‘টনি,’ বলল সে, ‘আপনাকে খুঁজছিলাম।’
‘ব্যস্ত আছি,’ বললাম আমি, টের পেলাম রক্তের আকস্মিক জোরালো-প্রবাহে লাল হয়ে গেছে আমার গাল।
‘জানি। শেষকৃত্যানুষ্ঠান!
দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন।
‘আপনাকে আগেও বলেছি, আবারও বলছি। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া সম্ভব না আমার পক্ষে।
‘কে মারা গেছেন?’ জিজ্ঞেস করলেন পিটার।
তাঁর দিকে তাকালাম আমি। আসলেই উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে তাঁকে। টেবিলের আরেকধারে তখন পিঠ খাড়া করে বসে আছেন স্পিলবার্গ, বিরক্ত মনে হচ্ছে তাঁকে। অনুমান করে নিলাম, এমন একটা পৃথিবীতে বাস করেন তিনি, যেখানে অপ্রত্যাশিত কারও হঠাৎ ঢুকে পড়ার কোনো সুযোগ নেই… অথবা যদি ঢোকেও, তাঁর কোনো অ্যাসিস্টেন্টকে সঙ্গে না-নিয়ে ঢুকতে পারবে না। কারণ এসবের সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
‘কেউ না,’ পিটারের প্রশ্নের জবাবে বললাম আমি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, হোথর্ন ঢুকে পড়েছে এ-রকম একটা জায়গায়। সে কি ইচ্ছাকৃতভাবে বিব্রতকর একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে চাইছে আমাকে? ওর দিকে তাকালাম। ‘আপনাকে বলেছি… আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না।’
‘কিন্তু আপনাকে যেতে হবে। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।’
‘আপনি কে?’ হোথর্নকে জিজ্ঞেস করলেন স্পিলবার্গ।
এমন ভঙ্গিতে স্পিলবার্গের দিকে তাকাল হোথর্ন যে, মনে হলো, এই প্রথমবারের মতো দেখতে পেয়েছে তাঁকে। ‘আমি হোথর্ন। পুলিশে আছি।’
‘আপনি একজন পুলিশ অফিসার?’
‘না,’ বলে উঠলাম আমি। ‘তিনি একজন পরামর্শদাতা। একটা তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করছেন পুলিশকে।
‘একটা হত্যারহস্য,’ ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল হোথর্ন। তাকিয়ে আছে স্পিলবার্গের দিকে, ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে তাঁকে চিনতে পেরেছে যেন। ‘আপনাকে কি চিনি আমি?’
‘আমি স্টিভেন স্পিলবার্গ।’
‘আপনি কি সিনেমা লাইনের কেউ?’
কাঁদতে ইচ্ছা হলো আমার।
‘হ্যাঁ। আমি সিনেমা বানাই …
‘তিনি স্টিভেন স্পিলবার্গ, আর এই ভদ্রলোকের নাম পিটার জ্যাকসন,’ পরিচয় করিয়ে দিলাম আমি; কিন্তু কেন করলাম কাজটা, জানি না। পরিস্থিতির উপর হয়তো নিয়ন্ত্রণ পেতে চাইছে আমার মনের একটা অংশ। অথবা হয়তো ভাবছি, কোনো-না-কোনোভাবে বশ করতে পারবো হোথর্নকে…. ওকে তখন বের করে দিতে পারবো এই রুম থেকে।
‘পিটার জ্যাকসন!’ চেহারা উজ্জ্বল হলো হোথর্নের। ‘লর্ড অভ দ্য রিংস সিনেমাটা আপনিই বানিয়েছিলেন না?’
‘হ্যাঁ। দেখেছিলেন ওটা?’
‘ছেলের সঙ্গে বসে ডিভিডিতে দেখেছিলাম। ওর ধারণা, সিনেমাটা দারুণ।’
‘ধন্যবাদ।’
‘আসলে… ওই সিরিযের প্রথম সিনেমাটার কথা বলছি আমি। দ্বিতীয় সিনেমাটার ব্যাপারে সে-রকম নিশ্চিত ছিল না সে। কী যেন নাম ছিল দ্বিতীয় সিনেমাটার…?’
