‘আমাদেরকে যদি এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে না-হতো, তা হলে মনে হয় ভালো হতো,’ জেরেমির কণ্ঠে আক্ষেপ।
‘আপনারা কি কিছু জিজ্ঞেস করতে চান ওকে?’ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন জুডিথ, আমরা কী জানতে চাইবো জেরেমির কাছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন
সম্ভবত।
‘তুমি কি প্রায়ই বাইরে যাও, জেরেমি?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।
কথাটা কেন জানতে চাইল সে, ঠিক বুঝলাম না। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, লন্ডনের রাস্তায় একা বের হওয়ার মতো সক্ষমতা নেই জেরেমির। আগ্রাসী বা অন্য কোনো ধরনের হিংসাত্মক মনোভাবও দেখতে পাচ্ছি না ওর ভিতরে। ওর ভিতর থেকে ওসব আবেগ বের করে নিয়ে গেছে দুর্ঘটনাটা। একইসঙ্গে জীবনের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশও বিদায় নিয়েছে ওর ভিতর থেকে।
‘মাঝেমধ্যে বাইরে যাই আমি,’ বলল জেরেমি।
‘কিন্তু একা না,’ বলল মেরি।
‘কখনও কখনও বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাই,’ বলল জেরেমি। শুনে মনে হলো, মেরি একটু আগে যা বলেছে, সেটার প্রতিবাদ করেছে যেন
‘তোমাকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিই আমরা তখন। গন্তব্যের শেষপ্রান্তে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। কাজেই এভাবে দেখা করতে যাওয়াটা একা-একা কোথাও যাওয়ার মধ্যে পড়ে না।
‘কখনও দক্ষিণ কেনসিংটনে গেছ তুমি?’ জানতে চাইল হোথর্ন।
‘অনেকবার।’
মিসেস গডউইন বললেন, ‘ওটা কোথায়, জানে না সে।’
আর তেমন কোনো কথা হলো না জেরেমির সঙ্গে। এই ঘরে থাকতে মোটেও ভালো লাগছে না আমার, তাই বেরিয়ে এলাম। হোথর্নও চলে এল আমার পিছু পিছু। আমাদেরকে নিচতলায় নিয়ে গেলেন জুডিথ গডউইন।
হোথর্ন বলল, ‘মেরি মেয়েটা যে এখনও আছে আপনাদের সঙ্গে, সেজন্য কৃতিত্ব পাওয়া উচিত তার।’
কণ্ঠ শুনে মনে হলো, মেরির উপর সন্তুষ্ট হয়েছে সে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে আমার, আসলে আরও কিছু তথ্য আদায় করে নিতে চাইছে মিসেস গডউইনের কাছ থেকে
‘টিমোথি আর গডউইনকে খুব আদর করত মেরি,’ শীতল কণ্ঠে বললেন জুডিথ। ‘তাই দুর্ঘটনার পরও রয়ে গেছে আমাদের সঙ্গে। এবং সে যে আছে, সেজন্য আমি খুশি।
আরও একবার মনে হলো আমার, কিছু একটা বলছেন না তিনি।
‘আপনারা এখান থেকে চলে যাওয়ার পরও কি সে থাকবে আপনাদের সঙ্গে?’
