হতাশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘আপনার বাঁ পায়ের জুতোর ফিতাটা চিবানো হয়েছে। কাজটা যদি আপনার না-হয়ে থাকে, তা হলে সেটা কার, বলতে পারেন? পূর্ণ বয়স্ক কোনো কুকুর কি করবে ওই কাজ?’
ফিতাটার দিকে তাকালাম না আমি। সন্তুষ্ট হয়েছি, মনে মনে আরেকদফা প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছি হোথর্নের। একইসঙ্গে বেজার হয়েছি নিজের উপর- ব্যাখ্যা দুটো এত সহজ ছিল, অথচ ওগুলো আমার মাথায় আসেনি!
বললাম, ‘দুঃখিত। আপনি যে-কেসের কথা বলতে চাইছিলেন, সেটা আসলেই ইন্টারেস্টিং লাগছে আমার কাছে। তারপরও… যেমনটা বলেছি… কোনো একজন সাংবাদিক অথবা ও-রকম কাউকে খুঁজে বের করলেই ভালো হবে আপনার জন্য। আমি চাইলেও করতে পারবো না আপনারকাজটা। কারণ অন্য আরও কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে আমাকে আগামী বেশ কিছু দিন।’
‘কী আর করা’ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল হোথর্ন, হাত ঢুকিয়ে দিল ট্রাউজারের পকেটে। ‘দাম দিয়ে দেবো?’
চা আর কেকের কথা বোঝাচ্ছে সে। ‘না, না, লাগবে না,’ ভদ্রতা করলাম, ‘আমিই দিয়ে দেবো। ধন্যবাদ।’
‘আমি এক কাপ কফি খেয়েছি।’
‘ঠিক আছে, ওটার দামও দিয়ে দেবো।’
‘যদি সিদ্ধান্ত বদল করেন, তা হলে যোগাযোগ করতে পারেন। কীভাবে খোঁজ পাওয়া যাবে আমার, জানা আছে আপনার!
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি আমার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে দেখবো। আপনাকে সাহায্য করতে পারবে, এমন কারও খোঁজ দিতে পারবে মেয়েটা।’
‘না, থাক। যদি দরকার হয়, আমি নিজেই খুঁজে নিতে পারবো কাউকে।’ ঘুরে চলে গেল হোথর্ন।
কেকটা শেষ করলাম আমি। ভেবে খারাপ লাগছে, শুধু শুধু অপচয় করলাম কিছু টাকা। বাসায় ফিরে গেলাম, যে-উপন্যাসটা পড়ছিলাম সেটা নিয়ে বসলাম আবার। হোথর্নকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছি, কিন্তু ওর কথা মনে পড়ছে বার বার।
কেউ যদি ফুল-টাইম লেখক হয়ে যায়, তা হলে কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করাটা তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করার মানে হচ্ছে, এমন কোনো দরজা লাগিয়ে দেয়া, যেটা আর কখনও খুলবে না। এবং লাগিয়ে-দেয়া সেই দরজার ওপাশে কী আছে, তা সম্পূর্ণ মিস করবে ওই লেখক।
প্রশ্ন হচ্ছে, সে-রকম কোনো কিছু কি মিস করছি আমি?
একজন মহিলা গিয়ে হাজির হলেন একটা ফিউনারেল পার্লারে। ওই ঘটনার ছ’ঘণ্টা পর তাঁরই বাড়িতে খুন করা হলো তাঁকে। ধাঁধায় পড়ে গেল পুলিশ। ডাক পড়ল ড্যানিয়েল হোথর্নের। অদ্ভুত আর জটিল চরিত্রের একজন মানুষ সে, কিন্তু গোয়েন্দাগিরিতে ওর মেধা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই! কনসালটেন্সির দরকার হয়ে পড়ল পুলিশের। তারপর?
তারপর কী হলো?
টের পাচ্ছি, অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা পেয়ে বসেছে আমাকে।
হোথর্নের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কি ভুল করলাম?
অনিশ্চয়তায় ভুগতে ভুগতে আবারও তুলে নিলাম উপন্যাসটা, ডুবে গেলাম সেটাতে।
দু’দিন পর গিয়ে যোগ দিলাম সেই সাহিত্য-উৎসবে।
সারা পৃথিবীতে এ-রকম উৎসব ক’টা হয় প্রতি বছর, ভাবলে মজা লাগে আমার। এ-রকম অনেক লেখককে চিনি আমি, যাঁরা ওসব উৎসবে যোগ দেন হরহামেশা, অথচ তাঁদের লেখালেখি বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বই সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়াটাই তাঁদের কাজ এখন।
যা-হোক, ভালোই হলো আমার সেশনটা। ছোট ছোট অনেক বাচ্চা এসেছে এই অনুষ্ঠানে, অনুষ্ঠানটা প্রাণবন্ত করে রেখেছে তারা। তাদের কেউ কেউ চমৎকার কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল আমাকে। কথা বলতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ফেললাম আমি। সঞ্চালকদের একজন ইশারায় বক্তৃতা শেষ করতে বললেন আমাকে। আর ঠিক তখনই ঘটল অদ্ভুত এক ঘটনা।
দর্শকের মধ্যে একেবারে সামনের সারিতে বসে আছে একজন মহিলা। প্ৰথম দেখায় তাকে একজন শিক্ষিকা অথবা লাইব্রেরিয়ান বলে মনে করেছিলাম। দেখতে একেবারে সাদামাটা, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স, চেহারাটা গোলগাল। মাথায় লম্বা লম্বা সাদাটে চুল। ঘাড় থেকে একটা চেইনের মাধ্যমে ঝুলছে চশমা। দুটো কারণে তাকে লক্ষ করেছি। এক, তাকে একা বলে মনে হয়েছে আমার। আর দুই, আমি এতক্ষণ ধরে যা বলেছি সেসবের একটা শব্দের প্রতিও তার কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে কৌতুক করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একবারের জন্যও হাসতে দেখিনি তাকে। মহিলা কোনো সাংবাদিক কি না, ভেবে একটুখানি হলেও শঙ্কা জাগল আমার মনে। শুনেছি আজকাল নাকি পত্রপত্রিকা থেকে সাহিত্য-বিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিক পাঠানো হয়, সেসব সাংবাদিক নাকি লেখকদের বিভিন্ন বেফাঁস কথা টুকে নিয়ে গিয়ে ছাপিয়ে দেয় পত্রিকায়, পরে ওই উক্তি ব্যবহৃত হয় ওই লেখকের বিরুদ্ধেই। কাজেই মহিলাটা যখন আমাকে কিছু-একটা জিজ্ঞেস করার জন্য হাত তুলল, মনে মনে সতর্ক না-হয়ে পারলাম না। অ্যাটেন্ডেন্টদের একজন এগিয়ে গিয়ে মাইক তুলে দিল মহিলার হাতে।
‘একটা কথা ভাবছিলাম,’ বলল মহিলাটা। ‘আপনি সব সময় কল্পকাহিনিই লেখেন কেন? বাস্তব কোনো ঘটনা নিয়ে কিছু লেখেন না কেন?’
এ-রকম কোনো প্রশ্ন কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি আমাকে। সচরাচর যেসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় আমাকে সেগুলো হলো, নিত্যনতুন এত আইডিয়া কোত্থেকে পাই আমি? আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কোনটা? একটা বই লিখতে কতদিন সময় লাগে আমার?
