ঘেসো জমিনের উপর দিয়ে ডায়ানা ক্যুপারের কফিনটা দ্রুত টেনে নিয়ে চলল চার কফিন-বাহক। দৌড়াচ্ছে না, কিন্তু যত জলদি সম্ভব এগোনোর চেষ্টা করছে। কিছু-না-কিছু শালীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে এখনও।
দূরে চলে গেছে কফিনটা, সেই রাইমও স্তিমিত হয়ে এসেছে অনেকখানি…
দ্য হর্ন অন দ্য বাস গো …
কিছুক্ষণের মধ্যে গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়ল কফিন-বাহকরা।
তাদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কোনো একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়।
‘বিপ, বিপ, বিপ,’ বেসুরো ভঙ্গিতে আউড়াল সে ছড়াগানটার কিছু অংশ, তারপর হাঁটা ধরল দ্রুত পায়ে।
কফিনটার গমনপথ অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে গির্জার দিকে।
১২. রক্তের গন্ধ
শূন্য কবর ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন লোক… তাঁদের চেহারায় কেমন বিভ্রান্তির ছাপ। কফিনের পেছন পেছন রওয়ানা হলাম আমরা। দৃশ্যটা এখন স্মৃতির পর্দায় যতবার দেখি, ততবার মনে পড়ে যায় কোনো জাহাজের কথা– ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে যেন নিঃসঙ্গ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে ওটাকে।
কেন যেন মনে হচ্ছিল, যা ঘটেছে তা দেখে আমোদিত হয়েছে হোথর্ন। একটু আগে যে-রসিকতা করা হয়েছে, সেটাই ওর আমোদের কারণ কি না, নিশ্চিত হতে পারলাম না। একটু আগে মিডোস নিজের থিউরির কথা বলেছে… মিসেস ক্যুপারের বাসায় নাকি চুরি সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তালগোল পাকিয়ে ফেলে চোর, ফলে নৃশংস হামলা চালায় ওই মহিলার উপর। কিন্তু মিসেস ক্যুপারের বাসায় যা ঘটেছে, আমার বিবেচনায় সেটা পুলিশের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার বাইরে। আর সেজন্যই নিজের মতো করে তদন্ত করার সুযোগ পেয়ে গেছে হোথর্ন।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। থপথপ করে হাঁটছে মিডোস, আসছে আমাদের পেছন পেছন। গির্জার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের থেকে আর কিছুটা দূরে আছে ওটা।
‘কী মনে হয় আপনার?’ জিজ্ঞেস করলাম হোথর্নকে। ‘ওটা কী ছিল আসলে?’
‘আমার মনে হয় আসলে কোনো মেসেজ দেয়া হয়েছে আমাদেরকে,’ বলল হোথর্ন।
‘মেসেজ? কার জন্য?
‘নিশ্চিত করে বলবো না এখনই। তবে… ড্যামিয়েন ক্যুপারের জন্য হতে পারে। তার চেহারাটা দেখেছেন না?’
‘দেখেছি। আপসেট দেখাচ্ছিল।’
‘কাগজের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল তার চেহারা। একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল আমার, লোকটা বুঝি মারাই যাবে!’
‘আচ্ছা, জেরেমি গডউইনের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি তো?’
‘না… আমার মনে হয় না। কারণ ছেলেটা কোনো বাসের নিচে চাপা পড়েনি।
‘
‘না, তা পড়েনি, কিন্তু এ-রকম কি হতে পারে না… ছেলেটা যখন গাড়িচাপা পড়েছিল তখন কোনো খেলনা-বাস বহন করছিল? অথবা… সে হয়তো বাসে সওয়ার হয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করত…’
‘ঠিকই বলেছেন হয়তো। বাচ্চাদের নার্সারি রাইম শোনানো হয়েছে আমাদেরকে। তার মানে কোনো একটা মৃত বাচ্চার সঙ্গে কোনো-না-কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে কোথাও-না-কোথাও।’ একটা কবর টপকাল হোথর্ন। ‘বাসায় ফিরে গেছে ড্যামিয়েন। তবে তার সঙ্গে অচিরেই দেখা করতে হবে আমাদেরকে। ভাবছি, কী বলার আছে লোকটার।’
‘ওই গাড়ি-দুর্ঘটনা ঘটেছে দশ বছর আগে,’ মাথায় যা আসছে, তা-ই বলছি আমি। ‘প্রথমে খুন করা হলো ডায়ানা ক্যুপারকে। তারপর ঘটল এই ঘটনা। আমার মনে হয় কেউ একজন বিশেষ একটা পয়েন্টের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে আমাদের।’
গির্জায় পৌঁছে গেলাম। কফিনটাও নিয়ে আসা হয়েছে ইতোমধ্যে। মিডোস এসে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা।
মিডোসের শরীরটা নষ্ট হয়ে গেছে একেবারেই… এতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেই হাঁপাচ্ছে। সে যদি খাবার নিয়ন্ত্রণ না-করে, ধূমপান না-ছাড়ে, আর ব্যায়াম না-করে, তা হলে এই কবরস্থানে চিরস্থায়ী বসবাসের জন্য আসতে হবে তাকে।
গির্জার ভিতরে ঢুকলাম। ইতোমধ্যে কাঠের পায়ার উপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে কফিনটা। স্ট্র্যাপ খুলবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আইরিন লয। সেদিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছেন ভিকার, তাঁর দৃষ্টি দেখে বোঝা যাচ্ছে মানসিক একটা ধাক্কা হজম করতে হয়েছে তাঁকে। কর্নওয়ালিস অ্যান্স সন্সের সেই চারজন লোকও হাত লাগিয়েছে। আমরা যখন ভিতরে ঢুকলাম, মুখে তুলে আমাদের দিকে তাকাল আইরিন লয।
‘এই ব্যবসায় সাতাশ বছর ধরে আছি আমি,’ বলল সে, ‘কিন্তু এ-রকম কোনো কিছু ঘটেনি আগে কখনও।’
আর কিছু না-হোক, অন্তত সেই নার্সারি রাইম মিউযিকটা বন্ধ হয়েছে। দ্রুত অভ্যস্ত হাতে কাজ শেষ করছে আইরিন, কাঠের মচমচানি শুনতে পাচ্ছি। কফিনের ঢাকনাটা তুলে ফেলল সে। কেন জানি না আঁতকে উঠে পিছু হটে গেলাম কিছুটা। ডায়ানা ক্যুপার মারা গেছেন সপ্তাহখানেক আগে; এতদিন পর তাঁকে দেখার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার। কপাল ভালো… মসলিনের একখণ্ড কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে মরদেহটা। তাঁর শারীরিক অবয়ব ঠাহর করতে পারছি, তবে তাঁর নিষ্পলক খোলা চোখের দৃষ্টি অথবা একসঙ্গে-সেলাই-করে-রাখা ঠোঁট দুটো দেখতে হচ্ছে না। ঝুঁকে পড়ল আইরিন, ক্রিকেট বলের মতো দেখতে উজ্জ্বল কমলা রঙের কিছু-একটা তুলে নিল ডায়ানার দুই হাতের মাঝখান থেকে… ওটা বসিয়ে দেয়া হয়েছিল সেখানে। মিডোসের হাতে দিল জিনিসটা।
যারপরনাই বিরাগ নিয়ে জিনিসটা দেখছে মিডোস। ‘এটা কী, জানি না আমি।’