‘দ্য টু টাওয়ার্স।’ হাসছেন পিটার, তবে সে-হাসি পুরোপুরি আন্তরিক না।
আরও একবার পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ পেতে চাইলাম আমি। ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হয়ে বিশেষ একজন পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন মিস্টার হোথর্ন। এখন যে-কেস নিয়ে কাজ করছেন তিনি, সেটার উপর একটা বই লেখার দায়িত্ব পেয়েছি আমি…’
‘বইটার নাম ‘হোথর্ন ইনভেস্টিগেটস’,’ বলল হোথৰ্ন।
‘নামটা পছন্দ হয়েছে আমার,’ বললেন স্পিলবার্গ।
‘নামটা ভালো,’ একমত হলেন জ্যাকসন।
হাতঘড়ির দিকে তাকাল হোথর্ন। ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল, ‘এগারোটায় অনুষ্ঠিত হবে ওই শেষকৃত্যানুষ্ঠান।’
‘এবং আমি আগেও বলেছি আবারও বলছি, সেখানে যাওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। কেন সম্ভব না, সেটাও দেখতে পাচ্ছেন আপনি চোখের সামনে।’
‘আপনাকে যেতে হবে, টনি। মানে… যে বা যারাই চিনতেন ডায়ানা ক্যুপারকে, তাঁরাই কিন্তু যাচ্ছেন ওই অনুষ্ঠানে। তাঁরা কে কী বলেন অথবা কী করেন, সেটা দেখার এ-ই সুযোগ।
‘ডায়ানা ক্যুপার,’ বললেন স্পিলবার্গ, ‘তার মানে ড্যামিয়েন ক্যুপারের মা?’
‘হ্যাঁ। গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। তাঁর নিজের বাড়িতেই।’
‘শুনেছি। গত মাসে ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। ওয়ার হর্স নামের একটা সিনেমার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল সে।’
‘বেচারা!’ আফসোস করলেন পিটার জ্যাকসন। ‘এভাবে মারা গেল ওর মা!’
‘ঠিক বলেছেন,’ বললেন স্পিলবার্গ।
তাঁরা দু’জনই তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। ভাবখানা এমন, আমি যেন সারাজীবন ধরে চিনি ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। এবং তার মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ না-দিয়ে আমি যেন জঘন্যতম কোনো কাজ করছি। আর হোথর্ন এমন এক ভাব ধরে আছে, যেন সে একজন দেবদূত … আমার শুভবুদ্ধির উদয় ঘটানোর জন্য হাজির হয়েছে।
স্পিলবার্গ বললেন, ‘আমার মনে হয় আপনার যাওয়া উচিত সেখানে, অ্যান্টনি।’
‘কিন্তু এই বইয়ের চেয়ে সিনেমাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে,’ বললাম আমি। পিটার বললেন, ‘আসলে… এই চিত্রনাট্যের ব্যাপারে বেশি কিছু বলার নেই এখন আর। কারণ আমরা যদি এটা নিয়ে কাজ করি, তা হলে সেটা হবে সিরিজের তিন নম্বর সিনেমা। আর দুই নম্বরটার ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারিনি আমরা। ওই ব্যাপারে না-হয় সপ্তাহ দু’-এক পর আলোচনা করা যাবে।
‘ইচ্ছা করলে কনফারেন্স কল করতে পারেন আপনি,’ বললেন স্পিলবার্গ।
তার মানে… টিনটিনের ব্যাপারে যে-আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেটা প্রকৃতপক্ষে দু’মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আমার এত সাধের চিত্রনাট্য বলতে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে আমাকেও। ব্যাপারটা মোটেও ভালো হয়নি আমার জন্য। পৃথিবীসেরা দু’জন চলচ্চিত্রনির্মাতার সঙ্গে আলোচনা করার কথা ছিল আমার, তাঁদের জন্য একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমাকে এখন যেতে হবে এমন কারও শেষকৃত্যে, যাঁকে কখনও সামনাসামনি দেখিনি।
