হোথর্ন বলল, ‘আপনাদের তথাকথিত ফরেনযিক এক্সপার্টরা আদৌ কিছু খুঁজে পাবেন কি না এই ঘড়িতে, সন্দেহ আছে আমার।’
‘ইন্টারনেটের মাধ্যমে যদি কেনা হয়ে থাকে এই ঘড়ি,’ বলছে মিডোস, ‘তা হলে ক্রেতার পরিচয় বের করার ভালো একটা সম্ভাবনা আছে আমাদের।’
তার হাতে ঘড়িটা দিল হোথর্ন। ওটা খুব সাবধানে ধরার ভান করল মিডোস… ঘড়ির একপাশ আঁকড়ে ধরেছে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে, অন্যপাশ ধরেছে তর্জনীর সাহায্যে।
‘গুড লাক,’ বলল হোথৰ্ন I
অর্থাৎ ভদ্র-ভাষায় বিদায় নিতে বলছে সে মিডোসকে।
.
মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যাঁরা শোক জানাতে এসেছিলেন, তাঁরা ফিনবরো রোডের এককোনায়, একটা গ্যাসট্রোপাবে একত্রিত হচ্ছেন। কবরস্থান থেকে হেঁটে ওই পাবে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফিরে গেছে ড্যামিয়েন ক্যুপার, তবে চলে যাওয়ার আগে ওই পাবের কথা বলে গেছে। আর শেষকৃত্যের এই অনুষ্ঠান থেকে সে একাই চলে যায়নি, যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছিলেন তাঁদের প্রায় অর্ধেক লোকও চলে গেছেন ইতোমধ্যে। তবে গ্রেস লোভেল আছে, আর আছেন কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা।
হোথর্ন বলেছিল, ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে কথা বলতে চায় সে। ইতোমধ্যেই যোগাযোগ করেছে রবার্ট কর্নওয়ালিসের সঙ্গে, একটা টেক্সট মেসেজও পাঠিয়ে দিয়েছে তার মোবাইল ফোনে। তবে সব কিছুর আগে যে-কাজ করতে চায় সে তা হলো, যাঁরা এখন আছেন ওই পাবে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে চায়। ওই লোকগুলো যদি ভালোমতো না-চিনতেন ডায়ানা ক্যুপারকে, তা হলে আসতেন না এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে… বলা ভালো, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরও রয়ে যেতেন না। কাজেই এই যে এখন একসঙ্গে আছেন তাঁরা, তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং কথা বলার এটাই সুযোগ হোথর্নের। চলার গতি দ্রুত করল সে, ফুলহ্যাম রোড পার হয়ে ওই পাবে ঢুকে পড়লাম আমরা দু’জন।
এবং ঢোকামাত্রই দেখতে পেলাম গ্রেসকে। কালো পোশাক পরেছে, কিন্তু সেটা খুবই খাটো। ওই কাপড়ের উপরে পরেছে মখমলের টাক্সিডো জ্যাকেট, সেটার দু’দিকের কাঁধে প্যাড লাগানো আছে। বারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, কারও শেষকৃত্যে অংশ নিতে আসেনি, বরং কোনো সিনেমার প্রিমিয়ারে যোগ দিতে এসেছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। আমরা যখন এগিয়ে গেলাম ওর দিকে, আমাদেরকে দেখে হাসল নার্ভাস ভঙ্গিতে।
‘মিস্টার হোথর্ন!’ বোঝাই গেল, হোথর্নকে দেখে খুশি হয়েছে গ্রেস। ‘এখানে কী করছি, নিজেই জানি না আমি। এখানকার কাউকেই বলতে গেলে চিনি না।’
‘এঁরা কারা?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।
এদিক-ওদিক তাকাল গ্রেস, তারপর আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিতে শুরু করল একেকজনকে। ‘ওই যে… রেমন্ড কুন্স। মঞ্চনাটকের প্রযোজক। তাঁর একটা নাটকে অভিনয় করেছে ড্যামিয়েন।’
‘তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে আমাদের।’
‘আর ওই যে… ডক্টর বাটারওয়ার্থ… ডায়ানার জেনারেল প্র্যাকটিশনার,’ মাথা ঝাঁকিয়ে লোকটাকে দেখিয়ে দিল গ্রেস। ভদ্রলোকের বয়স ষাটের ঘরে, মাথাটা কেমন কবুতরের মাথার মতো, পরনে তিন পিসের গাঢ় রঙের স্যুট। ‘ডাক্তারের পাশে যে-মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন তিনি তাঁর স্ত্রী। আর ওই যে… ওই কোনায় একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন না… তিনি ডায়ানার উকিল… চার্লস কেনওয়ার্দি। ডায়ানার উইল নিয়ে কাজ করছেন। এঁদের ক’জনকে ছাড়া বাকি কাউকে চিনি না।’
‘ড্যামিয়েন বাসায় চলে গেছেন, তা-ই না?’
‘হ্যাঁ। খুবই আপসেট হয়ে পড়েছিল সে। আমার কী মনে হয়, জানেন? মনে হয়, ওকে আপসেট করে দেয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নেয়া হয়েছিল ওই গান। কেউ একজন ভয়ঙ্কর কোনো তামাশা করেছে ওর সঙ্গে।’
‘ওই গান কি আপনাদের পূর্বপরিচিত?’
‘হ্যাঁ,’ দ্বিধা ফুটল গ্রেসের চেহারায়, বাকি কথা বলবে কি বলবে না তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছে সম্ভবত। ‘গানটা আসলে ওই দুই ছেলের দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কাদের কথা বলছি, বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই? ওই গান টিমোথি গডউইনের সবচেয়ে প্রিয় গান। যখন কবর দেয়া হচ্ছিল ছেলেটাকে, তখন বাজানো হয়েছিল গানটা।’
‘আপনি জানতে পারলেন কী করে?’ জিজ্ঞেস করল হোথৰ্ন।
‘ড্যামিয়েন বলেছে আমাকে। এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রায়ই কথা বলত সে।’ আমার কেন যেন মনে হলো, ড্যামিয়েনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে গ্রেস। ‘নিজের আবেগ বা অনুভূতির কথা সবার কাছে বলে বেড়ানোর মতো মানুষ না সে। তারপরও ওই গান… বিশেষ সেই ঘটনার একটা মানে আছে ওর কাছে। এত বছর হয়ে গেছে, তারপরও ভুলতে পারে না সে ঘটনাটা।’ নিজের জন্য এক গ্লাস প্রোসেকো ঢেলে নিল, একচুমুকে প্রায় পুরোটাই চালান করে দিল পেটে। ‘ঈশ্বর, কী ভয়াবহ একটা দিন যে গেল আজ! আমি জানতাম আজকের দিনটা মোটেও ভালো কাটবে না। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখনই টের পেয়েছিলাম ব্যাপারটা। কিন্তু এত খারাপ যে হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।’
হোথর্ন একদৃষ্টিতে দেখছে গ্রেসকে। হঠাৎ বলল, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ড্যামিয়েনের মাকে তেমন একটা পছন্দ করতেন না আপনি। ‘
লাল হয়ে গেল গ্রেসের চেহারা। ‘কথাটা ঠিক না! কে বলেছে আপনাকে?’
‘তিনি খুব একটা পাত্তা দিতেন না আপনাকে… আপনিই বলেছিলেন একবার।
