সবশেষে ড্যামিয়েনের পালা। উঠে দাঁড়াল সে, ধীর পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল। ঘুরল। এখন ওর মায়ের কফিনের দিকে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। যা বলল, সংক্ষেপে বলল; আবেগের লেশমাত্র পেলাম না ওর কথায়।
‘বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র একুশ। এখন আমি আমার মাকেও হারিয়েছি। মায়ের সঙ্গে যা ঘটেছে তা মেনে নেয়া কষ্টকর, কারণ বাবা অসুস্থ অবস্থায় মারা গেছেন, কিন্তু মায়ের উপর হামলা চালানো হয়েছে তাঁরই বাসায়। ঘটনাটা যখন ঘটেছে, আমি তখন আমেরিকায়। যা-হোক, মাকে বিদায় বলার সুযোগ পাইনি, সেজন্য সব সময় খারাপ লাগবে আমার। তবে এটা জানি, আমি যা করছি, তার জন্য আমাকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। এবং আমার মনে হয়, তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে আমার নতুন শো উপভোগ করতে পারতেন… আগামী সপ্তাহ থেকে শুটিং শুরু হবে সেটার। নাম হোমল্যান্ড… এ- বছরের শেষ-নাগাদ প্রদর্শিত হবে।
‘আমি যে একজন অভিনেতা হতে চেয়েছি, সেটা সব সময় সমর্থন করেছেন মা। আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমি একদিন তারকা হতে পারবো। যখন স্ট্র্যাটফোর্ডে ছিলাম, তখন আমার প্রতিটা প্রোডাকশন্সে গেছেন তিনি… দ্য টেম্পেস্টে এরিয়েল, হেনরি ফাইভ, ডক্টর ফস্টার্সে মেফিস্টোফিলিস। শেষের চরিত্রটা খুব প্রিয় ছিল তাঁর। তিনি সব সময় বলতেন, আমি নাকি তাঁর পুঁচকে শয়তান।
কথাটা শুনে, গুঞ্জনমিশ্রিত সহানুভূতির হাসি শোনা গেল শ্রোতাদের পক্ষ থেকে।
‘এখন থেকে আমি যখন স্টেজে থাকবো,’ বলছে ড্যামিয়েন, ‘তখন দর্শকদের সারির দিকে তাকিয়ে সব সময় খুঁজবো মাকে। কিন্তু আর কখনোই খুঁজে পাবো না তাঁকে… তাঁর আসন সব সময়ই খালি থাকবে। তাঁর সেই টিকিট বিক্রি করে দেয়া যেতে পারে অন্য কারও কাছে…
ড্যামিয়েনের শেষের কথাটার মানে বোঝা গেল না ঠিক। সে কি মজা করছে? আমার আইফোনে রেকর্ড করে নিচ্ছিলাম ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথাগুলো। ওর বক্তৃতার এই পর্যায়ে এসে মনোযোগ হারিয়ে ফেললাম, কী বলছে সে তা আর শুনছি না। আরও কয়েক মিনিট কথা বলল সে, তারপর সাউন্ড সিস্টেমে বাজতে শুরু করল ‘এলিনর রিগবি’। খুলে দেয়া হলো সবগুলো দরজা, বাইরে বের হয়ে কবরস্থানে হাজির হলাম আমরা সবাই। উসুখুসু চুলের সেই লোক আমাদের ঠিক সামনে আছেন এখন! দ্বিতীয়বারের মতো চোখ মুছতে দেখা গেল তাঁকে।
কবরস্থানের পশ্চিম পাশে সমান ব্যবধানে স্থাপন করা হয়েছে কতগুলো স্তম্ভ, সেগুলোর পেছনে হাজির হলাম আমরা। একদিকের নিচু একটা দেয়ালের পাশে, অবিন্যস্ত ঘাসে ছাওয়া জমিনে খোঁড়া হয়েছে একটা কবর। দেয়ালের ওপাশে রেললাইন আছে। ওটা দেখা যাচ্ছে না, তবে যখন কবরটার দিকে এগোচ্ছি আমরা, তখন একটা ট্রেন চলে গেল সেখান দিয়ে… আওয়াজ শুনতে পেলাম।
