পিটার জ্যাকসন আর স্পিলবার্গের দিকে তাকিয়ে হোথর্ন বলল, ‘আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং কথা বলতে পেরে ভালো লাগল।’
‘অবশ্যই,’ বললেন স্পিলবার্গ। ‘ড্যামিয়েনকে আমার সমবেদনা জানিয়ে দেবেন প্লিয।’
‘ঠিক আছে, জানাবো।’
এবার আমার দিকে তাকালেন স্পিলবার্গ। ‘চিন্তা করবেন না, অ্যান্টনি। আপনার এজেন্টকে সময়মতো ফোন করবো আমরা।’
কিন্তু সে-ফোন আর আসেনি কখনও স্পিলবার্গের পক্ষ থেকে। টিনটিনকে নিয়ে প্রথম যে-সিনেমা বানিয়েছিলেন তিনি, সেটার নাম দ্য সিক্রেট অভ দ্য ইউনিকর্ন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছিল সিনেমাটা, কিন্তু সারা পৃথিবীতে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করতে পারেনি। ওদিকে আমেরিকায় তেমন একটা সাড়া পাওয়া যায়নি এই সিনেমার ব্যাপারে। আর সে-কারণেই হয়তো টিনটিনকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি স্পিলবার্গ। অথবা হয়তো কাজ করছেন এখন… তবে আমাকে ছাড়া।
বাইরের করিডরে যখন বেরিয়ে এলাম হোথর্নের সঙ্গে, আমাকে সে বলল, ‘তাঁদের দু’জনকে চমৎকার বলে মনে হলো আমার কাছে।’
‘যিশুর দোহাই লাগে চুপ করুন!’ এতক্ষণে বিস্ফোরিত হলাম আমি। ‘বার বার বলেছিলাম ওই শেষকৃত্যে যেতে চাই না। কেন এখানে হাজির হলেন আপনি? এখানে যে আছি আমি, সেটাই বা জানতে পারলেন কী করে?’
‘আপনার অ্যাসিস্টেন্টকে ফোন করেছিলাম।’
‘আর মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে গড়গড় করে সব বলে দিয়েছে আপনাকে?’
‘শুনুন,’ আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করল হোথর্ন। ‘টিনটিনকে নিয়ে কোনো কাজ করতে চান না আপনি আসলে। কারণ এটা বাচ্চাদের জন্য। আমি ভেবেছিলাম বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করা বন্ধ করে এবার বড়দের জন্য কিছু করতে চাইছেন।’
‘বাচ্চাদের জন্য! সিনেমাটা প্রযোজনা করতে যাচ্ছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ!’
‘আপনি যে-বই লিখবেন আমাকে নিয়ে, দরকার হলে সেটা নিয়ে সিনেমা বানাবেন তিনি। একটা হত্যারহস্য! ওদিকে ড্যামিয়েন ক্যুপারকেও ভালোমতো চেনা আছে তাঁর।’
হোটেলের সদর-দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় হাজির হলাম আমরা।
হোথর্ন বলল, ‘আমাকে নিয়ে যদি কোনো সিনেমা বানানো হয়, তা হলে সেটাতে আমার ভূমিকায় অভিনয় করবে কে, বলতে পারেন?’
