জবাবে কিছু বলার সুযোগ দিল না আমাকে। নজর সরিয়ে নিল গ্লাসের উপর থেকে, এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
১০. চিত্রনাট্যের সম্মেলন
মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা ছিল না আমার। কারণ যেদিন হওয়ার কথা ছিল ওই অনুষ্ঠান, তার আগের দিন ফোন পেলাম স্টিভেন স্পিলবার্গের অফিস থেকে। জানতে পারলাম, তিনি আর পিটার জ্যাকসন হাজির হয়েছেন লন্ডনে, টিনটিনের সেই চিত্রনাট্য নিয়ে কথা বলতে চাইছেন আমার সঙ্গে। আরও জানতে পারলাম, রিচমন্ড মিউসের সোহো হোটেলে উঠেছেন তাঁরা।
ওই হোটেল ভালোমতোই চিনি আমি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এককালে কার পার্কিং ছিল জায়গাটা। আর এখন পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেন্দ্রবিন্দুতে। হোটেলের চারদিকে সারি সারি প্রোডাকশন হাউস আছে। আরও আছে বিভিন্ন রকমের পোস্ট প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি। হোটেলের ভিতরে আছে দুটো স্ক্রিনিং রুম। গ্রাউন্ড ফ্লোরে আছে ‘রিফুয়েল’ নামের ব্যস্ত একটা রেস্টুরেন্ট। সেখানে দু’-একবার লাঞ্চ করেছি আমি।
পরের দুটো দিন ড্যামিয়েন ক্যুপার আর তার মায়ের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। ডুবে থাকলাম টিনটিনের সেই চিত্রনাট্য নিয়ে। কারণ আমার জানা ছিল না, পরিচালক হিসেবে জ্যাকসন অথবা প্রযোজক হিসেবে স্পিলবার্গ ঠিক কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন আমার কাজে।
যা-হোক, নির্ধারিত দিনে সকাল ঠিক দশটায় হাজির হয়ে গেলাম সোহো হোটেলে। দ্বিতীয় তলার একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে। বড় একটা কনফারেন্স টেবিল আছে সেখানে। সেটার উপর রাখা আছে তিনটা গ্লাস আর ফিজি মিনারেল ওয়াটারের একটা বোতল। কয়েক মিনিট পরই উপস্থিত হলেন পিটার জ্যাকসন। বরাবরের মতোই অমায়িক দেখাচ্ছে তাঁকে। আগে বেশ মোটা ছিলেন, ওজন অনেক কমিয়েছেন। পরনের কাপড় ঢলঢল করছে।
কথা শুরু হলো আমাদের মধ্যে। লন্ডন, এখানকার আবহাওয়া, এখনকার সিনেমা… ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো তাঁর সঙ্গে; কিন্তু চিত্রনাট্যটা নিয়ে কোনো কথা বললেন না তিনি।
রুমের দরজাটা খুলে গেল আবার, এবার ভিতরে ঢুকলেন স্পিলবার্গ। সব সময় বলতে-গেলে একইরকম কাপড় পরেন তিনি, আজও ব্যতিক্রম করেননি… চামড়ার একটা জ্যাকেট, জিন্স, ট্রেইনার্স আর বেসবল ক্যাপ। চশমা আর দাড়ি দেখামাত্র চেনা যায় তাঁকে।
সবসময়ের মতো আরও একবার নিজেকে আমার মনে করিয়ে দিতে হলো, চোখের সামনে যা ঘটছে তা সত্যি… যে-রুমে বসে আছেন স্পিলবার্গ সেখানে বসে আছি আমিও। আসলে তিনি এমন কেউ, যাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি বার বার।
সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন স্পিলবার্গ। জীবনে অনেক চিত্র-প্রযোজকের দেখা পেয়েছি আমি, তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অথবা কথা বলার সৌভাগ্যও হয়েছে; কিন্তু স্পিলবার্গের মতো কাউকে দেখিনি কখনও। কাজই যেন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। যে- ক’বার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে, আমাকে একবারও কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেননি। তাঁর এই মনোভাব লক্ষ করে আমার মনে হয়েছে, যে-কাজ করেছি আমি, সেটার বাইরে আমার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই তাঁর!
