‘সপ্তাহ তিনেক আগে। ক্যাভেনডিশ স্কোয়ারে আমার ডাক্তারখানা আছে, সেখানে এসেছিলেন তিনি। সত্যি বলতে কী, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি বেশ কয়েকবার।’
‘ইদানীং?’
‘গত কয়েক মাসে। ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছিল তাঁর। নির্দিষ্ট বয়সের মহিলাদের বেলায় সমস্যাটা খুব সাধারণ। আর… বিভিন্ন রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাতেও ভুগছিলেন।’ ডানে-বাঁয়ে তাকালেন তিনি, সবার সামনে গোপন কথা বলে দিচ্ছেন ভেবে নার্ভাস হয়ে পড়েছেন কিছুটা। কণ্ঠ নিচু করলেন। ‘আসলে… ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তাঁর। ‘
‘কেন?’ জানতে চাইল হোথৰ্ন।
‘মিস্টার হোথর্ন, আমি আপনার সঙ্গে শুধু মিসেস-ক্যুপারের-ডাক্তার হিসেবেই না, তাঁর বন্ধু হিসেবেও কথা বলছি। …সত্যি কথাটা হচ্ছে, তাঁর ছেলে যেভাবে জীবনযাপন শুরু করেছিল লস অ্যাঞ্জেলসে, সেটা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রথম কথা, তিনি মোটেও চাননি ও-রকম কোনো জায়গায় গিয়ে থাকুক তাঁর ছেলে। পত্রপত্রিকায় তারকাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব প্রকাশিত হয় প্রায়ই; সে-রকম খবর পড়েছিলেন তিনি, আর সেগুলোতে বলা হয়েছিল, ড্রাগস এবং বিভিন্ন ধরনের পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাঁর ছেলে। অথচ বিন্দুমাত্র কোনো সত্যতা ছিল না ওসব খবরের। যারা নাম কামিয়ে ফেলেছে, তাদের ব্যাপারে বানিয়ে বানিয়ে যা-তা লেখাটা পত্রিকাওয়ালাদের একটা বদভ্যাস। কথাটা বলেছিলাম আমি মিসেস ক্যুপারকে। কিন্তু তিনি তখন বিশ্বাস করে বসে আছেন ওসব খবর, দুশ্চিন্তায় ভুগছেন; তাই তাঁকে ঘুমের ওষুধ প্রেসক্রাইব করি। শুরু করতে বলেছিলাম ‘অ্যাটিভ্যান’ দিয়ে, তাতে যদি কাজ না-হয় তা হলে খেতে বলেছিলাম ‘টেমাযেপাম’।’
মিসেস ক্যুপারের বাথরুমে পাওয়া ওষুধগুলোর কথা মনে পড়ে গেল আমার।
‘আমার প্রেসক্রিপশন কাজে লেগে গিয়েছিল,’ বলছেন বাটিমোর। ‘এপ্রিলের শেষের দিকে শেষবার দেখা হলো মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে। তখন তাঁকে আরেকটা প্রেসক্রিপশন দিলাম…
‘তিনি ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন ভেবে খারাপ লাগেনি আপনার?’
করুণার হাসি দেখা দিল ডক্টর বাটিমোরের চেহারায়। ‘মিস্টার হোথর্ন, কিছু মনে করবেন না, ওষুধের ব্যাপারে আপনি আসলে কিছু জানেন কি না জানি না… টেমাযেপামের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আসলে খুবই কম। আর সে- কারণেই বিশেষ ওই ওষুধ খেতে দিই আমার-রোগীদেরকে। একটা মাত্র সমস্যা হতে পারে ওষুধটা খেলে… শর্ট টার্ম মেমোরি লস… কিন্তু যতদূর জানতে পেরেছি, যেদিন মারা গেছেন মিসেস ক্যুপার, সেদিনও তাঁর স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভালো ছিল।’
‘কোনো ফিউনারেল পার্লারে যাওয়ার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি?’
‘সরি?’
