ওই মহিলার প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে আক্রমণাত্মক কিছু নেই, তারপরও কেন যেন দমে গেলাম খানিকটা।
ব্যাখ্যা দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘ফয়েল’স ওয়ার নামের যে-টিভি সিরিয লিখেছি, সেটার প্রতিটা পর্ব বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত। ‘
‘আমি নিশ্চিত সত্যি ঘটনার উপর ভিত্তি করে অনেক কিছু লিখেছেন আপনি, কিন্তু আসলে যা বলতে চাইছি তা হলো, আপনি যে-অপরাধজগতের বর্ণনা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, সেটা তো বাস্তব কোনো কিছুর উপর ভিত্তি করে লেখা হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে আপনার দুটো টিভি সিরিয়ালের নাম বলি… পোয়ারো এবং মিডসামার মার্ডার্স। দুটো ধারাবাহিকই সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। আবার যদি অ্যালেক্স রাইডারের কথা বলি, চোদ্দ বছর বয়সী ওই ছেলেকে নিয়ে একের-পর-এক গুপ্তচর- কাহিনি লিখছেন আপনি। আমি জানি, অনেক ছেলেমেয়েই ওই কাহিনিগুলো পড়ে মজা পায়। কিন্তু সেখানেও সেই একই কথা… কল্পনা। আমি যা জানতে চাইছি তা হলো, বাস্তবজীবনের উপর কোনো আগ্রহ কেন নেই আপনার?’
‘বাস্তবজীবন বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?’ পাল্টা প্রশ্ন করলাম।
‘বোঝাতে চাইছি আমাদের আশপাশের রক্তমাংসের মানুষদের, এবং তাদেরকে ঘিরে যে-অপরাধজগত আবর্তিত হয়, সেটা।’
অস্থির হয়ে উঠেছে কোনো কোনো ছেলেমেয়ে। প্রশ্নোত্তর পর্ব দ্রুত শেষ করার জন্য আরও একবার তাগাদা দেয়া হলো আমাকে।
বললাম, ‘কল্পকাহিনি লিখতে ভালো লাগে আমার।’
‘আপনার কি কখনও মনে হয় না, এমন একটা দিন আসতে পারে, যখন অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আপনার-লেখা বইগুলো?’
‘আমার মনে হয়, কোনো লেখকের লেখা যদি প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে হয়, তা হলে তাঁকে যে বাস্তবজীবনের উপর ভিত্তি করেই লিখতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।’
‘কিছু মনে করবেন না… একমত হতে পারলাম না আপনার সঙ্গে। আপনার লেখা ভালো লাগে আমার, তারপরও বাধ্য হয়ে বললাম কথাটা।’
দু’দিন আগে হোথর্ন কী প্রস্তাব দিয়েছিল আমাকে, মনে পড়ে গেল হঠাৎ করেই।
অনুষ্ঠান থেকে চলে আসার আগে এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজলাম ওই মহিলাকে, কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না। আমার লেখা কোনো বইয়ে অটোগ্রাফ নেয়ার জন্যও আমার সামনে আসেনি সে।
ট্রেনে চেপে যখন লন্ডনে ফিরছি, নাম-না-জানা সেই মহিলা যেন ভূতের মতো সওয়ার হলো আমার চিন্তাভাবনার ঘাড়ে। তার কথাগুলো বার বার না-ভেবে পারলাম না। সে কি ঠিক কথাই বলেছে? আমার লেখালেখি কি আসলেই বেশি মাত্রায় কল্পনানির্ভর হয়ে যাচ্ছে? কিশোর-সাহিত্যিক থেকে একজন অ্যাডাল্ট- রাইটারে পরিণত হতে চলেছি আমি, আমার জন্য দ্য হাউস অভ সিল্ক বইটা হয়তো পরিণত হতে যাচ্ছে একটা টার্নিং পয়েন্টে, তারপরও… যে-সময়কালের উপর ভিত্তি করে ওই কাহিনি লিখেছি, সেটা এখনকার আধুনিক পৃথিবী থেকে যোজন যোজন দূরে। টেলিভিশনের জন্য যেসব কাহিনি লিখেছি… উদাহরণ হিসেবে ইনজাস্টিস- এর কথাই ধরা যাক… একবিংশ শতাব্দীর লন্ডনের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে সেটা, কিন্তু সেটাতেও প্রয়োগ করেছি নিজের কল্পনাশক্তি।
তার মানে ওই মহিলা কি ঠিক কথাই বলেছে?
