‘ভুলটা কোথায় হয়েছে,’ বললাম আমি, ‘বুঝলাম না। মিসেস ক্যুপার তো এগারোটার দিকেই গিয়ে ঢুকেছিলেন ওই ফিউনারেল পার্লারে, নাকি?’
‘হ্যাঁ, ঢুকেছিলেন, কিন্তু আপনি যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, আসল ঘটনা সেভাবে ঘটেনি।’
সেভাবে ঘটেনি মানে? তিনি তো বাসে চেপেই সেখানে গিয়েছিলেন!’
‘তাঁর বাসার সামনের রাস্তা থেকে বাসে উঠেছিলেন তিনি। ব্যাপারটা জানতে পেরেছি, কারণ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে তাঁকে। ড্রাইভারকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, মিসেস ক্যুপারকে চিনতে পেরেছে লোকটা। এমনকী ওই ব্যাপারে পুলিশের কাছে বিবৃতিও দিয়েছে সে। কিন্তু আসল সমস্যা কোথায়, জানেন? আসল সমস্যা হচ্ছে, আপনি লিখেছেন রাস্তা পার হয়ে ফিউনারেল পার্লারে গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। এই কথা কেন লিখলেন?’
‘কেন, অসুবিধা কী?’
‘অসুবিধা একটাই… ডায়ানা ক্যুপার রাস্তা পার হননি। আমরা আসলে কথা বলছি ১৪ নম্বর বাস নিয়ে। তিনি ওই বাসে উঠেছিলেন চেলসি ভিলেজ থেকে। ব্রিটানিয়া রোডের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত জায়গাটা। যা-হোক, বাসটা মিসেস ক্যুপারকে নিয়ে হাজির হয়েছিল চেলসি ফুটবল ক্লাবের সামনে… মানে, হর্টেনশিয়া রোডে। তারপর সেখান থেকে যায় ওল্ড চার্চ রোডে। ওখানেই ওই বাস থেকে নেমে পড়েন তিনি।’
‘বুঝতে পারছি, লন্ডনের বাস রুট সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান আছে আপনার। তারপরও… ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না।’
‘বোঝাতে চাইছি, ১৪ নম্বর বাসে চড়ে ওই ফিউনারেল পার্লারে এলে রাস্তা পার হওয়ার দরকার হবে না মিসেস ক্যুপারের। কারণ বাস থেকে রাস্তার যে-পাশে নামবেন তিনি, পার্লারটা সে-পাশেই।’
‘তাতে এমন কী আসে-যায়?’
‘আসে-যায়। কারণ আপনি যদি উপন্যাসে লেখেন রাস্তা পার হয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, তা হলে সেটার মানে দাঁড়ায়, অন্য কোনো একটা কাজে কোথাও গিয়েছিলেন তিনি ফিউনারেল পার্লারে ঢোকার আগে। তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কী কাজে কোথায় গিয়েছিলেন তিনি? কেউ কেউ ভাবতে পারে, তিনি কি ব্যাংকে গিয়েছিলেন? একগাদা টাকা তুলে নিয়েছেন সেখান থেকে? নাকি কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাকবিতণ্ডায়, যার ফলে, পরে, সেদিনই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাঁকে? খুনি কি তাঁকে অনুসরণ করে রাস্তা পার হয়েছিল? দেখেছিল কোথায় কোথায় যাচ্ছেন তিনি? …কী হলো, আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? … যা-হোক, মোদ্দা কথা, ব্রেকফাস্ট সারার পর বাসা থেকে বেরিয়ে ওই বাসে উঠে পড়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। এবং সেদিন সকালে ওই কাজই করেছিলেন তিনি অন্য সব কিছুর আগে।’
‘আচ্ছা, ঠিক করে বলুন তো, আপনি আসলে কী লেখাতে চান আমাকে দিয়ে?’
