‘ডায়ানা ক্যুপারকে কীভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো, সে-ব্যাপারে আপনার থিউরি কী? বাকিদের মতো ওই মহিলাকেও কেন মারধোর করে ছেড়ে দিল না সেই মোটরবাইকার? কেন তাঁকে খুন করল?’
মিডোসের কাঁধ দুটো রাগবি খেলোয়াড়দের মতো; অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ও-দুটো ঝাঁকাল সে। ‘যতদূর মনে হয়… কিছু-একটা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল।’
গাছগুলোর ওপাশে একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল আমার। অন্তিম বিশ্রামস্থলে নিয়ে আসা হচ্ছে ডায়ানা ক্যুপারকে। কবরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো একটা মিছিল। ওই লোকগুলোর মধ্যে, ফিউনারেল পার্লার থেকে আসা চারজন লোকও আছে। আরও আছেন ভিকার নিজে, ড্যামিয়েন ক্যুপার আর গ্রেস লোভেল। বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ওই লোকগুলোকে অনুসরণ করছে আইরিন লয। দুই হাত পিছমোড়া ভঙ্গিতে হাঁটছে। নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, সব কিছু সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। রবার্ট কর্নওয়ালিসের পাত্তা নেই কোথাও।
‘একটা কথা বলি?’ হঠাৎ বলে উঠল হোথর্ন… যা বলার মিডোসকে বলছে। ‘আমার মনে হয় আপনার থিউরি আসলে ভুয়া। যখন একসঙ্গে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম আমরা তখনও ফালতু সব থিউরি আউড়াতেন আপনি, এবারও তা-ই করেছেন। যা-হোক, শেষপর্যন্ত যদি আপনার সেই মুখোশ পরিহিত ডিসপ্যাঁচ রাইডারকে চিহ্নিত করতে পারেন, যদি ধরতে পারেন, তা হলে আমার পক্ষ থেকে শুভকামনা জানিয়ে দেবেন তাকে। কারণ ওই লোক ব্রিটানিয়া রোডের ধারেকাছেও যায়নি… এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে যে-কোনো পরিমাণ টাকার বাজি ধরতে রাজি আছি আমি।’
‘কী বললেন?’ রেগে গেছেন মিডোস। ‘আমার থিউরি ভুয়া? পুলিশ ডিপার্টমেন্টে যখন ছিলাম তখন ফালতু সব থিউরি দিতাম? আপনি নিজে যখন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন তখন কী ছিলেন, জানেন? জঘন্য একটা বেজন্মা। আপনার চাকরি যে চলে গেল, সেজন্য আমরা সবাই কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম, হয়তো জানেনও না।’
‘আপনি যাদেরকে টার্গেট করেছিলেন তাদের কপালে কী ঘটেছে, সেসব আসলে লজ্জাজনক ব্যাপার ছাড়া আর কিছু না।’ সমান তেজের সঙ্গে বলল হোথর্ন, চকচক করছে ওর দুই চোখ। ‘শুনেছি আমি চলে আসার পর ওই লোকদের সবাই নাকি কমবেশি বিপদে পড়েছে। যা-হোক, ব্যক্তিগত কথা যখন চলেই এল… শুনলাম আজ বাদে কাল নাকি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটতে চলেছে আপনার?’
‘কথাটা কে বলেছে আপনাকে?’ দেখে মনে হলো, একটুখানি হলেও ঝাঁকুনি খেয়েছে মিডোস।
‘আপনার সারা গায়ে লেখা আছে সেটা।’
ভুল বলেনি হোথর্ন। দেখে সাংঘাতিক অবহেলিত বলে মনে হচ্ছে মিডোসকে। কুঁচকে আছে তার স্যুট। শার্টটা ইস্ত্রি করা হয়নি কতদিন কে জানে। এমনকী শার্টের একটা বোতাম উধাও। অর্থাৎ তার স্ত্রী হয় মারা গেছে নয়তো তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে।
হয়তো তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যেত মিডোস আর হোথর্নের মধ্যে, কিন্তু তখনই হাজির হলো কফিনটা… দেখতে পেলাম, ঘেসো জমিনে নামিয়ে রাখা হলো সেটা, শুনতে পেলাম ক্যাচক্যাচ করে উঠল কফিনের কাঠ। কফিনের নিচে দুটো দড়ি আছে। ওটা দিয়ে পুরো কফিন পেঁচিয়ে বেঁধে দিতে কিছু সময় লাগল চার কফিন- বাহকের। দেখতে পেলাম, ওই লোকগুলোর দিকে সপ্রংশস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইরিন ল্য।
তাকালাম ড্যামিয়েন ক্যুপারের দিকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে। পাশে কে আছে না-আছে সে-ব্যাপারে উদাসীন বলে মনে হচ্ছে তাকে। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে গ্রেস, কিন্তু ড্যামিয়েনের হাত ধরেনি গ্রেস। বেশ কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন ফটোগ্রাফারকে দেখেছিলাম; দূরে দাঁড়িয়ে আছে তারা, তবে তাদের ক্যামেরায় যুম লেন্স আছে। ধারণা করে নিলাম, যেসব ছবি তোলা দরকার তাদের, সেসব ছবি দূর থেকেই তুলে নিতে পারছে।
‘কফিনটা কবরে নামানোর সময় হয়েছে,’ জানান দিলেন ভিকার। ‘আসুন আমরা সবাই পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়াই। খুবই বিশেষ একটা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, আসুন আমরা সবাই নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তা করি ওই ব্যাপারে।’
কফিন নামানো হচ্ছে কবরে। আমার মনে হলো, কবরটা যেন অপেক্ষা করছিল ওই কফিনের জন্য। কবর ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ছোটখাটো একটা জটলা। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কবরে-কফিন-নামানোর দৃশ্য। রুমাল হাতে একটা লোককে দেখেছিলাম কিছুক্ষণ আগে, এখন খেয়াল করলাম ওটা দিয়ে চোখের কোনা মুছছেন তিনি। ব্রুনো ওয়াঙের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রেমন্ড ক্লন্স, নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় সংক্ষিপ্ত আলাপ সেরে নিলেন তাঁরা।
কবরের জমিনে কফিনটা নামিয়ে দিল চার কফিন-বাহক।
আর ঠিক তখনই, অনেকটা হঠাৎ করেই, বেজে উঠল একটা গান। গানটা বাচ্চাদের… একটা নার্সারি রাইম….
দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড
অল ডে লং।
শব্দের মান বেশি ভালো না… কেমন যেন ফিনফিনে। শুনে মনে হচ্ছে, কোথাও যেন টুংটুং আওয়াজ হচ্ছে। প্রথম যে-চিন্তা আমার মাথায় এল তা হচ্ছে, কারও মোবাইল বাজছে। যাঁরা শোক প্রকাশ করতে এসেছেন তাঁরা তাকাচ্ছেন একজন আরেকজনের দিকে। আমার মতো সবাই হয়তো ভাবছেন, কার মোবাইল বাজছে। হয়তো ভাবছেন, এতগুলো লোকের মধ্যে কে বিব্রত হতে চলেছে। আগে বাড়ল আইরিন লয, সতর্ক হয়ে উঠেছে। কবরের সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে আছে ড্যামিয়েন ক্যুপার। আতঙ্ক আর উন্মত্ততার একটা মিশ্র আবেগ দেখা দিয়েছে তার চেহারায়। নিচের দিকে নির্দেশ করল, কী যেন বলল গ্রেস লোভেলকে। না-শুনতে পেলেও বুঝতে পারলাম, কী বলতে চাইছে সে।
