আমি সাধারণত কারও শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিই না। আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন ভয়ঙ্কর মনে হয়। ও-রকম কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিলে কেমন যেন মনমরা হয়ে যাই। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, বয়স যত বাড়ছে আমার, কারও-না-কারও শেষকৃত্যে যোগ দেয়ার প্রস্তাব আসছে তত। অর্থাৎ আমার পরিচিত লোকেরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছেন এই পৃথিবী থেকে। বন্ধুবান্ধব আর পরিচিত লোকদের উপকার করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এমন কোনো ব্যবস্থা করে যাবো, যাতে আমার শেষকৃত্যে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো না-হয় তাদেরকে।
যাঁরা শোক জানাতে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন চিনতে পারছি আমি। আন্দ্রিয়া কুভানেক এসেছে। সে হয়তো বিদায় জানাতে চাইছে তাঁর পুরনো নিয়োগকর্ত্রীকে। গির্জার একটা কোনা সবে ঘুরেছি আমরা, সঙ্গে সঙ্গে একদিকের একটা দরজা দিয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা।
রেমন্ড কন্সকেও দেখতে পেলাম। নতুন-কেনা কালো একটা কাশ্মীরি কোট পরে আছেন তিনি। শুধু এই অনুষ্ঠানের জন্যই ওই কোট কিনেছেন, সন্দেহ হলো আমার। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন দাড়িওয়ালা এক যুবককে… ছেলেটা সম্ভবত তাঁর পার্টনার।
নার্ভাস দৃষ্টিতে তাকালাম হোথর্নের দিকে। সরু চোখে, সতর্ক দৃষ্টিতে ওই দু’জনকেই দেখছে সে। কিছু বলল না।
আরও একজন লোক আমাদের-মতোই-একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কুন্সের দিকে। চেহারা দেখলে বোঝা যায় লোকটা হংকং চাইনি। মাথার লম্বা কোঁকড়া চুল নেমে এসেছে কাঁধের উপর। নিখুঁত ছাঁটের স্যুট পরেছেন, সঙ্গে সাদা শার্ট। পায়ে চকচকে কালো শু। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই লোককে চিনি আমি। তাঁর নাম ব্রুনো ওয়াং। ক্রুন্সের মতো তিনিও একজন থিয়েটার প্রযোজক। পাশাপাশি একজন সুপরিচিত জনহিতৈষী। যে-দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কুন্সের দিকে, সেটা দেখে বুঝতে পারলাম, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই তাঁদের দু’জনের মধ্যে।
দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকবো আমি আর হোথর্ন, এমন সময় দেখা হয়ে গেল ওয়াঙের সঙ্গে। কুশলাদি বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে, ডায়ানা ক্যুপারকে চিনতেন আপনি?’
‘তিনি আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু ছিলেন,’ জবাবে বললেন ওয়াং। নরম গলায় ধীরেসুস্থে কথা বলেন, শুনলে মনে হয় পরের বাক্যটা ভাবছেন মনে মনে, অথবা যেন আবৃত্তি করছেন কোনো কবিতা। ‘তিনি ছিলেন এমন একজন মহিলা, যাঁর মনে ছিল অনেক দয়া আর আন্তরিকতা। যখন শুনলাম মারা গেছেন তিনি, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আর আজ… এখানে হাজির হওয়ার পর… আমার মনটা বলতে গেলে ভেঙে যাচ্ছে।’
‘আপনি যেসব মঞ্চনাটক প্রযোজনা করতেন, সেগুলোতে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি কখনও?’
