যাঁরা হাজির হয়েছেন এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তাঁদেরকে দেখছি আমি। আশ্চর্য লাগছে… অনেক কম লোক এসেছেন, বারো-তেরোজনের বেশি হবে না। একেবারে সামনের সারিতে বসেছেন ব্রুনো ওয়াং আর রেমন্ড ক্লন্স, তবে নিজেদের মাঝখানে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। আন্দ্রিয়ার পরনে সস্তা কালো চামড়ার-জ্যাকেট, একপাশে বসেছে। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জ্যাক মিডোসকেও দেখতে পাচ্ছি। থেকে থেকে হাই তুলছে। বসতে অস্বস্তি হচ্ছে তার… যে-চেয়ারে বসেছে সেটা বোধহয় ছোট হয়ে গেছে শরীরের তুলনায়।
এই অনুষ্ঠানে কোনো এক তারকার ভূমিকায় যে অভিনয় করতে হবে, জানা ছিল ড্যামিয়েন ক্যুপারের। চমৎকার ছাঁটের স্যুট, ধূসর শার্ট, আর সিল্কের কালো টাই পরেছে। তার পাশেই দেখতে পাচ্ছি গ্রেস লভেলকে। পরনে কালো পোশাক। তাদের দু’জনের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসেছেন বাকিরা। ভাবখানা এমন, ড্যামিয়েন আর গ্রেস যেখানে বসেছে, সে-জায়গা যেন কোনো ভিআইপি এরিয়া যেন সে-জায়গার ধারেকাছে যাওয়া যাবে না। ড্যামিয়েনের পেছনে পেশীবহুল এক কৃষ্ণাঙ্গ লোক বসে আছে; অনুমান করে নিলাম, লোকটা ড্যামিয়েনের বডিগার্ড।
অন্য যাঁরা এসেছেন, তাঁদের সবাইকে চিনি না আমি; তবে আমার ধারণা, তাঁরা মিসেস ক্যুপারের হয় বন্ধু নয়তো সহকর্মী। কারও বয়সই পঞ্চাশের নিচে না। একেকজনের চেহারায় একেক রকম আবেগ দেখতে পাচ্ছি… বিরক্তি, কৌতূহল, গাম্ভীর্য। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, কারও চেহারাতেই দুঃখের কোনো ছাপ নেই। শোকের ছায়া দেখতে পাচ্ছি শুধু একজনের চেহারায়… লম্বাটে এক লোক, মাথায় এলোমেলো চুল, বসে আছেন আমার থেকে কয়েক চেয়ার দূরে। ভিকার উঠে দাঁড়িয়ে যখন এগিয়ে গেলেন কফিনের দিকে, ওই লোক তখন পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলেন।
গির্জার ভিকার একজন মহিলা। তিনি বেঁটেখাটো, নাদুসনুদুস। দুর্বল হাসি লেপ্টে আছে চেহারায়। আর দশজন ভিকারের তুলনায় ভাবভঙ্গিতে আধুনিক। যে- সুর বাজছে, সেটা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, তারপর আগে বাড়লেন। হাতে হাত ঘষলেন, এরপর বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যালো, এভরিবডি। খুবই সুন্দর এই গির্জায় আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি খুব খুশি। রোমের সেইন্ট পিটার্সের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৩৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছে এই গির্জা। চমৎকার একজন মহিলাকে শেষবারের মতো সম্মান জানানোর জন্য আজ এখানে একত্রিত হয়েছি আমরা; আমার ধারণা, ওই কাজ করার জন্য এই গির্জা বিশেষ একটা জায়গা, সুন্দর একটা জায়গা। আমরা যারা বেঁচে থাকি, তাদের জন্য মৃত্যু সব সময়ই কঠিন কিছু। ডায়ানা ক্যুপারকে আচমকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে জীবনের পথ থেকে। নিষ্ঠুর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি। কেন এ-রকম করা হলো তাঁর মতো একজন মানুষের সঙ্গে, এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি আমরা কেউ।
‘ডায়ানা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সব সময়ই সাহায্য করতে চাইতেন অন্যদেরকে। অনেক টাকা দানখয়রাত করেছেন তিনি। গ্লোব থিয়েটারের বোর্ড অভ ডিরেক্টর্সে ছিলেন। তাঁর ছেলে একনামে পরিচিত আমাদের সবার কাছে। মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য সেই আমেরিকা থেকে এখানে উড়ে এসেছেন ড্যামিয়েন। যে-কষ্ট লাগছে তাঁর, সেটা টের পাচ্ছি আমরা; তারপরও বলবো, তাঁকে আজ এখানে দেখতে পেয়ে আমরা সবাই খুশি।’
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আমি। দেখতে পেলাম আন্ডারটেকার রবার্ট কর্নওয়ালিসকে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফিসফিস করে কী যেন বলছে আইরিন লযকে। শেষকৃত্যের জন্য আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে আছে তারা দু’জনই। খেয়াল করলাম, আইরিন লয মাথা ঝাঁকাল, এবং তারপরই বাইরে চলে গেল কর্নওয়ালিস।
স্টিভেন স্পিলবার্গ আর পিটার জ্যাকসনের কথা কেন যেন মনে পড়ে গেল আমার। হয়তো এখনও সোহো হোটেলে আছেন তাঁরা দু’জন। অথবা হয়তো একটু তাড়াতাড়িই সেরে নিচ্ছেন আজকের লাঞ্চটা। তাঁদের সঙ্গে থাকার কথা ছিল আমার! টের পেলাম, আমাকে যে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে, সেজন্য ক্রোধ জেগে উঠছে আমার মনে।
‘ডায়ানা ক্যুপার ছিলেন এমন একজন মানুষ,’ বলছেন ভিকার, ‘যিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে। আজকের এই অনুষ্ঠানের সব কিছু আয়োজন করে গেছেন তিনি। এমনকী এইমাত্র যে-সুর শুনলেন আপনারা, সেটাও। যা-হোক, বাইবেলের গীতসংহিতার সাম থার্টি ফোর (Psalm 34 ) দিয়ে এই অনুষ্ঠানের কাজ শুরু করতে চাই আমি। আমার ধারণা, ডায়ানা যখন বেছে নিয়েছিলেন এই প্রার্থনাস্তব, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মৃত্যু আসলে ভয়ের কোনো কিছু না। কারণ এই স্তবকে বলা হয়েছে, ধার্মিক লোকের অনেক সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু প্রভু তাঁকে সব কিছু থেকে উদ্ধার করেন।’
বিশেষ ওই স্তব পাঠ করলেন ভিকার।
তারপর উঠে দাঁড়াল গ্রেস লোভেল। এগিয়ে গেল সামনে, সিলভিয়া প্লাথের ‘এরিয়েল’ আবৃত্তি করে শোনাল।
স্ট্যাটিস ইন ডার্কনেস
দেন দ্য সার্ক্সট্যান্সলেস ব্লু
পোর অভ টোর অ্যান্ড ডিসট্যান্সেস…
কবিতাটা সে মুখস্ত করে ফেলেছে দেখে ভালো লাগল আমার। শুধু মুখস্ত করেনি, আন্তরিকভাবে আবৃত্তিও করেছে।
সুন্দর দুই চোখ মেলে অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টিতে লোভেলের দিকে তাকিয়ে আছে ড্যামিয়েন। কে যেন হাই তুলল আমার পাশে। তাকিয়ে দেখি, হোথৰ্ন।