এমন একটা দিন কি আসলেই আসতে পারে, যখন অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে আমার-লেখা বইগুলো?
প্যাডিংটন স্টেশনে পৌঁছাতে অনেকক্ষণ সময় লাগল। যতক্ষণে বাসায় পৌঁছালাম, ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে আমার। তাই বাসায় ঢুকেই তুলে নিলাম ফোনটা।
‘হোথৰ্ন?’
‘টনি!’
‘আমি রাজি। বখরা আধাআধি। আছি আমি আপনার সঙ্গে।’
৩. প্রথম অধ্যায়
আমার লেখা প্রথম অধ্যায়টা পছন্দ হয়নি হোথর্নের।
ওটা প্রথমে দেখাইনি ওকে। ইনজাস্টিস নামের সেই টিভি সিরিযের সময় কী কাণ্ডটা সে করেছিল, ভালোমতোই মনে আছে আমার। তাই ওই চ্যাপ্টার লুকিয়ে রেখেছিলাম নিজের কাছে। কিন্তু ওটা দেখতে চাইল হোর্থন… রীতিমতো জোরাজুরি শুরু করে দিল। যেহেতু আধাআধি বখরার চুক্তিতে রাজি হয়েছি, সেহেতু ওর দাবি অগ্রাহ্য করি কী করে?
বরাবরের মতো একটা রেস্টুরেন্টের বাইরে বসে আছি আমরা দু’জন। প্ৰথম চ্যাপ্টারটা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ওর কাছে। সঙ্গে করে আনা অ্যাটাচি কেসের ভিতর থেকে আমার সেই ই-মেইলের প্রিন্ট-করা কপি যখন বের করল সে, বুঝে গেলাম কপালে খারাপি আছে আমার। লাল কালিতে অঙ্কিত অনেকগুলো কাটা চিহ্ন আর বৃত্ত দেখতে পাচ্ছি আমার সে-লেখায়।
নিজের লেখালেখির ব্যাপারে যদি মন্তব্য করতে বলা হয় আমাকে, তা হলে নিজেকে খুব সতর্ক বলবো আমি। লেখার আগে প্রতিটা শব্দ নিয়ে চিন্তা করি। হোথর্নের প্রস্তাবে যখন রাজি হয়েছিলাম, তখন ভেবেছিলাম, কেসের দায়িত্ব ওর কাঁধে থাকার পরও কাহিনির-বর্ণনার-সময় সে থাকবে ‘ব্যাক সিটে’। ভুল ধারণাটা থেকে আমাকে মুক্তি দিল সে।
‘সব ভুল করে বসে আছেন আপনি, টনি,’ বলল হোথর্ন। ‘আসলে পাঠকদের বিশ্বাস করাতে চাইছেন এমন কিছু একটা, যা সত্যি না।’
‘মানে?’
‘প্রথম বাক্যটার কথাই ধরুন। সম্পূর্ণ ভুল ওটা।’
যা লিখেছি, পড়তে শুরু করলাম:
বসন্তের এক উজ্জ্বল সকাল। ঘড়িতে মাত্র এগারোটা বেজেছে। প্রায় সাদা সূর্যের- আলো যেন প্রতিজ্ঞা করেছে, আজ এমন এক উষ্ণতা বিলিয়ে দেবে, যা সচরাচর দেয় না। ফুলহ্যাম রোড পার হলেন ডায়ানা ক্যুপার, গিয়ে ঢুকলেন ফিউনারেল পার্লারে।
