‘গত সপ্তাহে কেউ একজন খুন করেছে তাঁকে।
‘আপনি কি বলতে চাইছেন আমিই করেছি কাজটা? প্রশ্নটার জবাব যদি হ্যাঁ হয়, তা হলে বলতে বাধ্য হবো, উদ্ভট চিন্তাভাবনা করছেন। মিসেস ক্যুপার কোথায় থাকতেন, এমনকী সেটাও জানা ছিল না আমার।’
কথাটা কেন যেন বিশ্বাস হলো না আমার। আজকাল কারও ঠিকানা খুঁজে বের করাটা বলতে-গেলে কোনো ব্যাপারই না।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম মেরি ও’ব্রায়ানের দিকে। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, প্রথম দেখায় যে-রকম মনে হয়েছিল, মেয়েটা তার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। একটা তরতাজা ভাব আছে তার মধ্যে। একরকমের সরলতা আছে। সব মিলিয়ে খুবই আবেদনময়ী। একইসঙ্গে, টের পেলাম, কেন যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না এই মেয়েকে। কেন যেন বার বার মনে হচ্ছে, সত্যি কথাটা পুরোপুরি বলছে না সে আমাদেরকে।
জুডিথ গডউইন বললেন, ‘মিস্টার হোথর্নের ধারণা, জেরেমি নিজেই গিয়ে দেখা করেছিল ওই মহিলার সঙ্গে।’
‘সেটা সম্পূর্ণ অসম্ভব,’ বলল মেরি। ‘জেরেমি একা কোথাও যায় না কখনও।’
দেখে মনে হলো না, একটুও দমে গেছে হোথর্ন। বলল, ‘হতে পারে। কিন্তু আপনারা জানেন কি না জানি না, খুন হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ছেলের কাছে অদ্ভুত একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। সেটাতে যা বলা হয়েছে, তা পড়ে আমরা ধারণা করছি, খুন হওয়ার আগে জেরেমিকেই দেখেছিলেন তিনি।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সে, তারপর হঠাৎ জানতে চাইল, ‘এই মাসের নয় তারিখে… সোমবারে… আপনি আর জেরেমি কি এখানেই ছিলেন?’
‘হ্যাঁ,’ জবাব দিতে কোনো রকম দ্বিধা করল না মেরি।
‘সেদিন দক্ষিণ কেনসিংটনের একটা দোকানে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন মিসেস গডউইন; তাঁর সঙ্গে যাননি?’
‘দোকানপাট ঘেন্না করে জেরেমি। ওকে সঙ্গে নিয়ে কোনো কিছু কিনতে যাওয়াটা দুঃস্বপ্নের মতো।’
জুডিথ বললেন, ‘আপনারা এক কাজ করছেন না কেন? সরাসরি গিয়ে দেখা করছেন না কেন জেরেমির সঙ্গে?’
কথাটা শুনে, মনে হলো, আশ্চর্য হয়েছে মেরি।
হোথর্নের দিকে তাকিয়ে আছেন জুডিথ। ‘আপনারা ইচ্ছা করলে গিয়ে দেখা করতে পারেন জেরেমির সঙ্গে। ইচ্ছা করলে টুকটাক প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতে পারেন ওকে। তবে… একটু খেয়াল রাখবেন… সে কিন্তু অল্পতেই আপসেট হয়ে যায়।’
মিসেস গডউইনের কথায় মেরির-মতো আশ্চর্য হয়েছি আমিও। তবে, বুঝতে পারলাম, জেরেমির সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়ে আমাদের-কবল-থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন তিনি আসলে।
যা-হোক, সম্মতি জানানোর কায়দায় মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন।
আমাদের দু’জনকে নিয়ে উপরতলায়-যাওয়ার সিঁড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হলেন জুডিথ।
সিঁড়ি বেয়ে উঠছি আমরা। পুরনো কাঠের-সিঁড়ি ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ করছে আমাদের পায়ের নিচে। যত উপরে উঠছি, এই বাড়ি তত পুরনো আর বেখাপ্পা ঠেকছে আমার কাছে। দোতলায় চলে এলাম। ল্যান্ডিং পার হয়ে হাজির হলাম একটা ঘরের সামনে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এই ঘর কোনো এককালে মাস্টার বেডরুম ছিল এবং এখন এখানে থাকতে দেয়া হয়েছে জেরেমিকে। করিডরের একটা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের রক্সবরো অ্যাভিনিউ।
ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। সেটাতে টোকা দিলেন জুডিথ। জেরেমির পক্ষ থেকে সাড়ার জন্য অপেক্ষা করলেন না। আমাদেরকে নিয়ে ঢুকে পড়লেন ভিতরে।
‘জেরেমি?’ বললেন তিনি। ‘দু’জন লোক এসেছেন… তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
‘তাঁরা কারা?’ আমাদের দিকে উল্টো ঘুরে আছে জেরেমি।
‘এই তো… আমার দু’জন বন্ধু। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।’
একটা কম্পিউটারের সামনে বসে আছে জেরেমি। কোনো একটা গেম খেলছে… খুব সম্ভব মর্টাল কম্ব্যাট। কণ্ঠ শুনেই বোঝা গেল, কিছু-একটা সমস্যা আছে ওর। কেমন ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ… যেন ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। শুনলে মনে হয়, যেন বসে আছে দেয়ালের ওপাশে… যেন দেয়াল ভেদ করে শোনা যাচ্ছে ওর গলার আওয়াজ। বেশ মোটা সে। মাথায় লম্বা লম্বা কালো চুল। সে-চুলে কতদিন চিরুনি পড়েনি, কে জানে! পরনে ব্যাগি জিন্স আর একটা মোটা-বেঢপ সোয়েটার। ঘরের দেয়ালে-দেয়ালে এভারটন ফুটবল দলের পোস্টার। ডাবল বিছানাটায় এভারটনের একটা লেপ দেখতে পাচ্ছি। সব কিছু পরিপাটি, তারপরও কেমন যেন জীর্ণশীর্ণ। মনে হয়, কেউ যেন এই সাজানো ঘর ফেলে চলে গেছে।
যে-গেম খেলছে জেরেমি, সেটার একটা লেভেল শেষ করল; চাপ দিল পজ বাটনে। তারপর ঘুরল আমাদের দিকে।
ওর চেহারাটা গোলগাল। ঠোঁট মোটা। গালের এখানে-সেখানে হালকা দাড়ি আছে। ওর মস্তিষ্ক যে ক্ষতিগ্রস্ত, সেটা ওর বাদামি চোখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়– কৌতূহলের ছিটেফোঁটাও নেই সেখানে, আমাদেরকে দেখেও যেন দেখছে না। আমি জানি ওর বয়স আঠারো, কিন্তু দেখতে আরও বড় বলে মনে হচ্ছে।
কে আপনারা?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘আমার নাম হোথর্ন। আমি তোমার মায়ের বন্ধু।’
‘আমার মায়ের খুব বেশি বন্ধু নেই।’
‘কথাটা মনে হয় ঠিক না।’ এদিক-ওদিক তাকাল অথবা তাকানোর ভান করল হোথর্ন। ‘তোমার ঘরটা সুন্দর, জেরেমি।
‘এখন আর এই ঘর আমার না। আর কিছুদিনের মধ্যেই এই বাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছি আমরা।’
‘এই ঘরের মতোই সুন্দর আরেকটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেবো আমরা তোমাকে,’ বলল মেরি। আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়েছে সে ঘরের ভিতরে, বসেছে বিছানায়।
