এর আগে যেসব ক্রাইমসিন পরিদর্শন করেছি, সেগুলো আমার তৈরি-করা। অর্থাৎ, কোনো নাটক বা সিনেমার জন্য ওই ঘটনাস্থলের বর্ণনা লিখেছি আমি; ডিরেক্টর, লোকেশন ম্যানেজার, ডিজাইনার আর প্রন্স ডিপার্টমেন্টের সবাই মিলে সেটা বানিয়ে দিয়েছেন আমার জন্য। কোন্ আসবাবটা কোথায় কীভাবে রাখতে হবে, এমনকী দেয়ালের রঙ কী হবে… সব ঠিক করে দিয়েছেন তাঁরা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিটেইলগুলোর উপর সব সময় জোর দিয়েছি আমি– ভাঙা আয়না, জানালার গোবরাটে রক্তমাখা আঙুলের ছাপ, অথবা আমার কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে-কোনো কিছু। যে-কু’র কথা উল্লেখ করতে চেয়েছি, সেটা যে থাকতেই হবে ক্রাইমসিনে, এমন কোনো কথা নেই। ব্যাপারটা আসলে নির্ভর করে ক্যামেরা কোন্দিকে তাক করা হচ্ছে সেটার উপর।
ধীর পায়ে হাঁটছি আমি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি; গিয়ে হাজির হলাম মিসেস ক্যুপারের লিভিংরুমে। জুতোর নিচে পুরু কার্পেটের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। মাথার উপর ঝুলছে স্ফটিকের একটা ঝাড়বাতি। আশপাশে দেখতে পাচ্ছি নকল- অ্যান্টিকের কিছু আসবাব। কফি টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কান্ট্রি লাইফআর ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের বেশ কয়েকটা সংখ্যা। একটা বিল্ট-ইন বুকশেল্ফে দেখা যাচ্ছে আধুনিক ফিকশনের উপর হার্ডব্যাক কয়েকটা বই। কোনোটাই আমার লেখা না। নিজেকে একজন অনধিকারপ্রবেশকারী বলে মনে হচ্ছে আমার। আর এই জায়গা মনে হচ্ছে এমন একটা জাদুঘর, যেখানে কিছু দিন আগেও কেউ একজন থাকতেন।
পুলিশের তদন্তকারী অফিসাররা হলুদ প্লাস্টিকের কতগুলো ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে কিছু কিছু জিনিসের গায়ে। তবে ওসব ট্যাগের সংখ্যা খুব বেশি না। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ তেমন কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি এখানে। পানিভর্তি একটা গ্লাসের (গ্লাসের ভিতরের ওই তরল আপাতদৃষ্টিতে পানি বলেই মনে হচ্ছে) গায়ে লাগানো ট্যাগের নম্বর ১২। অ্যান্টিক একটা সাইডবোর্ডের উপর রাখা আছে ওই গ্লাস। ওটার পাশে যেন নিতান্ত অবহেলায় পড়ে আছে একটা ক্রেডিট কার্ড। খেয়াল করলাম, কার্ডের গায়ে ডায়ানা ক্যুপারের নাম লেখা। এবং সেটার সঙ্গে যুক্ত-করা ট্যাগের নম্বর ১৪।
এসব কি কোনো ক্লু?
