যেখানেই গিয়ে থাকুক না কেন হোথর্ন, ফিরে এসে ঢুকে পড়েছে বেডরুমে তল্লাশি চালাচ্ছে ওয়ার্ডরোব, বেডসাইড কেবিনেট আর বিভিন্ন ড্রয়ারে। ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্রেমে-বন্দি একটা ছবির উপর নজর বুলিয়ে নিল দ্রুত। ছবিটা রাখা আছে মিসেস ক্যুপারের মেকআপ টেবিলের উপর। আমিও তাকালাম ওটার দিকে একনজরেই যে চিনতে পারলাম লোকটাকে, এমনটা দাবি করবো না… কারণ লোকের চেহারা ঠিকমতো মনে থাকে না আমার; বিশেষ করে ড্যামিয়েনের মতো যুবক বয়সী, সুদর্শন, ইংরেজ অভিনেতাদের ব্যাপারে প্রায়ই তালগোল পাকিয়ে ফেলি। আর যারা হলিউডের ছবিতে অভিনয় করে, তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
মিসেস ক্যুপারের শু র্যাকের পেছনে একটা সিন্দুক খুঁজে পেল হোথর্ন। ওটা লক-করা বুঝতে পেরে ভ্রূ কুঁচকে গেল ওর। কিন্তু পরমুহূর্তেই যেন ভুলে গেল ব্যাপারটা।
যে-পদ্ধতিতে ক্লু খুঁজছে সে, মুগ্ধ না-হয়ে পারছি না। খোঁজাখুঁজির এই সময়টাতে একটা কথাও বলেনি আমার সঙ্গে। এমনকী ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়নি, আমি যে আছি এখানে, সেটা মনে আছে ওর। কোনো কোনো বিমানবন্দরে গন্ধ শুঁকবার কাজে ব্যবহৃত হয় কুকুর; হোথর্নের কাজ দেখে ওসব জন্তুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আমার। যাত্রীদের প্রতিটা সুটকেসেই যে ড্রাগস বা বোমা থাকবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই, তারপরও… কুকুর তো কুকুরই… প্রতিটা সুটকেস আর ব্যাগ শুঁকবেই ওগুলো। এবং ওগুলোর মতোই অনিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছি হোথর্নের চেহারায়। ওগুলো যেভাবে নিশ্চিত হতে চায়, সেভাবে যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সে বিশেষ কোনো একটা ব্যাপারে।
বেডরুম থেকে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল হোথর্ন। বাথটাবের ধারে গোটা বিশেক বোতল দেখতে পাচ্ছি। অনুমান করলাম, হোটেল থেকে নিজের জন্য শ্যাম্পু আর বাথ-জেল আনিয়ে নিতেন মিসেস ক্যুপার। বেসিনের উপর একটা কেবিনেট দেখতে পেয়ে সেটা খুলল হোথর্ন। টেমাজেপামের তিনটা প্যাকেট বের করল। এটা আসলে একজাতের ঘুমের ওষুধ। আমার দিকে ঘুরে প্যাকেট তিনটা দেখাল।
‘ইন্টারেস্টিং,’ এতক্ষণে কথা ফুটল ওর মুখে।
‘কিছু একটা নিয়ে উদ্বেগে ভুগছিলেন মিসেস ক্যুপার,’ বললাম আমি। ‘হয়তো… ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না তাঁর।’
মন্তব্য করল না হোথর্ন। প্রথমে বের হলো বাথরুম থেকে, তারপর বের হলো বেডরুম থেকে। ওর পেছন পেছন রওয়ানা হলাম।
এই বাড়ির উপরতলায় দুটো গেস্টরুম আছে। তবে একনজর দেখেই বোঝা গেল, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো অতিথি থাকতে আসেনি এখানে। খুবই পরিপাটি করে সাজানো আছে দুটো ঘরই, এবং দু’জায়গার বাতাসই কেমন ঠাণ্ডা। অনুমান করে নিলাম, বিদ্যুতের খরচ বাঁচানোর জন্য এই দু’ঘরের সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন, তারপর বেরিয়ে এসে দাঁড়াল করিডরে। ‘বিড়ালটার কী হয়েছে বলে ধারণা আপনার?’ জিজ্ঞেস করল আমাকে
‘কীসের বিড়াল?’