বললেন, ‘ভুল একটা বই বেছে নিয়েছেন আপনি।’
কথাটা আজগুবি মনে হলো আমার কাছে। ওয়েলিংটনে যখন ছিলাম, তখন আমি আর পিটার মিলে আলোচনা করে ঠিক করেছি, টিনটিনের সিনেমার জন্য কোন্ বইটা বেছে নেবো। তারপর টানা তিন মাস খাটুনি করে দাঁড় করিয়েছি আমি এই চিত্রনাট্য। সুতরাং যা বললেন স্পিলবার্গ, সেটা তাঁর মুখ থেকে শুনতে হবে… এ-রকম কিছু কল্পনাও করিনি কখনও।
‘দুঃখিত… বুঝলাম না কথাটা,’ আসলেই উচ্চারণ করেছিলাম কি না শব্দগুলো, সে-ব্যাপারে এখন আর নিশ্চিত না আমি।
‘দ্য সেভেন ক্রিস্টাল বল্স। প্রিজনার্স অভ দ্য সান। আমার মনে হয় সিনেমা বানানোর জন্য এসব বই উপযুক্ত না…
‘কেন?’
‘এসব বই নিয়ে সিনেমা বানাতে চাই না আমি।’
পিটারের দিকে তাকালাম আমি। মাথা ঝাঁকালেন তিনি।
‘ঠিক আছে!’
মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই আমার। কারণ পিটার জ্যাকসন পরিচালনা করবেন, আর স্পিলবার্গ প্রযোজনা করবেন। তাঁদের দু’জনের সামনেই আমার-লেখা চিত্রনাট্যের কপি আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো আলোচনাই হবে না আমাদের মধ্যে। প্লট, চরিত্র, অ্যাকশন, কৌতুক… চিত্রনাট্যের কোনো কিছু নিয়েই কোনো কথা হবে না।
তার মানে আলোচনা করার মতো কোনো প্রসঙ্গই নেই।
পিটার বললেন, ‘সিরিজের তৃতীয় সিনেমা হিসেবে প্রিজনার্স অভ দ্য সান কাজে লাগাতে পারি আমরা।’ চিত্রনাট্যের কপিটা হাত দিয়ে ঠেলে একপাশে সরিয়ে দিলেন, তাকালেন স্পিলবার্গের দিকে। ‘তা হলে সিরিজের দ্বিতীয় কাহিনি হিসেবে কোন্ বই নিয়ে কাজ শুরু করবেন অ্যান্টনি?
অ্যান্টনি! মানে আমি! অর্থাৎ আমাকে বাদ দিচ্ছেন না স্পিলবার্গ।
কিন্তু স্পিলবার্গ কিছু বলার আগেই আবারও খুলে গেল রুমের দরজাটা। একইসঙ্গে বিস্ময় এবং গাঢ় হতাশা নিয়ে দেখতে পেলাম, হোথর্ন ঢুকছে রুমের ভিতরে। বরাবরের মতো স্যুট আর সাদা শার্ট পরে আছে। তবে এবার একটা কালো টাইও ঝুলিয়েছে।
মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে গেল আমার।
ঠিক কোন্ জাতের একটা আলোচনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে যাচ্ছে সে, সে-ব্যাপারে সম্ভবত কোনো ধারণাই নেই ওর। হয়তো জানেও না, এই আলোচনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য। এমনভাবে ভিতরে ঢুকছে, যেন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ওকে। আমাকে দেখতে পেয়ে হাসল… ভাবখানা এমন, আশা করেনি আমাকে দেখতে পাবে এখানে।
