসেস ক্যুপারের উইলের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন?’
‘হ্যাঁ। আমার ধারণা, আজ বাদে কাল এমনিতেও জানাজানি হয়ে যাবে ব্যাপারটা। সহজ হিসাব… নিজের সব কিছু ড্যামিয়েনকে দিয়ে গেছেন মিসেস ক্যুপার। তবে বিস্তারিত কিছু বলাটা এই মুহূর্তে সম্ভব না আমার পক্ষে। যা-হোক, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং কথা বলে ভালো লাগল, মিস্টার হোথৰ্ন। হাতেধরা গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন কেনওয়ার্দি। পকেট হাতড়ে বের করলেন গাড়ির চাবি, সেটা দিলেন স্ত্রীর হাতে। ‘চলো তা হলে, প্রিয়তমা। তুমিই যদি গাড়ি চালাও, ভালো হয়।
‘ঠিক আছে।’
‘চাবি… বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গেই কথা বলছে হোথর্ন। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চার্লস আর ফ্রিডা কেনওয়ার্দির দিকে, দেখছে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু ওই দু’জনের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই ওর। অন্য কোনো চিন্তায় হারিয়ে গেছে। গাড়ির চাবিটা এখনও ফ্রিডার হাতে। দেখতে পেলাম, দরজা দিয়ে যখন বেরিয়ে গেলেন তিনি, তখনও চাবিটা হাতে ধরে রেখেছেন।
বুঝতে পারলাম, ওই চাবি এমন কিছু একটা মনে করিয়ে দিয়েছে হোথৰ্নকে, যা মিস করেছিল আগে।
এবং তারপর… হঠাৎ করেই… নড়ে উঠল সে; যেন অদৃশ্য কেউ একজন সজোরে ধাক্কা দিয়েছে ওকে। এমনিতে পাণ্ডুরই বলা চলে ওর চেহারাটা, কাজেই যদি বলি রক্ত সরে গেল ওর চেহারা থেকে, তা হলে সেটা যথোপযুক্ত হবে না; বরং বলা উচিত, ভয়ানক কোনো উপলব্ধি হঠাৎ করেই যেন দেখা দিল ওর চেহারায়। সে যেন বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা গড়বড় হয়ে গেছে কোথাও।
‘চলুন,’ বলল আমাকে।
‘কোথায়?’
‘ব্যাখ্যা করার সময় নেই। তাড়াতাড়ি আসুন।’