‘মিসেস ক্যুপারের একটা বিড়াল ছিল। পার্শিয়ান গ্রে। মেডিসিন বল দেখেছেন না? বড় বড় লোমওয়ালা ওসব বিড়াল দেখলে ওই জিনিসের কথা মনে পড়ে যায় আমার।’
‘কই, কোথাও কোনো বিড়ালের ফটোগ্রাফ দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না?’
‘আমিও দেখিনি।’
দেখেনি যখন, তখন বিড়ালের ব্যাপার জানল কী করে হোথৰ্ন?
কিন্তু ওই ব্যাপারে আর কিছু বলল না সে। হঠাৎ করেই বদলে গেছে ওর মুখভাব… বিরক্ত বলে মনে হচ্ছে ওকে।
বললাম, ‘আপনাকে নিয়ে যদি লিখি, তা হলে আপনার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে হবে আমাকে।’
‘যেমন?’
‘বিড়ালের ব্যাপারটা। বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে বলে বসলেন ওটার কথা। অথচ পুরো বাড়ির ভিতরে ওই প্রাণীর একটা ছবিও নেই।
আমার কথা শুনে হোথর্নের বিরক্তি আরও যেন বাড়ল। ‘কিচেনে একটা ফিডিং বোল আছে… দেখেননি? আর বেডরুমের ওই বালিশটা… ওটাও কি নজর এড়িয়ে গেছে আপনার?’
‘বেডরুমের বালিশটা? আমি তো ভেবেছিলাম মিসেস ক্যুপার ওটাতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন বলেই…’
‘আরে না! তাঁর মাথায় বিড়ালের লোমের মতো ছোট ছোট রেশমি চুল নেই। তা ছাড়া ওই বালিশ থেকে মাছের মতো গন্ধ পেয়েছি। আরও একটা ব্যাপার নজর এড়িয়ে গেছে আপনার… বুঝতে পারছি। বিছানার বাঁ দিকে শুতেন মিসেস ক্যুপার, কারণ বেডসাইড টেবিলটা সেদিকেই, আর ওই টেবিলের উপরই দেখতে পেয়েছি আমরা স্টিগ লারসনের বইটা। বিড়ালটা শুত বিছানার অন্য পাশে। বালিশে যে- রকম গর্ত তৈরি হয়েছে সেটা দেখলেই বোঝা যায়, ওই বিড়াল বেশ নাদুসনুদুস এবং বড়সড়। আগেও বলেছি আবারও বলছি, আমার ধারণা ওটা একটা পার্শিয়ান গ্রে। কিন্তু…’ আরও একবার এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন, ‘কোথাও দেখতে পাচ্ছি না কেন ওটাকে?’
‘হয়তো… পুলিশ নিয়ে গেছে।’
‘হয়তো।’
নিচতলায় হাজির হলাম আমরা দু’জন। আবার ঢুকলাম লিভিংরুমে। দেখতে পেলাম, আরও একজন লোক উপস্থিত হয়েছে কখন যেন। তার পরনে সস্তা স্যুট। দু’পা ফাঁক করে বসে আছে সোফায়, একটা ফাইল খুলে মেলে রেখেছে কোলের উপর। বাঁকা হয়ে আছে পরনের টাই, লাগানো হয়নি শার্টের দুটো বোতাম। কেন যেন মনে হলো, লোকটা ধূমপায়ী। অসুস্থতার ছাপ তার সব কিছুতে: চামড়ার রঙে, পাতলা হয়ে-আসা চুলে, ভাঙা নাকে, এমনকী ট্রাউজারের ওয়েস্টব্যান্ডের সঙ্গে লেপ্টে-থাকা পেটে। তার বয়স হোথর্নের সমানই, কিন্তু হোথর্নের চেয়ে বড়সড় আর থলথলে। দেখে মনে হচ্ছে, কিছু দিন আগে অবসর নিয়েছে বক্সিং-রিং থেকে। অনুমান করলাম, লোকটা নিশ্চয়ই পুলিশের কোনো অফিসার। এ-রকম লোকদের টেলিভিশনে অনেক দেখেছি… নাটকে না, আদালতকক্ষের বাইরে– ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আগে-থেকেই তৈরি-করে-রাখা কোনো বিবৃতি পড়ার সময়।
