‘কিন্তু কেউ একজন আসলেই অনুসরণ করেছিল কি না মিসেস ক্যুপারকে, জানি না আমরা। তাঁর সেদিনের কথোপকথন আসলেই আড়ি পেতে শুনেছিল কি না কেউ, তা-ও জানি না। …আপনি আসলে ঠিক কী ভাবছেন, বলুন তো?’
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘যে বা যারা বলছে, মিসেস ক্যুপারের নিজের-শেষকৃত্যের-আয়োজন-করা এবং একইদিনে তাঁর খুন হওয়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে, আমার মনে হয় আপনি তাদের দলে। অন্ততপক্ষে আপনি চাইছেন পাঠকরা যাতে সেটাই মনে করে। কিন্তু বিকল্প ব্যাখ্যাগুলোও মাথায় রাখতে হবে আপনাকে। নিজের শেষকৃত্যের জন্য যেদিন আলোচনা করতে গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেদিনই খুন হয়েছেন তিনি… ব্যাপারটা সম্পূর্ণ কাকতালীয়ও হতে পারে। তবে একটা সত্যি কথা বলি আপনাকে… কাকতালীয় কোনো কিছু একেবারেই পছন্দ করি না আমি। খুনখারাপি নিয়ে কাজ করছি গত বিশ বছর ধরে। কাকতালীয় কোনো কিছু ঘটেনি আমার কোনো কেসে… সোজাসুজি যদি বলি, সব কিছুসব সময় জায়গামতোই পেয়েছি। যা-হোক, মিসেস ক্যুপার হয়তো জানতেন, মরতে চলেছেন তিনি। তাঁকে হয়তো হুমকি দেয়া হয়েছিল। এবং হয়তো সে-কারণে তিনি নিজেই গিয়েছিলেন ফিউনারেল পার্লারে, আলাপ করেছেন নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠান নিয়ে। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, বাঁচার কোনো উপায় নেই তাঁর। ব্যাপারটা সম্ভব, কিন্তু একইসঙ্গে গোলমেলেও বটে। কারণ মিসেস ক্যুপার যদি সত্যিই টের পেয়ে থাকেন বাঁচার কোনো উপায় নেই তাঁর, তা হলে পুলিশের কাছে গেলেন না কেন? তা ছাড়া আমিই যে বার বার বলছি কেউ একজন জেনে গিয়েছিল কী করতে যাচ্ছেন তিনি, সেটাতেও ঘাপলা আছে… সেই কেউ একজনটা যে-কেউ হতে পারে। এবং যদি সত্যিই তা-ই হয়… যদি সত্যিই কেউ একজন মিসেস ক্যুপারের পিছু পিছু ঢুকে থাকে ওই ফিউনারেল পার্লারে, তা হলে অন্য কেউ টের পায়নি ব্যাপারটা। অর্থাৎ আপনার সেই ঘণ্টা বাজেনি।’
‘ঠিক আছে,’ বললাম আমি, ‘ঘণ্টাটা বাদ দিয়ে দেবো।’
‘আর ওই মন্ট ব্ল্যাঙ্ক কলমও বাদ দিতে হবে।’
‘কেন?’ কিন্তু হোথর্নকে কিছু বলার সুযোগ না-দিয়ে বলে চললাম, ‘ঠিক আছে, ওটাও বাদ দিয়ে দেবো। ওই কলম না-থাকলে তেমন কিছু যাবে-আসবে না।
পাতা উল্টাচ্ছে হোথর্ন। ভাবখানা এমন, এ-রকম কোনো বাক্য খুঁজছে, যা পছন্দ হতে পারে ওর। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু তথ্য নিজস্ব কায়দায় বাছাই করে নিয়েছেন।’
‘মানে?’