একটা সমাধিফলকের উপর নজর পড়ল আমার। সেটাতে লেখা আছে: লরেন্স ক্যুপার, ৩ এপ্রিল ১৯৫০– ২২ অক্টোবর ১৯৯৯, দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় ভুগবার পর এবং তিতিক্ষার শেষে। মনে পড়ে গেল, কেন্টে থাকতেন তিনি, এবং সম্ভবত সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁকে এই জায়গায় সমাহিত করা হলো কেন, ভেবে আশ্চর্য লাগল।
আমাদের মাথার উপর ঝকঝক করছে সূর্যটা। তবে কয়েকটা গাছ ছায়া দিচ্ছে আমাদেরকে। বেলা বাড়ছে, আবহাওয়া মনোরম আর উষ্ণ। মৃতদেহের শেষযাত্রায় সেটাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য আমাদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপার আর গ্রেস লভেল। ওদের সঙ্গে আছেন ভিকারও। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা, এমন সময় ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর মিডোস এগিয়ে এল আমাদের দিকে
‘কেমন চলছে, হোথৰ্ন?’
‘খুব একটা খারাপ না, জ্যাক।’
অবজ্ঞার ভঙ্গিতে নাক সিঁটকাল মিডোস। ‘কোনো সমাধান বের করতে পেরেছেন? আপনি নিশ্চয়ই এত জলদি সমাধান করে ফেলতে চান না এই কেস?’
‘আসলে আপনার পক্ষ থেকে কোনো একটা জবাবের জন্য অপেক্ষা করছি আমি,’ বলল হোথর্ন।
সেক্ষেত্রে হতাশ করতে হচ্ছে আপনাকে। কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা… ‘আসলেই?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। মিডোস যদি হোথর্নের আগে সমাধান করে ফেলে এই কেস, তা হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার বইয়ের।
‘হ্যাঁ। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারবেন সব। এবং সেটা খুব শীঘ্রই। তবে এখন একটা কথা বলে রাখি আপনাকে… ব্রিটানিয়া রোডে সাম্প্রতিক সময়ে তিন- তিনটা চুরির ঘটনা ঘটেছে। এবং সবগুলো ঘটনার ধরণ প্রায় একইরকম… প্যাকেজ ডেলিভারির বাহানায় ডিসপ্যাঁচ রাইডারের বেশ ধরে হাজির হয়েছিল চোর। মোটরবাইকের হেলমেটে ঢাকা পড়ে ছিল তার চেহারা। এবং প্রতিবারই সে টার্গেট করেছে এমন সব মহিলাদের, যাঁরা নিজেদের বাসায় একা থাকতেন।’
‘এবং সে কি তাঁদের সবাইকে খুন করেছে?’
‘না। প্রথম দু’জনকে ধোলাই দিয়েছে। তারপর নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়েছে কাবার্ডে, তালা দিয়ে আটকে রেখেছে সেখানে। এরপর তোলপাড় করে ফেলেছে পুরো বাসা। কিন্তু তার তৃতীয় শিকার অত বোকা ছিলেন না। বরং বলা যায় বেশ চালাক-চতুর ছিলেন। বাসায় ঢুকতে দেননি তিনি ওই লোককে। ফোন করেছিলেন ট্রিপল নাইনে। যা-হোক, এখন আমাদের জানা আছে, কার খোঁজ করছি আমরা। সিসিটিভি ফুটেজ দেখছি। আমার মনে হয় বাইকটা খুঁজে বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না আমাদেরকে। আর ওটা খুঁজে পেলে ওটার মালিককেও ধরতে পারবো আশা করি।