‘না… দুঃখজনক হলেও সত্যি কথাটা। কাজটা করতে অনেকবার অনুরোধ জানিয়েছিলাম তাঁকে। কারণ আমি জানতাম, তাঁর রুচি একেবারেই অন্যরকম। যা- হোক, ত্রুটি বলতে যদি কোনো কিছু ছিল তাঁর, তা হলে সেটা হলো, খুবই দয়ালু একটা মন। সবাইকে খুব বিশ্বাস করতেন তিনি 1 …কয়েক সপ্তাহ আগেও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমি। তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম…’
‘কোন্ ব্যাপারে?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন, আমাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সামনে চলে এসেছে।
এদিক-ওদিক তাকালেন ওয়াং। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কেউ নেই বলা যায়। আমাদেরকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে বাকিরা, ঢুকে পড়েছে মূল গির্জার ভিতরে।
ওয়াং বললেন, ‘ওই ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছি না।’
‘কেন, কী সমস্যা?’
আমি ভাবলাম, হোথর্নকে আসলে চিনতে পারেননি ওয়াং, তাই মুখ খুলতে চাইছেন না। বললাম, এঁর নাম ড্যানিয়েল হোথর্ন। পুলিশের একজন তদন্তকারী অফিসার। মিসেস ক্যুপারের কেসটা তদন্ত করছেন।’
‘রেমন্ড ক্লন্সকে চেনেন আপনি?’ জানতে চাইল হোথর্ন। খেয়াল করেছে, কিছুক্ষণ আগে ক্লুন্সের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ওয়াং।
‘ঠিক চিনি বলা যাবে না। তবে… দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে আমাদের মধ্যে।’
‘তারপর?’
‘অন্য কারও ব্যাপারে খারাপ কিছু বলতে চাই না… বিশেষ করে এ-রকম কোনো জায়গায়। যা-হোক… যদি কিছু মনে না-করেন…. শেষকৃত্যানুষ্ঠানটা মিস করতে চাই না।’ তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন ওয়াং, ঢুকে পড়লেন গির্জার ভিতরে।
এখন আমরা দু’জন একা।
হোথর্ন বলল, ‘আভাসে-ইঙ্গিতে যা বললেন ওয়াং, শুনে অনুমান করে নিচ্ছি, মিস্টার কুন্সের সঙ্গে কোনো-একটা ঝামেলা চলছিল মিসেস ক্যুপারের। এবং সেটা মিটমাট করে নিতে চাইছিলেন তিনি। ‘
আমাদের থেকে কিছুটা দূরে, হাতে ক্যামেরা নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে দু’জন লোক। এতক্ষণ খেয়াল করিনি ওদেরকে; একজনকে একটা ছবি তুলতে দেখে তাকালাম সেদিকে।
নিচু গলায় বিশ্রী একটা গালি দিল হোথর্ন।
ওর সেই গালি অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হলো না আমার। নিশ্চয়ই ড্যামিয়েন ক্যুপারের ছবি তুলবার জন্য এখানে হাজির হয়ে গেছে ওই সাংবাদিকেরা।
গির্জার ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা দু’জন।
ভিতরটা অনেকটা গোলাকার। সারি সারি পিলারের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজাকৃতির একটা ছাদ। জানালা আছে বেশ কয়েকটা, কিন্তু সেগুলোর সবই মেঝে থেকে অনেক উঁচুতে, ফলে আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না বাইরের। আমাদের সামনেই ধরাধরি করে নিয়ে আসা হলো কফিনটা। সেটা যেখানে রাখা হলো, সে-জায়গার মুখোমুখি লাগিয়ে দেয়া হয়েছে গোটা চল্লিশেক চেয়ার। তাকালাম কফিনটার দিকে। সেটা যতটা না কফিন বলে মনে হচ্ছে আমার, তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে একটা পিকনিক বাস্কেট। চামড়ার দুটো স্ট্র্যাপের সাহায্যে মূল কাঠামোর সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে ঢাকনাটা। হলুদ-সাদা ফুলের একটা মালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঢাকনার উপর। স্পিকার সিস্টেম আছে গির্জার ভিতরে; সেটাতে নিচু ভলিউমে বাজছে জেরেমিয়াহ ক্লার্কের ট্রাম্পেট। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল আমার কাছে। কারণ ওই বাজনা সাধারণত ব্যবহৃত হয় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে।