১১. শেষকৃত্যানুষ্ঠান
ব্রম্পটন সেমেট্রি ভালোমতোই চিনি। আমার বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখন ওই কবরস্থান থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে এক ফ্ল্যাটে একটা রুমে থাকতাম। ওই কবরস্থানে বসে লেখালেখি করে পার করে দিতাম গ্রীষ্মের উষ্ণ বিকেলগুলো। কখনও কখনও উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাহাঁটি করতাম সেখানে। কবরস্থানটা ছিল নিরিবিলি এক জায়গায় … ধুলো আর ট্রাফিক থেকে দূরে। আমার নিজের আলাদা একটা জগৎ ছিল সেখানে।
আমার কাছে ওই সেমেট্রি লন্ডনের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক আর হৃদয়গ্রাহী কবরস্থান বলে মনে হয়েছে সব সময়। কবরস্থানের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত একটা পথ চলে গেছে সরলরেখার মতো। রৌদ্রোজ্জ্বল কোনো দিনে যখন সে-পথ ধরে হাঁটতাম, মনে হতো, প্রাচীন রোমে হাজির হয়েছি যেন। নিজের জন্য খুঁজে নিতাম কোনো একটা বেঞ্চ, নোটবুকটা নিয়ে বসে পড়তাম সেখানে। কাঠবিড়ালি দেখতে পেতাম অনেক। মাঝেমধ্যে দেখা মিলত নিঃসঙ্গ কোনো শেয়ালের। কোনো কোনো শনিবার বিকেলে ও-রকম কোনো বেঞ্চে বসে শুনতে পেতাম স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ ফুটবল ক্লাবের সমর্থকদের হুল্লোড়ের আওয়াজ। কবরস্থানের গাছের সারির ওপাশেই ছিল ক্লাবটা।
লন্ডনের কোনো কোনো জায়গা আমার-লেখালেখিতে কী বিচিত্র সব ভূমিকা পালন করেছে, ভাবলে আশ্চর্য লাগে এখন। সে-রকম এক ভূমিকা পালন করেছে থেমস নদী। এবং, নিঃসন্দেহে, অন্য এক ভূমিকা পালন করেছে ব্রম্পটন সেমেট্রি।
এগারোটা বাজতে মিনিট দশেক বাকি আছে, এমন সময় ওই কবরস্থানে পৌঁছালাম আমি আর হোথর্ন। মেইন গেটের দু’পাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে দুটো লাল টেলিফোন বক্স; সেগুলোর মাঝখান দিয়ে পথ করে নিতে হলো আমাদেরকে। একটা সরু আর আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগোচ্ছি, পথনির্দেশক খুঁটি আছে এখানে। যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে নামিয়ে রাখা যায় ওটা। শোক প্রকাশ করতে এসেছে, এ-রকম কয়েকজন লোক হাঁটছে আমাদের আগে।
কবরস্থানের এই জায়গায় লতাগুল্মের সংখ্যা বেশি। এককোনায় দেখতে পেলাম মস্তকবিহীন একটা মূর্তি। সেটার একটা হাতও খসে পড়ে গেছে। আইফোনটা বের করলাম আমার পকেট থেকে, ছবি তুললাম ওই মূর্তির। অনতিদূরের ঘেসো জমিনে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে কয়েকটা কবুতর। ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে কী যেন।
পথের একটা কোনা ঘুরতেই সামনে দেখা মিলল ব্রম্পটন চ্যাপেলের। গির্জাটার পেছনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা। খোলা দরজার পাশে কক্রীটে- বাঁধাই-করা চত্বরে নিথর দাঁড়িয়ে আছে একটা শবযান। কাঠের যে-কফিনের অর্ডার করেছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেটা নিশ্চয়ই ওই শবযানের ভিতরেই আছে। আর সেটার ভিতরে… ভাবতে গিয়ে কেমন একটা মোচড় অনুভব করলাম তলপেটের ভিতরে… নিথর শুয়ে আছেন ওই ভদ্রমহিলা। কালো টেইলকোট পরিহিত চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পাশে; আমার ধারণা তারাই বহন করে গির্জার ভিতরে নিয়ে আসবে মিসেস ক্যুপারের কফিন।
মেইন এন্ট্রেন্সের সামনে হাজির হলাম আমি আর হোথর্ন। এখানে চার- পিলারযুক্ত একটা দরজা মুখ করে আছে উত্তরদিকে। ওই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকবার জন্য ছোট একটা ভিড় তৈরি হয়েছে। উপস্থিত লোকদের কেউ কথা বলছে না অন্য কারও সঙ্গে। মাথা নিচু করে আছে সবাই… যেন এখানে আসতে হয়েছে বলে অপ্রস্তত বোধ করছে। ডায়ানা ক্যুপারকে কখনও দেখিনি আমি, অথচ তাঁর জন্য যাঁরা শোক জানাতে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি… ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগছে আমার কাছে। সপ্তাহখানেক আগে ওই মহিলার ব্যাপারে কখনও কিছু শুনিওনি।
