‘তা হলে ওই লোকের দৃষ্টিশক্তি যে দুর্বল, জানলেন কী করে?’
‘এই বাড়ির সদর দরজার বাইরে কাদায় ভরা একটা জায়গা ছিল, দৃষ্টিশক্তি দুর্বল বলেই সেখানে পা দিয়ে ফেলেছিল। আর সে-কারণেই তার জুতোর তলার ছাপ বসে গেছে কার্পেটের এককোনায়। যা-হোক, সে-ছাপ দেখে তাকে পুরুষলোক বলেই মনে হয়েছে আমার। ওই ছাপ বাদ দিয়ে যদি বলি, অন্য সব বিষয়ে খুব সতর্ক ছিল সে। …এসব কথা লিখবেন তো আপনি বইয়ে?’
‘লিখবো। মোটামুটি সব কিছুই মনে আছে আমার।’ বের করলাম আমার আইফোনটা। ‘কোনো সমস্যা না-থাকলে কয়েকটা ছবি তুলতে চাই।’
‘সমস্যা নেই। তুলুন।’ সাইডবোর্ডের উপর একজন লোকের সাদা-কালো একটা ফটোগ্রাফ রাখা আছে, লোকটার বয়স চল্লিশের ঘরে; ইঙ্গিতে ছবিটা দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘ওটার ছবি তুলে নিতে ভুলবেন না যেন।’
‘কে ওই লোক?’
‘আমার ধারণা মিসেস ক্যুপারের স্বামী। লরেন্স ক্যুপার।’
‘ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল তাঁদের দু’জনের?
এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন যে, দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে চোট পেয়েছে মনে। ‘ডিভোর্স হয়ে গেলে ওই লোকের ছবি নিজের বাড়িতে রাখতেন না মিসেস ক্যুপার। যা-হোক, আজ থেকে বারো বছর আগে মারা গেছেন লোকটা। ক্যান্সার।’
কথা আর না-বাড়িয়ে নিজের আইফোনে মিসেস ক্যুপারের স্বামীর ছবি তুলে নিলাম। টুকটাক আরও কিছু ছবি তুললাম।
তারপর ঘুরে বেড়াতে লাগলাম হোথর্নের পিছু পিছু। আমাকে নিয়ে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাচ্ছে সে। দেখিয়ে দিচ্ছে এটা-সেটা, ছবি তুলতে বলছে আমাকে। ওর কথামতো কাজ করছি।
আমাদের এই ঘুরে বেড়ানোর কাজটা শুরু হলো কিচেন থেকে। রান্নাঘরটা, প্রথম দেখায়, কোনো শো-রুম বলে মনে হলো আমার কাছে… প্রয়োজনীয় এবং দামি সব জিনিসপত্রে ঠাসা, অথচ ব্যবহৃত হয়েছে খুব কম। অর্থাৎ রান্নার কাজ খুব একটা করতেন না মনে হয় মিসেস ক্যুপার। রাতে হয়তো একটা সেদ্ধ ডিম আর দু’টুকরো টোস্ট খেয়ে শুয়ে পড়তেন।
ফ্রিজের গায়ে চুম্বক দিয়ে সাঁটা আছে অনেক কিছু: ক্ল্যাসিকাল আর্ট, শেক্সপিয়ারের উক্তি। নার্নিয়া সিনেমার প্রিন্স ক্যাস্পিয়ান চরিত্রটার ছবিওয়ালা একটা টিনের-কৌটা রাখা আছে ফ্রিজের উপর
যাতে আঙুলের ছাপ বসে না-যায় সেজন্য একটা কাপড় দিয়ে ধরে ফ্রিজের দরজাটা খুলল হোথর্ন। ভিতরটা বলতে গেলে খালি। দরজাটা লাগিয়ে দিল সে। এবার খুলল টিনের কৌটাটা। কিছুক্ষণ দেখার পর আগের জায়গায় রেখে দিল সেটা।
এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি আমি। যেটা যেখানে রাখা দরকার, সেটা ঠিক সেখানেই রাখা আছে বলে মনে হচ্ছে। জানালার গোবরাটের উপর রাখা আছে রেসিপির কয়েকটা বই। টোস্টারের পেছনের একটা র্যাকে রাখা আছে কয়েকটা নোটবুক আর সাম্প্রতিক কিছু চিঠি। এই সপ্তাহে কী কী কেনাকাটা করতে হবে সেটার ছোট একটা তালিকা লেখা আছে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে।
এগিয়ে গিয়ে চিঠিগুলো তুলে নিল হোথর্ন, ঘাঁটাঘাঁটি করল কিছুক্ষণ, তারপর রেখে দিল আগের জায়গায়। কাউন্টারের উপর, দেয়ালের গায়ে আটকানো আছে কাঠের একটা মাছ; সেটার সঙ্গে যুক্ত আছে পাঁচটা হুক, আলাদা আলাদা কয়েকটা চাবি ঝুলছে ওসব হুকে… ব্যাপারটা আগ্রহী করে তুলল হোথর্নকে। প্রতিটা চাবির গায়ে সাঁটা আছে লেবেল। আগ্রহ জাগল আমার মনেও, ছবি তুলে নিলাম চাবিগুলোর। ওসব লেবেলের উপর চোখ বুলিয়ে জানতে পারলাম, কোনো চাবি সদর-দরজার, কোনোটা আবার পেছনের দরজার অথবা সেলারের। চতুর্থ চাবির গায়ে সাঁটা লেবেলে লেখা আছে: স্টোনার হাউস।
‘এটা কী?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘একটা বাড়ি… একসময় সেখানে থাকতেন মিসেস ক্যুপার। পরে লন্ডনে চলে আসেন তিনি। বাড়িটা কেন্টের ওয়ালমারে অবস্থিত।’
‘ওই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছেন তিনি, তারপরও রেখে দিয়েছেন সেখানকার চাবি… ব্যাপারটা অদ্ভুত।’
কোনো মন্তব্য করল না হোথর্ন।
খুঁজতে খুঁজতে একটা ড্রয়ারে পাওয়া গেল আরও কিছু পুরনো চিঠি এবং বিল। প্রায় সবগুলোই ঘেঁটে দেখল হোথর্ন। মরোক্কান নাইটস নামের একটা গীতিনাট্যের ব্রশিউর পাওয়া গেল আরেকটা ড্রয়ারে। প্রথম পৃষ্ঠায় দেখা যাচ্ছে কয়েকজন প্রযোজকের নাম; তাঁদের মধ্যে রেমন্ড কুন্সের নামটাও আছে।
রান্নাঘর থেকে আমরা গেলাম উপরতলায়। করিডর ধরে হাঁটছি। ফ্রেমে বন্দি অবস্থায় মঞ্চনাটকের কিছু দৃশ্য ঝুলছে ওয়ালপেপার-সাঁটা দু’ধারের দেয়ালে হ্যামলেট, দ্য টেম্পেস্ট, হেনরি ফাইভ, দ্য ইম্পর্টেন্স অভ বিইং আর্নেস্ট, দ্য বার্থডে পার্টি। প্রতিটা নাটকেই অভিনয় করেছে ড্যামিয়েন ক্যুপার।
করিডর ধরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, কিন্তু আমি ঢুকে পড়লাম মিসেস ক্যুপারের বেডরুমে। অনধিকার-প্রবেশের সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি আরও একবার জেগে উঠল আমার মনে, এবং ব্যাপারটা বিস্মিত করল আমাকে। হয়তো সপ্তাহখানেক আগেও একজন মহিলা কাপড় ছেড়েছেন এই ঘরে, হয়তো কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি প্রমাণ আকৃতির আয়নার সামনে, হয়তো স্টিগ লারসনের দ্য গার্ল হু প্লেইড উইথ ফায়ার বইটা নিয়ে শুয়েছেন কুইন-সাইজ বিছানায়। বইটা এখন পড়ে আছে বেডসাইড টেবিলের উপর।
দুটো বালিশ দেখা যাচ্ছে বিছানায়। একটাতে একটুখানি গর্ত হয়ে আছে… অর্থাৎ ওটাতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার।