‘একটা ফিউনারেল পার্লারে গিয়েছিলেন তিনি। যেদিন মারা গেছেন, সেদিনই ব্যবস্থা করে গেছেন নিজের শেষকৃত্যের।’
চোখ পিটপিট করছেন ডক্টর বাটিমোর। ‘আমি… কী বলবো… হতভম্ব। কেন ওই কাজ করতে গেলেন তিনি, কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে আপনাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ওই সমস্যার কথা বাদ দিয়ে বললে, এটা ভাববার কোনো কারণই ছিল না মিসেস ক্যুপারের যে, তাঁর সময় শেষ। কাজেই যতদূর মনে হয়, যেদিন ওই ফিউনারেল পার্লারে গেছেন তিনি সেদিনই তাঁর খুন হওয়ার ব্যাপারটা কাকতালীয় ছাড়া আর কিছু না।’
‘আগেও বলেছি, আবারও বলছি, ভয়ঙ্কর কোনো এক চোর ঢুকে পড়েছিল মিসেস ক্যুপারের বাড়িতে,’ বললেন ডক্টর বাটিমোরের স্ত্রী।
‘ঠিক তা-ই, প্রিয়তমা। মিসেস ক্যুপারের জানার কথা না, খুন করা হবে তাঁকে। কাজেই পুরো ব্যাপারটা কাকতালীয় ছাড়া আর কিছু না।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন।
আমরা দু’জন সরে এলাম কিছুটা দূরে।
আমাদের কথা কেউ শুনতে পাবে না টের পেয়ে বিড়বিড় করে জঘন্য একটা গালি দিল হোথর্ন।
‘কেন গালি দিলেন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘কারণ ডক্টর বাটিমোর এতক্ষণ যা বলেছেন, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই তাঁর।’
থতমত খেয়ে গেলাম।
‘তিনি যা-যা বলেছেন, শুনেছেন আপনি। সেসব কথা অর্থহীন মনে হয়েছে আমার কাছে।’
‘কিন্তু… আমার তো সে-রকম মনে হয়নি?’
জবাবে কিছু বলল না হোথর্ন, এগিয়ে গেল চার্লস কেনওয়ার্দি… মানে মিসেস ক্যুপারের উকিলের দিকে। ওর পিছু পিছু গেলাম আমিও।
এখনও আগের কোনাতেই দাঁড়িয়ে আছেন কেনওয়ার্দি, কথা বলছেন এক মহিলার সঙ্গে। ধারণা করলাম, ওই মহিলা তাঁর স্ত্রী। লোকটা বেঁটেখাটো, গোলগাল। মাথায় কোঁকড়া রূপালি চুল। মহিলাও একই গড়নের, তবে স্বামীর চেয়ে বেশি মোটা। কেনওয়ার্দি পোর্সেকো খাচ্ছেন। আর তাঁর স্ত্রীর হাতে ফলের জুসের গ্লাস।
কেমন আছেন আপনি?’ হোথর্নের সম্ভাষণের জবাবে বললেন উকিল সাহেব। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই কেনওয়ার্দি। আর এ হচ্ছে ফ্রিডা।’
হোথর্ন কী জানতে চায়, তা শোনার পর শুরু হলো তাঁর বকবকানি। তিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চেনেন মিসেস ক্যুপারকে। লরেন্স ক্যুপারের সঙ্গে এককালে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছেন বেচারা। খুব দুঃখজনক ছিল ব্যাপারটা। কারণ ভালো একজন মানুষ ছিলেন লরেন্স। প্ৰথম শ্রেণীর ডেন্টিস্ট ছিলেন একজন। কেন্টের ফেভারশ্যামে থাকতেন। যা-হোক, ভয়ঙ্কর সেই দুর্ঘটনা যখন ঘটল, তখন বাড়িটা বিক্রি করে দিতে ডায়ানাকে সাহায্য করেছিলেন কেনওয়ার্দি। তারপর ডায়ানা চলে আসেন লন্ডনে।