এক তা কাগজে কিছু-একটা লিখে এনেছিল হোথর্ন; সেটা বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে।
হাতে নিয়ে পড়লাম কী লিখেছে সে:
ঠিক এগারোটা সতেরো মিনিটে ১৪ নম্বর বাস থেকে ওল্ড চার্চ স্ট্রীটে নেমে পড়লেন ডায়ানা জেইন ক্যুপার। ফুটপাত ধরে হাঁটলেন পঁচিশ মিটারের মতো। তারপর ঢুকে পড়লেন কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স নামের ফিউনারেল পার্লারটাতে।
.
‘এসব লেখা সম্ভব না আমার পক্ষে,’ সোজা জানিয়ে দিলাম। ‘কারণ আপনি যা লিখে এনেছেন, সেসব কোনো গল্পের মতো শোনাচ্ছে না। বরং সেসব পড়ে মনে হচ্ছে, কোনো পুলিশ-রিপোর্ট পড়ছি।’
‘পড়ে যা-ই মনে হোক, আমি যা লিখেছি তা একেবারে সঠিক। ও… আরেকটা কথা মনে পড়ে গেছে… ঘণ্টার ব্যাপারে এসব কী লিখেছেন?’
‘কীসের ঘণ্টা?’
‘কেন… এই যে দেখুন…’ প্রিন্ট করে নিয়ে আসা কাগজগুলো উল্টিয়ে একজায়গায় থামল হোথর্ন। পড়তে লাগল, ‘সদর দরজাটা খুললেন মিসেস ক্যুপার। দরজার পুরনো-ধাঁচের স্প্রিং মেকানিযমের সঙ্গে যুক্ত একটা ঘণ্টা বেজে উঠল জোরে, একবার।’ ওই ফিউনারেল পার্লারে ঘণ্টা কোথায় পেলেন আপনি, বলুন তো? এতবার গেলাম আমি সেখানে, কোনো ঘণ্টার ‘ঘ’-ও তো দেখলাম না! কারণ সেখানে আসলেই কোনো ঘণ্টা নেই।’
নিজেকে শান্ত রাখার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমি। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘দেখুন, বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে যেসব কল্পকাহিনি লেখা হয়, সেগুলোতে ও-রকম কোনো-না-কোনো বর্ণনা জুড়ে দেয়া হয়। বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখার মানে এ-ই না, ঠিক যা-যা ঘটেছিল, তা-ই লিখতে হবে আমাকে, তার বাইরে একটা-কথাও লেখা যাবে না। দয়া করে মনে রাখবেন, পাঠক একটা গল্প পড়ার জন্য আপনার বইটা হাতে নেবে, বাস্তব জীবনের কোনো বিবরণ পড়তে চাইবে না তারা। মনে রাখবেন, বই আর সংবাদপত্র এক জিনিস না। এবার আসুন কাজের কথায়। কন্সওয়ালিস অ্যান্ড সন্স-এর ব্যবসাটা যে পুরুষানুক্রমিক আর সেকেলে, সেটা বোঝানোর জন্য ওই ঘণ্টার বর্ণনা জুড়ে দিয়েছি আমি।’
‘তা হয়তো দিয়েছেন, কিন্তু ঝামেলা তো লাগিয়ে দিয়েছেন অন্য জায়গায়।‘
‘ঝামেলা?’
‘হুঁ। ধরুন কেউ একজন মিসেস ক্যুপারকে অনুসরণ করে ঢুকে পড়েছিল ওই পার্লারে। সেখানে সেদিন যা-যা বলেছিলেন তিনি, কেউ একজন আড়ি পেতে শুনে ফেলেছিল সেসব। ওই ঘণ্টা যদি রেখে দেন আপনি উপন্যাসে, তা হলে পরে পাঠক প্রশ্ন করবে, আড়ি-পাতা লোকটা যখন ঢুকল ওই পার্লারে, তখন ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেল না কেন অন্য কেউ?’
