‘হোথর্ন,’ বলে উঠল লোকটা, উৎসাহের ছিটেফোঁটা নেই কণ্ঠে
‘ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিডোস!’ আনুষ্ঠানিক উপাধিটা হাস্যকর ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল হোথর্ন; ভাবখানা এমন, মিডোসের নামের সঙ্গে যেন মেলে না সেটা। তারপর বলল, ‘হ্যালো, জ্যাক।‘
বুঝে নিলাম, সোফায় বসে-থাকা ওই লোকের পুরো নাম জ্যাক মিডোস।
‘আমাকে যখন বলা হলো আপনাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এই কেসের ব্যাপারে, বিশ্বাসই করতে পারিনি।’ আমার উপর নজর পড়ল মিডোসের। ‘আপনি কে?’
সহসা কোনো জবাব দিলাম না। কারণ ঠিক কী পরিচয় দেবো নিজের, বুঝতে পারছি না।
‘তিনি একজন লেখক,’ বলল হোথর্ন। ‘আমার সঙ্গে আছেন।’
‘কী! কী নিয়ে লেখালেখি করছেন তিনি?’
‘এই কেস নিয়ে।’
‘বাইরের কাউকে জড়িয়ে ফেলছেন আপনি এসবের সঙ্গে … ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছেন তো? যা-হোক, আপনার জন্য যা-যা করতে বলা হয়েছিল আমাকে, সব করেছি। প্রমাণ হিসেবে কিছু জিনিস নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা সঙ্গে, সব আবার ফিরিয়ে এনে যেটা-যেখানে-ছিল সেটা সেখানে রেখে দিয়েছি সময়ের অপচয় আর কী। …ক্রাইম সিন পরিদর্শনের কাজটা মনে হচ্ছে শেষ করেছেন?’
‘করেছি মোটামুটি। চলে যাচ্ছিলাম, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভালোই হলো। মিসেস ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কী ধারণা আপনার, বলুন তো?’
‘কিছু মনে করবেন না… এ-ব্যাপারে আমার যা-ধারণা, সেটা ভাগাভাগি করতে চাইছি না আপনার সঙ্গে।’ অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল মিডোস। যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও লম্বাচওড়া সে। মনে হচ্ছে, একটা টাওয়ার যেন দাঁড়িয়ে আছে আমার আর হোথর্নের সামনে। ফাইলের কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে সেটা বাড়িয়ে ধরল হোথর্নের দিকে। ‘এটা আপনার হাতে দিতে বলা হয়েছে আমাকে।’
ইতোমধ্যে নজর বুলিয়ে নিয়েছি আমি ওই ফাইলের উপর। ওটার ভিতরে বিভিন্ন ফটোগ্রাফ, ফরেনযিক রিপোর্ট, সাক্ষীদের বিবৃতি, এবং এই বাড়ির টেলিফোন আর ডায়ানা ক্যুপারের মোবাইল থেকে করা গত দু’সপ্তাহের সমস্ত কলের রেকর্ড আছে।
ফাইলটা হাতে নিল হোথর্ন, নজর বোলাল প্রথম পৃষ্ঠার উপর। ‘সন্ধ্যা ছ’টা একত্রিশ মিনিটে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার।’
‘ঠিক। আর সে-সময়ের কিছুক্ষণ পরই তাঁর গলায় ফাঁস লাগানো হয়। খুনি … কিছু একটা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল মিডোস, হাসল। ‘ওই মেসেভ পড়েছি আমি। এবং সেটা পড়ে তেমন কিছুই মনে হয়নি আমার। এমনক মেসেজটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা-ও বুঝতে পারিনি। আপনি চেষ্টা করে দেখুন ওটার কোনো মানে বের করতে পারেন কি না।’ সাইডবোর্ডের উপর, ক্রেডিট কার্ডের পাশে রাখা পানির গ্লাসটার দিকে এগিয়ে গেল। ‘এবার এই জিনিস নিয়ে যেতে চাই… যদি কোনো আপত্তি না-থাকে আপনার।’
‘না, আপত্তি নেই।’
প্রথমবারের মতো খেয়াল করলাম, গ্লাভস পরে আছে মিডোস। কোনো একজাতের প্লাস্টিকের-ক্যাপ ব্যবহার করে গ্লাসটা সিল করে দিল সে, তারপর তুলে নিল।
‘ওই গ্লাসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে,’ বলল হোথর্ন, ‘তবে সেটা শুধু মিসেস ক্যুপারের। কিন্তু কোনো ডিএনএ পাওয়া যায়নি ওটা থেকে। তার মানে কেউ পানি খায়নি ওই গ্লাসে।’
‘মানে?’ দ্বিধা দেখা দিয়েছে মিডোসের চেহারায়। ‘রিপোর্টটা কি আগেই পড়ে ফেলেছেন?’
‘যা বললাম, সেটা বলার জন্য রিপোর্ট পড়ার দরকার হয় না আমার… দেখলেই বোঝা যায়। ফ্রিজের উপর রাখা টিনের ওই কৌটা দেখেছেন?’
‘দেখেছি। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি ওটাতেও
‘ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা কী?’
‘কোন্ ব্যাপার?’
‘শেষ কবে ব্যবহার করা হয়েছিল ওটা?’
ইঙ্গিতে ফাইলটা দেখিয়ে দিল মিডোস। ‘ওই মহিলার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আছে পনেরো হাজার পাউন্ড। আর তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে আছে আরও দুই লক্ষ পাউন্ড। …কী যেন জানতে চেয়েছিলেন? ও… মিসেস ক্যুপার শেষ কবে ব্যবহার করেছেন ওই কার্ড, তা-ই তো? সপ্তাহখানেক আগে। হ্যাঁরোস্-এ। সেখান থেকেই মুদি সামগ্রী কিনতেন তিনি।’
‘কী কী কিনেছিলেন তিনি, তা-ও জানি। স্মোক্ড স্যামন আর ক্রীম-লাগানো পনির।’
‘কীভাবে জানতে পারলেন?’
‘কিচেনে দেখেছি ওসব। এবং ওসব কাজে লাগিয়েই নিজের জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নিয়েছিলাম।’
‘কী! স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে ক্রাইমসিনের প্রমাণ ধ্বংস করেছেন?’
‘হ্যাঁ, করেছি। কারণ আমার খিদে পেয়েছিল অনেক।’
ভ্রূ কুঁচকে গেছে মিডোসের। ‘আর কিছু জানার আছে আপনার?’
‘আছে। বিড়ালটার কী হয়েছে?
‘কীসের বিড়াল?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি।’
হোথর্নের বলার কায়দায় বুঝতে পারলাম, মিসেস ক্যুপারের বিশেষ সেই বিড়ালের ব্যাপারে কিছুই জানে না মিডোস।
গ্লাসটা চোখের সামনে ধরে কী যেন দেখছে পুলিশের ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো জাদুকর… এখনই এমন কোনো ভেল্কিবাজি দেখাবে, যার ফলে ওই গ্লাসের ভিতরে হাজির হবে কোনো গোল্ডফিশ। কিন্তু, বলাই বাহুল্য, সে-রকম কিছু ঘটল না।
গ্লাসের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে আমার উদ্দেশে মাথা ঝাঁকাল লোকটা। ‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। তবে… আপনার জায়গায় যদি আমি থাকতাম, এ-রকম কোনো ক্রাইমসিনে এলে সাবধান থাকার চেষ্টা করতাম। বিশেষ করে যদি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতাম, তা হলে।’
