‘এসব কথা আপনি জানলেন কী করে?’
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করামাত্র নিজেই বিরক্ত হলাম নিজের উপর। কারণ আমি জানি, হোথর্ন চেয়েছিল, ওই প্রশ্ন যেন জিজ্ঞেস করি। ওর ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি।
‘লোকটা যখন এই বাড়িতে আসে,’ বলল হোর্থন, ‘তখন বাইরে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। এবং, জানেন কি না জানি না, ইদানীং এই এলাকায় চুরিচামারির ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটা। কাজেই শহরের ব্যয়বহুল একটা এলাকায় একা থাকেন এ- রকম একজন মহিলা যদি জানতে পারেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে একজন আগন্তুক, দরজা খুলবেন না তিনি। অর্থাৎ, খুনি মিসেস ক্যুপারের পূর্বপরিচিত। সে পুরুষ নাকি মহিলা, সে-প্রসঙ্গে আসুন এবার। আমি যা বলছি মেনে নিন– খুনি একজন পুরুষ। মেয়েরাও যে মেয়েদেরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, জানি আমি; তারপরও… মিসেস ক্যুপারের বেলায় ঘটনাটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। তাঁর উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। গলায় ফাঁস লাগিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে টেনে ধরে রাখার কারণে ভেঙে গেছে তাঁর হায়োইড অস্থি। কাজেই তাঁর চেয়ে লম্বা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী কেউ যদি খুনি না-হয়, তা হলে ঘটত না ওই ঘটনা। তবে স্বীকার করে নিচ্ছি, বয়স হয়েছিল মিসেস ক্যুপারের, দুর্বল হয়ে গিয়েছিল তাঁর হায়োইড অস্থি, এবং সেটা ভেঙে ফেলার জন্য অসুরের মতো শক্তিশালী কাউকে দরকার নেই।’
‘লোকটা যে মিসেস ক্যুপারকে খুন করার জন্যই হাজির হয়েছিল এখানে, জানলেন কীভাবে?’
‘তিনটা কারণে। এই বাড়ির কোথাও কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি খুনির। আজ থেকে পাঁচ দিন আগে মোটেও ঠাণ্ডা ছিল না আবহাওয়া, বরং বেশ গরমই ছিল; তারপরও গ্লাভস পরে ছিল লোকটা… আসলে নিশ্চিত হতে চেয়েছে কোথাও যেন আঙুলের ছাপ না-পড়ে তার। বেশিক্ষণ এখানে ছিলও না সে। কোথাও কোনো কফির কাপ নেই, জিন অ্যান্ড টনিকের খালি গ্লাস নেই। ওই লোক যদি মিসেস ক্যুপারের বন্ধু হতো, তা হলে তারা দু’জনে একসঙ্গে কোথাও বসে গলা ভেজাত।’
‘হয়তো তাড়াহুড়ো ছিল লোকটার।’
‘কুশনগুলোর দিকে একবার তাকান, টনি। লোকটা এমনকী বসেওনি।
একটু আগে যে-গ্লাস দেখেছি, এগিয়ে গেলাম সেটার দিকে। ওটা হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু সংবরণ করলাম নিজেকে। পুলিশ আর ফরেনযিকের অফিসাররা এসেছিল এখানে, প্রমাণ হিসেবে নিশ্চয়ই কিছু-না-কিছু নিয়ে গেছে; কিন্তু এই গ্লাস কেন নিল না, ভেবে আশ্চর্য হলাম কিছুটা।
কথাটা বললাম হোথৰ্নকে।
‘ওটা নিয়ে গিয়েছিল ওরা,’ বলল হোথর্ন, ‘কিন্তু আবার রেখে গেছে।’
‘কেন?’
