কবরের ভিতর থেকে আসছে আওয়াজটা।
তার মানে… কফিনের ভিতরে বাজছে ওই নার্সারি রাইম।
রাইমটার দ্বিতীয় চরণ শুরু হয়ে গেছে…
দ্য ওয়াইপার্স অন দ্য বাস গো সুইশ, সুইশ, সুইশ
সুইশ, সুইশ, সুইশ,
সুইশ, সুইশ, সুইশ…
জমে যেন বরফে পরিণত হয়েছে চার কফিন-বাহক। হাত থেকে দড়ি ছেড়ে দিয়ে কফিনটা কবরে পড়ে যেতে দেবে কি না, অথবা কী করবে, বুঝতে পারছে না। হয়তো ভাবছে, কফিনটা যদি নামিয়ে দেয় কবরে, তা হলে মাটির এত গভীর থেকে আর শোনা যাবে না ওই রাইম। অথবা হয়তো ভাবছে, তুলে আনবে কফিনটা, তারপর কিছু-একটা করবে ওই রাইমের ব্যাপারে। আবার এ-রকমও ভাবতে পারে, নৃশংস আর অনুপযুক্ত একটা গান-সহ কি দাফন করবে মিসেস ক্যুপারকে?
এতক্ষণে মোটামুটি সবাই বুঝে গেছে, কোত্থেকে আসছে ওই গান। বুঝে গেছে, কোনো একজাতের ডিজিটাল রেকর্ডার অথবা রেডিও রাখা আছে কফিনের ভিতর। ডায়ানা ক্যুপার যদি নিজের জন্য মেহগনি কাঠের কফিন বেছে নিতেন, তা হলে ওই গান হয়তো ভেসে আসত না আমাদের কারও কানে। এতক্ষণে হয়তো শান্তিতে ঘুমানোর জন্য কবরে নামিয়ে দেয়া হতো ওই মহিলাকে।
কফিনের চিড়-ধরা কাঠ ভেদ করে এখনও শোনা যাচ্ছে গানটা…
দ্য ড্রাইভার অন দ্য বাস গোয ‘মুভ অন ব্যাক….
ফটোগ্রাফাররা উঁচু করে ধরেছে তাদের ক্যামেরা, সামনের দিকে এগিয়ে আসছে… কিছু-একটা গণ্ডগোল যে হয়েছে কোথাও, টের পেয়ে গেছে। ঠিক সে- মুহূর্তে ভিকারের উপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্যামিয়েন ক্যুপার, তবে সেটা শারীরিকভাবে না, বরং মৌখিকভাবে… আসলে দোষারোপ করার জন্য কোনো একজনকে দরকার ছিল তার এবং হাতের কাছেই ছিল ওই মহিলা।
‘কী… হচ্ছেটা কী?’ খেঁকিয়ে উঠল ড্যামিয়েন। ‘এসব কার কাজ?’
কবরের কাছে পৌঁছে গেছে আইরিন লয, খাটো পায়ে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ানোর চেষ্টা করছে। ‘মিস্টার ক্যুপার… ‘ শুরু করল সে, কিন্তু শেষ করতে পারল না কথাটা… হাঁপাচ্ছে।
‘আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের মজা করতে চাইছে নাকি কেউ?’ দেখে কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছে ড্যামিয়েনকে। ‘ওই গান কেন বাজানো হচ্ছে?’
‘কফিনটা তোলো,’ দায়িত্ব নিল আইরিন। ‘তুলে আনো ওটা।’
মুভ অন দ্য ব্যাক, মুভ অন দ্য ব্যাক…
‘আমাদের কাছ থেকে যে-টাকা নিয়েছেন আপনারা,’ আবারও খেঁকিয়ে উঠল ড্যামিয়েন, ‘তার প্রতিটা পয়সার জন্য আপনাদের বেজন্মা প্রতিষ্ঠানের নামে আদালতে মামলা ঠুকবো…
?
