‘একটা অ্যালার্ম ক্লক,’ বলল হোথর্ন, হাত বাড়িয়ে দিল ঘড়িটা নেয়ার জন্য। ওটা ওর হাতে দিল মিডোস… দেখে মনে হলো জিনিসটা হস্তান্তর করতে পেরে খুশি হয়েছে।
তাকালাম ঘড়িটার দিকে। ওটা একটা ডিজিটাল অ্যালার্ম ক্লক। একধারে একটা বৃত্তাকার প্যানেল আছে, সঠিক সময়টা দেখা যাচ্ছে সেখানে। বেশ কয়েকটা ছিদ্র দেখা যাচ্ছে গায়ে… অনেকটা যেন আগের-দিনের রেডিও’র মতো। সুইচ আছে দুটো। একটা সুইচে চাপ দিল হোথর্ন। সঙ্গে সঙ্গে বাজতে শুরু করল…
দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড…
‘বন্ধ করুন ওটা!’ চিৎকার করে উঠল আইরিন লয়।
কথামতো কাজ করল হোথর্ন। ব্যাখ্যা দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘এটা একটা এমপি থ্রি রেকর্ডিং অ্যালার্ম ক্লক। ইন্টারনেট ঘাঁটলে ও-রকম ঘড়ির খোঁজ পাওয়া যায় অনেক। আইডিয়াটা হচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে তুলবার জন্য আপনার বাচ্চাদের প্রিয় কোনো গান ঢুকিয়ে রাখতে পারবেন এ-ধরনের কোনো ঘড়িতে। আমার ছেলের জন্যও এ-রকম একটা জিনিস জোগাড় করেছি আমি। তবে কোনো গান ঢোকাইনি ওটাতে, বরং আমার নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে দিয়েছি। কী রেকর্ড করেছি, জানেন? ‘ওঠ, ছোট্ট বেজন্মা কোথাকার, কাজ শুরু করে দে!’ কথাটা শুনলে আমার ছেলে যারপরনাই উল্লাস বোধ করে।’
ঘড়িটার দিকে ইঙ্গিত করলাম আমি। ‘ওটা অ্যাক্টিভেট করা হলো কী করে?’
জিনিসটা উল্টেপাল্টে দেখল হোথর্ন। ‘সাড়ে এগারোটায় সেট করা হয়েছিল অ্যালার্ম। যে-ই করে থাকুক কাজটা, চেয়েছিল, শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাঝ-পর্যায়ে যেন বেজে ওঠে অ্যালার্ম।’ তাকাল আইরিন লযের দিকে। ‘এই ঘড়ি ডায়ানা ক্যুপারের হাতে এল কী করে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে আপনার?’
‘না!’ হতাশ মনে হচ্ছে আইরিনকে; মনে হচ্ছে, সে ভাবছে তাকে দুষছে হোথৰ্ন।
‘এ-রকম কি হয়েছিল… কফিনটা রেখে চলে গিয়েছিল সবাই… মানে, কফিনের ধারেকাছে কেউ ছিল না?’
‘সদুত্তর পেতে চাইলে মিস্টার কর্নওয়ালিসকে জিজ্ঞেস করুন প্রশ্নটা।’
‘তিনি কোথায়?’
‘একটু তাড়াতাড়ি চলে গেছেন তিনি… যেতে হয়েছে আসলে। আজ বিকেলে তাঁর ছেলের স্কুলে একটা নাটক আছে।’ কমলা রঙের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে আইরিন। ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কারও এ-রকম কোনো কাজ করার কথা না।’
‘তার মানে কাজটা নিশ্চয়ই বাইরের কারও। সেজন্যই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কফিনটা ফেলে রেখে বাইরে চলে গিয়েছিলেন কি না আপনারা সবাই?
