স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। চুপসে যাওয়ার মতো কোনো একজাতের অনুভূতি হচ্ছে আমার পেটের ভিতরে।
কিছুক্ষণ পর জানতে চাইলাম, ‘টাকাপয়সার টানাটানি? যেমন?’
‘আকণ্ঠ ঋণে জর্জরিত বলে একটা কথা আছে না? ড্যামিয়েন ক্যুপারের হয়েছিল সে-অবস্থা। হলিউড হিলসে বিলাসবহুল একটা বাড়ি কিনেছে সে। এমনকী সুইমিংপুলও আছে সেখানে। চলাফেরার জন্য ব্যবহার করত পোর্শে ৯১১। ইংরেজ এক বান্ধবী জুটিয়ে নিয়েছিল, লিভ টুগেদার করে মেয়েটার সঙ্গে। অথচ তাকে খুব একটা পছন্দ করে না ওই মেয়ে। কারণ তার মতো মানুষদের জীবনে মেয়েদের আনাগোনা চলতেই থাকে।’
সাহস করে জানতে চাইলাম, ‘আপনি যদি এই রহস্যের সমাধান করতে না- পারেন, তা হলে কী হবে? এ-রকমও তো হতে পারে, ডায়ানা ক্যুপারের খুনিকে আপনার আগেই পাকড়াও করে ফেলল পুলিশ?’
দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে অপমানিত হয়েছে হোথর্ন। ‘পুলিশ? তাদের কাছে যদি কোনো একটা ক্লু-ও থাকত, এই রহস্য সমাধানের জন্য আমার সাহায্য চাইত না। কথাটা আগেও বোধহয় বলেছি আপনাকে। ইদানীং খুন হওয়ার আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ হত্যারহস্য। কেন হচ্ছে, ভেবে দেখেছেন কখনও? কারণ বেশিরভাগ খুনি জানে না, কী করছে তারা। ইদানীং বেশিরভাগ খুন করা হচ্ছে রাগের মাথায়। একই ঘটনা বার বার ঘটছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটছে। রক্তের ছিটা, গাড়ির নম্বর প্লেট, সিসিটিভি… ইত্যাদি নিয়ে যতক্ষণে চিন্তিত হয়ে পড়ছে ইদানীংকালের খুনিরা, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য। কেউ কেউ অবশ্য গোপন করার চেষ্টা করছে তাদের চিহ্ন বা আলামত, কিন্তু সব চেষ্টাই শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের কারণে।’
‘কিন্তু…’
‘জানি কী বলবেন আপনি,’ আমাকে কথা শেষ করতে দিল না হোথর্ন। ‘শতকরা প্রায় দুই ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটা পূর্বপরিকল্পিত। অথবা দেখা যাচ্ছে, পেশাদার কোনো খুনিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ওসব কাজে। কখনও আবার উদ্ভব ঘটছে বাতিকগ্রস্ত বা উন্মত্ত কোনো কোনো সিরিয়াল কিলারের… নিছক মজা পাওয়ার আশায় একের-পর-এক খুন করে যাচ্ছে তারা। মোদ্দা কথা হলো, সব খবরই আছে পুলিশের কাছে। তারা জানে, ঠিক কখন সাহায্য চাইতে হবে আমার মতো লোকদের কাছে। জানে, সাহায্য চাইতেই হবে তাদেরকে। কাজেই আমি আপনাকে যা বলতে চাই তা হলো, আমার উপর ভরসা রাখুন। বিস্তারিত কিছু যদি জানার থাকে আপনার, আগে আমাকে জিজ্ঞেস করুন। অন্যথায় যা দেখতে পাচ্ছেন বা পাবেন, ঠিক সে-কথাই লিখুন। দয়া করে মনে রাখবেন, টিনটিনের কোনো কাহিনি লিখছেন না আপনি আমাকে-নিয়ে। ঠিক আছে?’