‘আপনি লিখেছেন, মিসেস ক্যুপার গণপরিবহন ব্যবহার করতেন। কিন্তু কেন করতেন তিনি কাজটা, সেটা বলেননি।’
‘বলেছি। একজায়গায় লিখেছি, খামখেয়ালি স্বভাবের ছিলেন তিনি।’
‘তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়ে গেছে। ঠিক কোন্ সার্ভিসটা চেয়েছিলেন তিনি জানেন আপনি, কিন্তু সেটা লেখেননি।’
‘লিখেছি। পবিত্র একটা স্তবক অথবা বিটলসের কোনো একটা গান…’
‘কোন্ স্তবক? বিটলসের কোন্ গান? ব্যাপারটা কি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি আপনার?’ নোটবুক বের করল হোর্থন, খুলল। ‘স্তবক নম্বর চৌত্রিশ। আই উইল রেস দ্য লর্ড অ্যাট অল টাইমস: হিজ প্রেইজ শ্যাল কন্টিনিউয়ালি বি ইন মাই মাউথ। আর গানটা ছিল: ‘এলিনররিগবি’… লিখেছিলেন খুব সম্ভব সিলভিয়া প্লাথ। টনি, এই ব্যাপারে মনে হয় আপনার সাহায্য লাগবে আমার। কারণ গানের কথাগুলো পড়েছিলাম আমি, কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি। আরেকটা কথা। মিসেস ক্যুপার চেয়েছিলেন, প্রশংসাসূচক উক্তিটা যেন লিখে দেয় তাঁর ছেলে। কী যেন বলা হয় ওই টার্মটাকে?’
‘ইউলোজি।’
‘হবে হয়তো। যা-হোক, ক্যাফে মুরানোতে লাঞ্চ করেছিলেন মিসেস ক্যুপার। তখন কে সঙ্গ দিয়েছিলেন তাঁকে, সেটা লেখা উচিত ছিল আপনার। লোকটার নাম রেমন্ড কুন্স… মঞ্চনাটক প্রযোজনা করেন।’
‘তাঁকেও কি সন্দেহ করা হচ্ছে?’
‘ক্লন্স প্রযোজনা করেছিলেন, এ-রকম একটা নাটকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড খুইয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। আমার অভিজ্ঞতা বলে, টাকা আর হত্যাকাণ্ড হাত ধরাধরি করে চলে।
‘আর কোনো কিছু কি মিস করেছি আমি?’
‘যেদিন খুন করা হয়েছে মিসেস ক্যুপারকে, সেদিনই গ্লোব থিয়েটারের বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। ব্যাপারটা কি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি আপনার? অথচ গত ছ’বছর ধরে ওই বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। যেদিন সিদ্ধান্ত নিলেন ছেড়ে দেবেন কাজটা, সেদিনই শেষ করে দেয়া হলো তাঁকে। …ক্লিনার আন্দ্রিয়া কুভানেকের বর্ণনাও অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে এসেছিল সে মিসেস ক্যুপারের বাড়ি থেকে, তারপর ফোন করেছিল পুলিশে… কোত্থেকে পেলেন আপনি এই খবর?’
‘পুলিশের কাছে যে-বিবৃতি দিয়েছিল সে, সেটা থেকে জানতে পেরেছি।
ওই বিবৃতি আমিও পড়েছি। কিন্তু আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে, মিথ্যা কথা বলেনি সে?
‘মিথ্যা কথা কেন বলবে?’
‘জানি না। কিন্তু এটা জানি, একটা ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে তার। কাজেই যা বলেছে সে সেটা যে এক শ’ ভাগ সত্যি, সে-রকম ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। ‘
‘ওই মেয়ের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে… জানলেন কী করে?’
চেক করেছি। যা-হোক, সবশেষে বলতে হয় মিসেস ক্যুপারের ছেলে ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা। মায়ের মৃত্যুতে আড়াই মিলিয়ন পাউন্ডের মালিক হয়ে গেছে সে রাতারাতি। অথচ আমার কাছে পাকা খবর আছে, টাকাপয়সার টানাটানি চলছিল তার।’