‘হ্যাঁ,’ কেঁপে উঠল আইরিন, দেখে মনে হলো অস্বস্তিতে ভুগছে… কথাটা স্বীকার করতে রীতিমতো ঘৃণা বোধ করছে। ‘ফুলহ্যাম প্যালেস রোডে আমাদের অফিসে রাখা ছিল মিসেস ক্যুপারের লাশটা। আজ সেখান থেকেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে তাঁর মরদেহ। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দক্ষিণ কেনসিংটনের অফিসে লাশ রাখার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই। হ্যাঁমারস্মিথের কাছে একটা গির্জা আছে, সেখানে প্রায়ই মরদেহ রেখে দেয়া হয়, যাতে যিনি মারা গেছেন তাঁর আত্মীয়স্বজন সেখানে গিয়ে শোক জানাতে পারেন; মিসেস ক্যুপারের বেলায়ও করা হয়েছিল কাজটা।’
‘মিসেস ক্যুপারের জন্য শোক জানাতে গিয়েছিল ক’জন?’
‘সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে ওখানে একটা ভিটির বুক আছে আমাদের। এবং শনাক্তকরণ ছাড়া সেখানে ঢুকতে দেয়ার কথা না কাউকে।’
‘আর এই গির্জার কী অবস্থা?’ জানতে চাইল হোথর্ন।
জবাবে কিছু বলল না আইরিন।
হোথর্ন বলে চলল, ‘আমরা যখন হাজির হলাম এই জায়গায়, তখন কফিনটা শবযানের ভিতরে ছিল। আর ওটা পার্ক করে রাখা হয়েছিল গির্জার পেছনদিকে। সেখানে কি সার্বক্ষণিকভাবে কোনো একজনকে নিযুক্ত রাখা হয়েছিল?’
মিসেস ক্যুপারের কফিন নিয়ে এসেছে যে-চারজন, তাদের একজনের দিকে তাকাল আইরিন।
দৃষ্টি নত করল লোকটা। ‘বেশিরভাগ সময় কফিনের সঙ্গেই ছিলাম আমরা, তবে সারাটা সময় ছিলাম না।’
‘আপনি কে?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।
‘আলফ্রেড লয। আমি ওই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক।’ লম্বা করে দম নিলেন তিনি। ‘আইরিন আমার স্ত্রী।’
বিষণ্ণ হাসি হাসল হোথর্ন। ‘সারাটা সময় ছিলেন না… কোথায় গিয়েছিলেন তা হলে?’
‘এখানে আসার পর শবযানটা পার্ক করে গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়েছিলাম আমরা।’
‘আমরা মানে আপনারা চারজনই?’
‘হ্যাঁ।’
‘শবযানটা কি তখন লক করা ছিল?’
‘না।’
আইরিন বলল, ‘মৃত একজন মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কেউ, এ-রকম কিছু দেখিনি আজপর্যন্ত।’
‘ভবিষ্যতে হয়তো এই ব্যাপারে অন্যকিছু ভাবতে হবে আপনাদেরকে,’ আইরিনের দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, ভঙ্গিটা আক্রমণাত্মক। ‘মিস্টার কর্নওয়ালিসের সঙ্গে কথা বলা দরকার আমার। কোথায় পাবো তাঁকে?’
‘দিচ্ছি তাঁর ঠিকানা।’ একটা হাত বাড়িয়ে দিল আইরিন। সে-হাতে তার স্বামী একটা নোটবুক আর একটা কলম ধরিয়ে দিলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় খসখস করে কয়েকটা লাইন লিখল আইরিন, ছিঁড়ে ফেলল পৃষ্ঠাটা, তারপর সেটা বাড়িয়ে ধরল হোথার্নের দিকে।
‘ধন্যবাদ।
‘এক মিনিট!’ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে মিডোস, তাকে দেখে মনে হলো, যেন বুঝতে পেরেছে, কিছুই বলেনি এতক্ষণ। কিন্তু একইসঙ্গে… তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম… বেশি কিছু বলার নেই আসলে, এবং সেটা সে নিজেও জানে। ‘অ্যালার্ম ক্লকটা নিয়ে যেতে হবে আমাকে। ওটা অন্য কারও হাতে পড়লে মূল্যবান কোনো সূত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে… আমাদের ফরেনযিক এক্সপার্টরা পছন্দ না-ও করতে পারে ব্যাপারটা।