বলা মুশকিল।
তিনটা জানালা আছে এই ঘরে। মখমলের দুটো করে পর্দা ঝুলছে প্রতিটা জানালায়। পর্দাগুলো এত লম্বা যে, মেঝে ছুঁই ছুঁই করছে। রেশমি ঝুলওয়ালা লাল রঙের আলাদা আলাদা ফিতার সাহায্যে বেঁধে রাখা হয়েছে পাঁচটা পর্দা। দরজার সবচেয়ে কাছে যে-পর্দা আছে, সেটা বেঁধে রাখা হয়নি। এই পর্দার গায়ে দেখা যাচ্ছে আরেকটা ট্যাগ: ৬। পর্দাটা দেখে মনে পড়ে গেল, এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি, সেখানে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক মহিলাকে, এবং ঘটনাটা বেশিদিন আগের না। দৃশ্যটা কেন যেন ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে… বড় বড় হয়ে গেছে মিসেস ক্যুপারের চোখ, আতঙ্কিত আর পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি, বাতাসে নিষ্ফল খামচি মারছে তাঁর হাতের আঙুলগুলো।
নিচের দিকে তাকালাম। কার্পেটের একজায়গায় একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। সেখানে আরও দুটো নম্বর দিয়ে রেখেছে পুলিশের অফিসাররা। মারা যাওয়ার আগে, খুব সম্ভব, নিজের অন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন মিসেস ক্যুপার… মল নির্গত হয়েছিল তাঁর।
একটা আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। ঘরে ঢুকেছে হোথর্ন। বরাবরের মতো একই স্যুট পরে আছে। স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। বুঝতে একটু সময় লাগল আমার, মিসেস ক্যুপারের খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার করে তাঁরই রান্নাঘরে ওই স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়েছে সে নিজের জন্য। তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে।
‘কী?’ জিজ্ঞেস করল সে, মুখ ভর্তি হয়ে আছে খাবারে।
‘কিছু না,’ বললাম আমি।
‘নাস্তা খেয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, ধন্যবাদ।’
আমার কণ্ঠ শুনে যা বুঝবার বুঝে নিল হোথর্ন। ‘শুধু শুধু এসব খাবার নষ্ট করে কোনো লাভ আছে, বলুন? তা ছাড়া এখন আর এসব দরকারও নেই মিসেস ক্যুপারের।’ স্যান্ডউইচটা নাড়িয়ে সারা ঘর দেখিয়ে দিল ইশারায়। ‘কী ধারণা আপনার, বলুন।’
কী বলবো, বুঝতে পারছি না। এই ঘর খুবই সাজানোগোছানো। শুধু একটা ফ্ল্যাটস্ক্রীন টেলিভিশন বেখাপ্পা ঠেকছে আমার কাছে। আজকাল লোকে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয় ওসব জিনিস, কিন্তু তা না করে ওটা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে স্ট্যান্ডের উপর। আশপাশে যা-ই দেখতে পাচ্ছি, কেন যেন সব সেকেলে ঠেকছে আমার কাছে। মনে হচ্ছে, সুশৃঙ্খল একটা জীবন যাপন করতেন ডায়ানা ক্যুপার। এমনকী তাঁর মৃত্যুটাও কেন যেন পরিপাটি বলে মনে হচ্ছে। ধ্বস্তাধ্বস্তি করেননি তিনি, বাধা দেয়ার চেষ্টা করেননি খুনিকে… কোথাও উল্টে পড়ে নেই কোনো আসবাব। খুনি শুধু একটা চিহ্ন রেখে গেছে নিজের: দরজার কাছে, কার্পেটের এককোনায় অর্ধেকটা জুতোর-ছাপ। লোকটা মিসেস ক্যুপারকে খুন করার আগে তাঁকে নৃশংসভাবে পেটায়নি, এমনকী তাঁকে ধর্ষণও করেনি। কেন যেন মনে হচ্ছে, লোকটা ঠাণ্ডা মাথায় শেষ করে দিয়েছে তাঁকে।
‘খুনিকে চিনতেন মিসেস ক্যুপার,’ বলল হোথর্ন। ‘তবে তাঁর বন্ধু ছিল না ওই লোক। আমার ধারণা, লোকটা কমপক্ষে ছ’ফুট লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী। তবে তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। মিসেস ক্যুপারকে খুন করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে। এবং খুব বেশিক্ষণ ছিল না এখানে। তাকে একা রেখে এই ঘর ছেড়ে কোনো একজায়গায় গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার… খুব সম্ভব রান্নাঘরে। হয়তো ভেবেছিলেন, চলে যাবে লোকটা। যা-হোক, মিসেস ক্যুপারকে খুন করার পর এই বাড়িতে… কী বলবো… তল্লাশি চালায় ওই লোক, টুকটাক কয়েকটা জিনিস নিয়ে যায় নিজের সঙ্গে, কিন্তু আসলে ওসব জিনিস নেয়ার জন্য আসেনি। আমার ধারণা, ব্যক্তিগত কোনো কারণে খুন করেছে সে মিসেস ক্যুপারকে।