‘এক মিনিট! আমি তো আপনাকে বলিনি টিনটিনের কোনো কাহিনি লিখছি আমি, তা হলে আপনি কী করে…’
‘আপনি বলেছিলেন, স্পিলবার্গের হয়ে একটা কাজ করছেন। এবং স্পিলবার্গ এই মুহূর্তে কী পরিচালনা করছেন, জানি আমি।’
‘পরিচালনা না, প্রযোজনা করছেন তিনি।’
‘ওই একই কথা।
টের পেলাম, রেগে গেছি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, ‘ঠিক আছে, আপনার ব্যাপারে লিখবো আমি। লিখবো এই কেসের ব্যাপারে। কেসটা যখন সমাধান করবেন… যদি সমাধান করতে পারেন আর কী… তা হলে আমার প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে দেখবো এই কাহিনি ছাপাতে তিনি আগ্রহী হন কি না। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। যখন যা খুশি তা-ই বলবেন আমাকে, মুখে যা আসবে তা-ই শুনিয়ে দেবেন… এসব চলবে না। যত যা-ই হোক এই বইয়ের লেখক আমি। কাজেই কাহিনি কীভাবে এগোবে, সে-সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আমার।’
বড় বড় হয়ে গেল হোথর্নের চোখ। ‘শান্ত হোন, টনি। আমি শুধু সাহায্য করতে চাইছি আপনাকে।’
আলাপ-আলোচনা করে শেষপর্যন্ত একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম আমরা।
এই বই লেখার কাজ যতদিন চলতে থাকবে, ততদিন আর একটা পৃষ্ঠাও দেখাবো না আমি হোথর্নকে। যা-খুশি তা-ই লেখার স্বাধীনতা থাকবে আমার। যদি প্রয়োজন বোধ করি, হোথর্নের সমালোচনাও করতে পারবো। এমনকী নিজস্ব চিন্তাভাবনাও ঢুকিয়ে দিতে পারবো বইয়ের ভিতরে। কিন্তু ক্রাইমসিনের বর্ণনা অথবা জিজ্ঞাসাবাদের প্রসঙ্গ যদি আসে, তা হলে ঠিক যা ঘটেছিল অথবা ঘটছে, তা-ই লিখতে বাধ্য থাকবো। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবো না নিজের কল্পনাশক্তি, অনুমানসাপেক্ষে কিছু লিখবো না, অথবা অতিরঞ্জিত কোনো বর্ণনাও দেবো না। মোদ্দা কথা, এসব ক্ষেত্রে এমন কিছু লিখবো না, যার ফলে ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে পাঠক
সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো প্রথম চ্যাপ্টারের ব্যাপারেও। যেমন, ওই ঘণ্টা আর মন্ট ব্ল্যাঙ্ক কলমের ব্যাপারটা ভুলে যেতে হবে আমাকে। লিখতে হবে, যেদিন খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিন তিনি লাঞ্চ করেছেন রেমন্ড কুন্সের সঙ্গে। আন্দ্রিয়া ক্লুভানেকের বর্ণনাও বদল করতে হবে কিছুটা… এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে পাঠকের মনে হয়, মেয়েটা হয়তো সত্যি কথা বলছে না।
আর, খুনির পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে, এ-রকম কোনো ক্লু যদি দিতে চাই, তা হলে সেটা সম্পূর্ণ নির্ভুল হতে হবে।
৪. ক্রাইম সিন
সোমবার সকালে গিয়ে হাজির হলাম ডায়ানা ক্যুপারের বাসার বাইরে।
ইউনিফর্ম পরিহিত এক পুলিশ-অফিসার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ‘পুলিশ লাইন ডু নট ক্রস’ লেখা নীল-সাদা প্লাস্টিকের একটা টেপ ঝুলছে সদর দরজায়। কিন্তু আমি যে যাবো, সেটা কেউ একজন বলে রেখেছিল ওই অফিসারকে। কারণ আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিল লোকটা, আমার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না। যেদিনের কথা বলছি, তার ঠিক পাঁচ দিন আগে খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার। পুলিশের আরও কিছু ফাইল আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে হোথর্ন ইতোমধ্যে, কয়েকজনের ইন্টারভিউ রেকর্ডও পাঠিয়েছে। উইকএন্ডের পুরোটা খরচ করে ওসব পড়েছি আমি। নথিপত্রের সঙ্গে ছোট একটা নোটও পাঠিয়ে দিয়েছিল সে। বলেছিল, আজ এখানে সকাল ন’টার সময় যেন দেখা করি ওর সঙ্গে। যা-হোক, বাসার ভিতরে ঢুকে পড়লাম।