‘আমি খুবই দুঃখিত,’ বলে উঠল আইরিন। ‘বুঝতেই পারছি না…
যে-গতিতে কফিনটা কবরে নামিয়েছিল চার কফিন-বাহক, তার চেয়ে অনেক দ্রুত সেটা কবরের ভিতর থেকে বের করে আনল তারা। আরও একবার ঘেসো জমিনের উপর ধপ্ করে পড়ল কফিনটা। কল্পনার দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম, কফিনের ভিতরে থাকা ডায়ানা ক্যুপারের শরীরটা দুলে উঠল এদিক-ওদিক। যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছেন, তাঁদের সবার চেহারার উপর নজর বুলিয়ে নিলাম চট করে। আসলে জানতে চাইছি, বিশেষ সেই গানের জন্য এঁদের কেউ দায়ী কি না। বোঝাই যাচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে কাজটা। কেউ কি অসুস্থ কোনো মশকরা করতে চাইছে ক্যুপার পরিবারের সঙ্গে? নাকি বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চাইছে?
রেমন্ড ক্লন্স আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাঁর পার্টনারকে। মুখে হাত চাপা দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ব্রুনো ওয়াং। আর আন্দ্রিয়া কুভানেক… আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু কেন যেন মনে হলো, হাসছে সে। রুমালওয়ালা লোকটা দাঁড়িয়ে আছে কুভানেকের পাশে; তার চেহারায় এমন এক ভাব খেলা করছে যার মানে ঠাহর করতে পারলাম না। হাতটা মুখের কাছে তুললেন তিনি… মনে হলো এখনই বোধহয় ছুঁড়ে ফেলে দেবেন রুমালটা, অথবা হয়তো ফেটে পড়বেন হাসিতে। কিন্তু কোনোটাই করলেন না, বরং মোচড় কেটে ঘুরলেন, পিছিয়ে গেলেন বেশ কিছুটা। দেখতে পেলাম, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন কবরস্থান থেকে। ব্রম্পটন রোডের দিকে এগিয়ে গেছে যে-রাস্তা, সেদিকে যাচ্ছেন।
দ্য ড্রাইভার অন দ্য বাস গোয ‘মুভ অন ব্যাক’
অল ডে লং
কিছুতেই থামছে না ওই গান। ওটা অতি প্রচলিত; গাইবার ভঙ্গি অতি উৎফুল্ল… বড়রা যখন ছোটদেরকে গান শোনান তখন সাধারণত ও-রকম ভঙ্গিতে গান করেন।
‘অনেক হয়েছে,’ শেষপর্যন্ত আর সহ্য করতে পারল না ড্যামিয়েন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সাংঘাতিক একটা মানসিক-ধাক্কা খেয়েছে সে। এই শেষকৃত্যানুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর এই প্রথম আসল কোনো আবেগ দেখা দিল তার চেহারায়।
‘ড্যামিয়েন… ‘ তার হাত ধরার জন্য নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিল গ্রেস। কিন্তু ঝাড়া দিয়ে গ্রেসের হাতটা ছাড়িয়ে দিল ড্যামিয়েন। ‘বাসায় যাচ্ছি আমি। তুমি পাবে চলে যেয়ো। ফ্ল্যাটে দেখা হবে তোমার সঙ্গে।’
ফটোগ্রাফাররা যে সমানে ছবি তুলছে, জানি আমি। ড্যামিয়েন ক্যুপারের ব্যক্তিগত ট্রেনার-কাম-বডিগার্ড ফটোগ্রাফারদের লেন্স থেকে আড়াল করতে চাইছে ড্যামিয়েনকে, কিন্তু ওই লেন্সগুলো যেন চুম্বকের মতো আটকে আছে ড্যামিয়েনের সঙ্গে… যেন ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে তাকে।
ঝড়ের বেগে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে গেল ড্যামিয়েন।
ঘুরে আইরিনের দিকে তাকালেন ভিকার, কেমন অসহায় দেখাচ্ছে তাঁকে। ‘কী করবো?’
চার কফিনবাহকের দিকে তাকাল আইরিন, ধৈর্য রাখার চেষ্টা করছে। ‘চলো কফিনটা গির্জায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই। তাড়াতাড়ি!’
