‘ওহ্,’ ঝুলে পড়ল মেরির চেহারা। আড়চোখে তাকাল দরজার দিকে। চলে যাবে কি না, ভাবছে বোধহয়। অথবা হয়তো ভাবছে, এখানে না-এলেই ভালো করত।
‘ডিলে কী ঘটেছিল, সে-ব্যাপারে তোমার সঙ্গে হয়তো কথা বলতে চাইতে পারেন তাঁরা।
মাথা ঝাঁকাল মেরি। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা যা জানতে চাইবেন, বলবো আমি। তবে… এসব কথা হাজারবার বলেছি ইতোমধ্যে।’ এগিয়ে এসে বসে পড়ল টেবিলের একধারে।
উঠে গেলেন জুডিথ, চলে গেলেন ঘরের এককোনায়।
একটুখানি আশ্চর্য না-হয়ে পারলাম না। কোনো একটা চাপা উত্তেজনা চলছে নাকি জুডিথ আর মেরির মধ্যে?
‘কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাদেরকে?’ বলল মেরি।
‘সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, বলতে পারেন আমাদেরকে,’ বলল হোথর্ন। ‘আমি জানি এসব কথা আগেও অনেকবার বলেছেন, তবু আবারও যদি বলেন, আমাদের কাজে লাগতে পারে।’
‘ঠিক আছে।’ ভাব দেখে মনে হলো, মেরি যেন স্থির হওয়ার চেষ্টা করছে।
তাকালাম জুডিথের দিকে। আমাদেরকেই দেখছেন তিনি।
‘সৈকত থেকে চলে এলাম আমরা,’ বলতে শুরু করল মেরি। ‘ছেলে দুটোকে কথা দিয়েছিলাম, হোটেলে ফিরে যাওয়ার আগে আইসক্রিম খেতে পারবে ওরা। আমরা উঠেছিলাম রয়্যাল হোটেলে। সৈকত থেকে হোটেলটা ছিল কাছেই। যা- হোক, ছেলে দুটোকে বার বার বলেছিলাম, রাস্তা পার হওয়ার সময় আমার হাত যাতে ধরে রাখে… কিছুতেই যাতে না-ছাড়ে। সাধারণত ও-রকম কিছু করত না ওরা। কিন্তু সেদিন ওরা দু’জনই ছিল অতিমাত্রায় ক্লান্ত– লম্বা সময় ধরে হুটোপুটি করেছিল সৈকতে, তাই। আইসক্রিমের দোকানটা হঠাৎ করেই দেখতে পেল, আর তারপর… আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি, রাস্তা পার হওয়ার জন্য ছুট লাগিয়েছে ওরা… দৌড়ে যাচ্ছে ওই দোকানের দিকে
ওদের পেছন পেছন ছুট লাগালাম আমিও। ইচ্ছা ছিল, ধরে ফেলবো ওদেরকে। আর ঠিক তখনই দেখতে পেলাম গাড়িটা… নীল রঙের একটা ভক্সওয়াগেন… ছুটে আসছে আমাদের দিকে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমাদেরকে দেখতে পাবে চালক, ব্রেক কষবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। টিমোথি আর জেরেমিকে আমি ধরে ফেলার আগেই ওদেরকে জোরে ধাক্কা মারল গাড়িটা। দেখলাম, হুমড়ি খেয়ে এক পাশে পড়ে গেল টিমোথি, আর জেরেমি স্রেফ উড়াল দিল বাতাসে। ভেবেছিলাম, দুই ভাইয়ের মধ্যে জেরেমিরই ক্ষতি হবে বেশি।’ মিসেস গডউইনের দিকে তাকাল মেরি। ‘আপনার সামনে এসব কথা বলতে ভালো লাগে না আমার, জুডিথ।’
‘সমস্যা নেই, মেরি। তাঁরা শুধু জানতে চাইছেন… তার বেশি কিছু না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল মেরি। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘টিমোথি আর জেরেমিকে চাপা দিয়ে গজ বিশেক এগিয়ে গেল গাড়িটা, তারপর সজোরে ব্রেক কষল ড্রাইভার, রাস্তার সঙ্গে চাকার ঘর্ষণের বিশ্রী আওয়াজ উঠল। ভেবেছিলাম, গাড়ি থেকে নামবে সে, কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটেনি। বরং হুট করে গাড়ি চালু করল, গতি বাড়াল, কিছুক্ষণের মধ্যেই গায়েব হয়ে গেল।’
‘ড্রাইভিং সিটে মিসেস ক্যুপারকে দেখেছিলেন?’
