‘আগেও বলেছি, আবারও বলছি… না।’
ধীরে ধীরে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘কিন্তু দক্ষিণ কেনসিংটনে গিয়েছিলেন আপনি।’
‘কী বললেন? বুঝলাম না।
‘বললাম, সেদিন, মানে যেদিন খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিন দক্ষিণ কেনসিংটন স্টেশন থেকে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বের হতে দেখা গেছে আপনাকে।’
‘আপনি জানলেন কী করে?’
‘সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি, মিসেস গডউইন। কেন, কথাটা কি অস্বীকার করতে চান?’
‘অবশ্যই না। দক্ষিণ কেনসিংটন… আপনি কি বলতে চান, সেখানেই কোথাও থাকতেন মিসেস ক্যুপার?’
জবাব দিল না হোথর্ন, তাকিয়ে আছে মিসেস গডউইনের দিকে।
‘ডায়ানা ক্যুপার কোথায় থাকতেন, সে-ব্যাপারে কিছু জানা ছিল না আমার। আমার ধারণা ছিল, তিনি কেন্টেই থাকতেন। যা-হোক, কিংস রোডে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম। এই বাড়ি বিক্রি করিয়ে দেয়ার জন্য একজন দালাল ধরেছি; টুকটাক কয়েকটা জিনিসের একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছিল লোকটা আমার হাতে, বলেছিল সেগুলো কিনে আনলে নাকি এই বাড়ির চেহারা কিছুটা হলেও খুলবে। আর তাই কয়েকটা ফার্নিচারের-দোকানে গিয়েছিলাম।’
কথাটা কেন যেন বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হলো না আমার কাছে। ভগ্নপ্রায় অবস্থা হয়েছে এই বাড়ির, এবং জুডিথ গডউইনের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায় তাঁর কাছে বাড়তি কোনো টাকা নেই। সে-কারণেই বিক্রি করে দিতে চাইছেন তিনি এই বাড়ি। কয়েকটা আসবাব কিনে এনে যদি সাজিয়ে রাখেন, কী এমন চেহারা খুলবে বাড়িটার?
‘কখনও কিছু লিখে মিসেস ক্যুপারের কাছে পাঠিয়েছিলেন কি না আপনার স্বামী, সে-ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন তিনি আপনাকে?
‘কখনও কিছু লিখে… মানে, চিঠি অথবা ওই জাতীয় কোনো কিছুর কথা বলছেন? জানি না আসলে। কথাটা ওকেই জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়।’
‘জেরেমির কী অবস্থা?’
হোথর্নের মুখে ছেলের নাম উচ্চারিত হওয়ামাত্র শরীর শক্ত হয়ে গেল জুডিথ গডউইনের।
চটজলদি হোথর্ন বলল, ‘আপনি বলেছেন আপনার সঙ্গেই নাকি থাকে সে।’
‘হ্যাঁ।’
‘আচ্ছা, এ-রকম কি হতে পারে, জেরেমিই লেগেছিল মিসেস ক্যুপারের পেছনে?’
জবাব দেয়ার আগে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন জুডিথ। আমি ভাবলাম, রাগে বিস্ফোরিত হবেন তিনি, এই মুহূর্তে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলবেন আমাদেরকে। কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটল না। শান্ত গলায় তিনি বললেন, ‘মিস্টার হোথর্ন, জেরেমির বয়স যখন আট, তখন গুরুতর আঘাত পেয়েছিল সে, এবং সে-আঘাত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। মাথায় এত জোরে ব্যথা পেয়েছিল যে, ওর মস্তিষ্কের টেম্পোরাল আর অক্সিপিটাল লোব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওর স্মৃতিশক্তি, বাচনক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, এমনকী দৃষ্টিশক্তিও। এখন ওর বয়স আঠারো। কিন্তু আর কোনো দিন সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না। যত দিন যাচ্ছে, ওর সমস্যাগুলো আরও বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে আমার। ইদানীং শর্ট-টার্ম ওয়ার্কিং মেমোরি-লসে আক্রান্ত হচ্ছে সে। কোনো কিছুর উপর একটানা মনোযোগ ধরেও রাখতে পারছে না। সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দরকার আছে ওর।’
থামলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর আবার বলতে লাগলেন, ‘আমার কথার মানে এ- ই না, বাসা ছেড়ে কোথাও যায় না সে। বরং বাইরে বের হয়, কিন্তু কখনোই একা যায় না। কাজেই মিসেস ক্যুপারের পেছনে লাগা বলতে আপনি যা বোঝাতে চাইছেন, সেটা একইসঙ্গে হাস্যকর, অসম্ভব এবং আপত্তিজনক।’
‘বুঝতে পারছি। কিন্তু… বললে বিশ্বাস করবেন কি না জানি না… খুন হওয়ার কিছুক্ষণ আগে নিজের ছেলের কাছে অদ্ভুত একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। আমার বুঝতে যদি ভুল হয়ে না-থাকে, ওই মেসেজে মিসেস ক্যুপার বলেছিলেন, আপনার ছেলেকে নাকি দেখেছেন তিনি।
‘সেক্ষেত্রে… কিছু মনে করবেন না, সরাসরিই বলছি… বুঝতে ভুল হয়েছে আপনার।’
‘সেজন্যই বলেছি, মিসেস ক্যুপারের মেসেজটা অদ্ভুত। তিনি কিন্তু বিশেষ কোনো একজনের কথা নির্দিষ্ট করে বলেছেন তাঁর সেই মেসেজে। যা-হোক, গত সপ্তাহের সোমবারে কোথায় ছিল জেরেমি, জানেন?’
‘অবশ্যই জানি। উপরতলায় ছিল… এখনও সেখানেই আছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর ছেড়ে বের হয় না। এবং আগেও বলেছি আবারও বলছি, একা কোথাও যায় না।’
দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম। যুবতী এক মেয়ে ঢুকল রান্নাঘরে। তার পরনে জিন্স আর ঢিলেঢালা জার্সি। দেখামাত্র চিনতে পারলাম মেয়েটাকে… কাউকে বলে দিতে হলো না… মেরি ও’ব্রায়ান। আয়া অথবা শিশুপালনকারিণী বলতে যা বোঝায়, ওই মেয়েকে দেখামাত্র সে-রকম মনে হয়। সে-রকম একটা ভাব ফুটে আছে তার নাদুসনুদুস চেহারায়। সেই সঙ্গে আছে গাম্ভীর্যের ছাপ। বুকের উপর ভাঁজ করে রেখেছে মোটা মোটা দুই হাত। খুব সম্ভব স্ট্রেইট করিয়ে রেখেছে কালো চুলগুলো। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। তার মানে, অনুমান করলাম, দুর্ঘটনাটা যখন ঘটেছিল, তখন তার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি ছিল।
‘দুঃখিত, জুডিথ,’ বলল সে, উচ্চারণে আইরিশ টান আছে, ‘আপনার সঙ্গে যে অতিথি আছে, জানা ছিল না আমার।’
‘সমস্যা নেই, মেরি। পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি মিস্টার হোথর্ন, আর…’
‘অ্যান্টনি,’ বললাম আমি।
‘ডায়ানা ক্যুপারের ব্যাপারে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন তাঁরা।’