‘আমার জন্য,’ একটুখানি হাসল হোথর্ন, মুখের ভিতরে চালান করে দিল স্যান্ডউইচের বাকিটা।
‘তার মানে কেউ একজন ড্রিঙ্ক করেছিল।’
‘গ্লাসের ওই তরল পানি ছাড়া আর কিছু না,’ স্যান্ডউইচটুকু চিবিয়ে নিয়ে গিলে ফেলল হোথর্ন। ‘আমার কী ধারণা, জানেন? আমার ধারণা, চলে যাওয়ার আগে খুনি একগ্লাস পানি চেয়েছিল মিসেস ক্যুপারের কাছে। এবং সেটা আনতেই এই ঘর ছেড়ে বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। সময়টা কাজে লাগিয়েছে খুনি, হুক থেকে খুলে নিয়েছে পর্দার ফিতা। ঘটনাটা ঘটার সময় এখানে যদি উপস্থিত থাকতেন মিসেস ক্যুপার, তা হলে সেটা করতে পারত না ওই লোক।’
‘কিন্তু খুনি পানি খায়নি।
‘নিজের ডিএনএ রেখে যেতে চায়নি সে আসলে।’
‘ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা কী?’ ওই জিনিসের গায়ে প্রিন্ট-করা নামটা পড়লাম: মিসেস ডায়ানা জে. ক্যুপার। কার্ডটা ইস্যু করা হয়েছে বাসে ব্যাংক থেকে। মেয়াদ শেষ হবে নভেম্বর মাসে। মানে আরও ছ’মাস বাকি।
‘ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং,’ বলল হোখন। ‘জিনিসটা অন্য সব কিছুর সঙ্গে তাঁর পার্সের ভিতরে পাওয়া গেল না কেন? ওটা কি পার্স থেকে বের করেছিলেন তিনি নিজেই? কেন করেছিলেন? কোনো কিছুর দাম চুকাতে চাইছিলেন? আর সেজন্যই কি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে দিয়েছিলেন খুনিকে? ওই কার্ডে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছাড়া অন্য কারও আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি।’
‘তার মানে…’
‘তার মানে সম্ভাব্য একটা ব্যাখ্যা চলে আসছে আমাদের সামনে,’ আমার মুখের কথা কেড়ে নিল হোথর্ন। ‘কেউ একজন কিছু-একটার দাম চেয়েছিল মিসেস ক্যুপারের কাছে। তখন ক্রেডিট কার্ডটা বের করতে চাইছিলেন তিনি পার্সের ভিতর থেকে। ওটা যখন খুঁজছিলেন তিনি, তখন সুযোগ বুঝে তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে দেয় খুনি। এখন কথা হচ্ছে, কারও হাতে ক্রেডিট কার্ড থাকা অবস্থায় তার গলায় যদি ফাঁস লাগানো হয়, তা হলে কার্ডটা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা ঘটেনি… মানে, কার্ডটা মেঝেতে পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন?’ মাথা নাড়ল সে। ‘আবার এ-রকমও হতে পারে, মূল ঘটনার সঙ্গে ওই কার্ডের কোনো যোগসূত্রই নেই। …দেখা যাক শেষপর্যন্ত কী জানতে পারি।’
‘আপনি বলেছেন খুনির দৃষ্টিশক্তি নাকি দুর্বল।’
‘হ্যাঁ…’
‘কেন বলেছেন কথাটা? মিসেস ক্যুপারের একহাতের আঙুলে হীরার একটা আংটি ছিল, অথচ সেটা নজরে পড়েনি ওই লোকের… সেজন্য? আংটিটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারলে অনেক টাকায় বেচতে পারত সে।’
‘না, আংটির কারণে বলিনি কথাটা। ভুল বুঝেছেন। ওই আংটির উপর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না খুনির। আগেও বলেছি আবারও বলছি, যে-লোকই খুন করে থাকুক না কেন মিসেস ক্যুপারকে, হত্যাকাণ্ডটা চুরি বা ডাকাতি হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছে সে। ওই মহিলার কিছু গহনা আর একটা ল্যাপটপ নিয়ে গেছে সে। তবে হীরার ওই আংটি নেয়নি। ওটার কথা হয় ভুলে গেছে, নয়তো সঙ্গে স্যাকেটার্স (শক্ত ধাতব পদার্থ কাটার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ একজাতের কেঁচি) ছিল না বলে কোনো ঝামেলা করতে চায়নি। …পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করবে সে মিসেস ক্যুপারকে, অথচ তাঁর হাতের আংটিটা দেখতে পাবে না– এটা এককথায় অসম্ভব।’