‘না। তবে… যতদূর মনে পড়ে, ওই মহিলার মাথার পেছনদিকটা নজরে পড়েছিল আমার। আসলে… চোখের সামনে ও-রকম একটা ঘটনা ঘটতে দেখে সাংঘাতিক নাড়া খেয়েছিলাম মানসিকভাবে, অত কিছু খেয়াল করার মতো অবস্থা ছিল না আমার তখন।’
‘ঠিক আছে। বলে যান।’
‘আর বেশি কিছু বলার নেই। আশপাশ থেকে খুব দ্রুত হাজির হলো অনেক লোক। আইসক্রিমের সেই দোকানের পাশেই ছিল একটা ওষুধের দোকান। সে- দোকানের মালিক হাজির হয়েছিলেন সবার আগে। তাঁর নাম ট্র্যাভার্টন। তিনি খুব সাহায্য করেছিলেন সেদিন।’
‘আইসক্রিমের সেই দোকান থেকে কেউ আসেনি?’
‘না,’ তিক্ত কণ্ঠে বললেন জুডিথ। ‘কারণ দোকানটা বন্ধ ছিল।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেরি। ‘অথচ দেখুন… কপাল খারাপ হলে যা হয় আর কী… দোকানটা যে বন্ধ ছিল, সেটা খেয়ালই করেনি টিমোথি বা জেরেমি। ‘ক্লোজড’ লেখা ছোট্ট একটা সাইনবোর্ডও ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল দরজায়, সেটাও চোখে পড়েনি ওদের কারও।’
‘তারপর কী হলো?’
‘পুলিশ এল। একটা অ্যাম্বুলেন্সও এল। আমাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো… আমাদের তিনজনকেই। আমি বার বার জানতে চাইছিলাম, টিমোথি আর জেরেমির অবস্থা কী। কিন্তু জবাবটা দেয়া হচ্ছিল না আমাকে, কারণ আমি ওদের মা না। যা-হোক, একে-ওকে বলে জুডিথকে ফোন করানোর ব্যবস্থা করলাম। ফোন করা হলো অ্যালানকেও।
‘ডায়ানা ক্যুপারকে খুঁজে বের করতে কত সময় লেগেছিল পুলিশের?’
‘দুর্ঘটনার ঘণ্টা দুয়েক পর ওই মহিলার ছেলেই তাঁকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছিল পুলিশ স্টেশনে। যদি না-ও আনা হতো তাঁকে, পালিয়ে বাঁচতে পারতেন না তিনি। কারণ একজন প্রত্যক্ষদর্শী দেখে ফেলেছিল তাঁর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর। সে-নম্বর যদি জানিয়ে দেয়া হতো পুলিশকে, গাড়িটা কার খুঁজে বের করতে সময় লাগত না।’
‘পুলিশ স্টেশনেই কি মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে দেখা হয় আপনার?’
‘না। যখন বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তখন দেখেছিলাম ওই মহিলাকে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে একটা কথাও বলিনি।’
‘এবং সেদিনের সেই বিচারকাজের পর আর কখনও মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে দেখাও হয়নি আপনার?’
‘না। কেন দেখা করবো? আমার জন্য তিনি ছিলেন এ-রকম একজন মানুষ, যার চেহারা কখনও দেখতে চাওয়ার ইচ্ছাও হতো না।’