‘এই ব্যাপারটা নিয়ে এখনও কথা হয়নি ওর সঙ্গে।’
হাঁটতে হাঁটতে সদর-দরজার কাছে হাজির হয়ে গেছি আমরা।
দরজাটা খুলে দিলেন জুডিথ। ‘একটা কথা বলি… কিছু মনে করবেন না। আর যদি না-আসেন আপনারা, ভালো হয়। কারণ মনোযোগ ব্যাহত হয়, এ-রকম কিছু পছন্দ করে না জেরেমি। তা ছাড়া যাদেরকে চেনে না, তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। আসলে… আমি চেয়েছিলাম ওকে দেখুন আপনারা, যাতে কী- অবস্থা-ওর বুঝতে পারেন। চেয়েছিলাম যাতে বুঝতে পারেন, ডায়ানা ক্যুপারের সঙ্গে যা ঘটেছে, সে-ব্যাপারে কিছুই করার নেই আমাদের। পুলিশও বিশ্বাস করে না, ওই ঘটনায় কোনো সম্পৃক্ততা আছে আমাদের। এর বেশি কিছু বলার নেই আমার।
‘ধন্যবাদ,’ বলল হোথর্ন। ‘সহযোগিতা করলেন আমাদেরকে।’
চলে এলাম আমরা।
দরজাটা লাগিয়ে দেয়া হলো আমাদের পেছনে।
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল হোথর্ন, একটা ধরাল। খোলা বাতাসে বেরিয়ে এসে আমারও ভালো লাগছে।
‘চিঠিটা মিসেস গডউইনকে দেখালেন না কেন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘কী?’ ম্যাচকাঠি ঝাঁকাচ্ছে হোথর্ন, নেভাচ্ছে আগুন।
‘ডায়ানা ক্যুপার যে-চিঠি পেয়েছিলেন, সেটা মিসেস গডউইনকে দেখাননি বলে আশ্চর্য হয়েছি। কোন চিঠির কথা বলছি, বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই… আন্দ্রিয়া ক্লুভানেকের কাছ থেকে যেটা পেয়েছিলেন, সেটা। হতে পারে, ওই চিঠি মিসেস গডউইনই লিখেছেন। অথবা তাঁর স্বামী লিখেছেন। তাঁকে যদি দেখানো হতো চিঠিটা, হাতের-লেখা চিনতে পারতেন তিনি।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। খেয়াল করলাম, আনমনা হয়ে আছে সে… কিছু-একটা ভাবছে। বিড়বিড় করে বলল, ‘আহা বেচারা!’
বুঝে নিলাম, জেরেমির কথা ভাবছে। বললাম, ‘আসলেই… ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গেছে ওই ছেলের সঙ্গে।’
আন্তরিকভাবেই বলেছি কথাটা। মনে পড়ে গেছে আমার দুই ছেলের কথা। লন্ডনের রাস্তায় প্রায়ই বেরিয়ে পড়ে ওরা সাইকেল নিয়ে। কখনও কখনও হেলমেট পড়তে ভুলে যায়। তখন ওদের সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে হয় আমাকে। কিন্তু… এই ব্যাপারে বেশি কিছু করারও নেই আমার। ওদের দু’জনের বয়সই ত্রিশের কাছাকাছি… আসলে একটা বয়সের পর ছেলে-মেয়েদেরকে তেমন কিছু বলাও যায় না। যা-হোক, জেরেমি গডউইন যেন আমার কাছে দুঃস্বপ্নের কোনো মূৰ্ত প্ৰকাশ।
‘আমার একটা ছেলে আছে,’ বলল হোথর্ন।
‘ওর বয়স কত?’
‘এগারো।’
খেয়াল করলাম, কেমন মনমরা হয়ে গেছে হোথর্ন। ওর আনমনা ভাবটা যায়নি।
হাঁটতে শুরু করল সে। ওর পিছু নিলাম।
অদ্ভুত কিছু-একটা ঘটল এমন সময়।
আজব কোনো এক তাড়না অনুভব করলাম আমি নিজের ভিতরে। অথবা… হতে পারে… কোনো একটা নড়াচড়া দেখতে পেলাম চোখের কোনা দিয়ে। মনে হতে লাগল, কেউ যেন নজর রাখছে আমাদের উপর। হাঁটতে হাঁটতে থেমে দাঁড়ালাম, ঘুরে তাকালাম মিসেস গডউইনের বাড়ির দিকে।
হ্যাঁ, আমার অনুমান ভুল হয়নি।
জেরেমি গডউইনের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ একজন। তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।
মানুষটা কে, সেটা আমি ঠাহর করার আগেই সরে গেল সে ওই জানালার কাছ থেকে।
৯. তারকার ক্ষমতা
হাঁটতে হাঁটতে ফিরছি আমরা টিউব স্টেশনে। বেজে উঠল হোথর্নের মোবাইল ফোন। কল রিসিভ করল সে, কথা বলল কিছুক্ষণ, কিন্তু নিজের নামটা বলল না। শুধু চুপ করে থেকে আধ মিনিটের মতো শুনল ও-প্রান্তের কথাগুলো। তারপর লাইন কেটে দিল।
