‘সে-ই কি দেখভাল করে জেরেমির?’
‘হ্যাঁ। আসলে… দোষ না-করেও দায় এড়াতে পারেনি বেচারী। জেরেমি যখন শেষপর্যন্ত ছাড়া পেল হাসপাতাল থেকে, মেরি টের পেল, জেরেমিকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে না সে। আর তাই…।’ কথা শেষ না-করে থেমে গেলেন জুডিথ। বোঝা গেল, দুঃসহ স্মৃতি রোমন্থন করতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। ‘ওরা তিনজন তখন ছিল সাগরসৈকতে। প্যাডলিং করছিল। দিনটা ছিল চমৎকার, কিন্তু সাঁতার কাটার মতো গরম পড়েনি। সৈকতের পাশেই ছিল রাস্তা। আরেকধারে ছিল সী-ওয়াল আর প্রোমেনাড। হঠাৎই আমার দুই ছেলে একটা আইসক্রিম-শপ দেখতে পায়। মেরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেদিকে ছুট লাগায় ওরা। চিৎকার করে ওঠে মেরি, থামতে বলে ওদেরকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমার ছেলে দুটো হঠাৎ ও-রকম কাজ করতে গেল কেন, তখনও বুঝতে পারিনি আমি, আজও পারি না। ওদের বয়স তখন ছিল মাত্র আট বছর, তারপরও অবুঝ বলতে যা বোঝায়, সে-রকম ছিল না।
‘যা-হোক, ওরা যেভাবেই ছুট লাগিয়ে থাকুক না কেন, মিসেস ক্যুপারের উচিত ছিল সময়মতো ব্রেক কষা। যথেষ্ট সময় ছিল তাঁর হাতে। কিন্তু…। আমরা পরে জানতে পারি, চশমা ছাড়া তিনি রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখতে পান না। কাজেই ওই অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে মোটেও উচিত কাজ করেননি। তাঁর সেই বেপয়োরা আচরণের কারণেই সেদিন ঘটনাস্থলে মারা পড়ে টিমি। আর জেরেমি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে স্রেফ উড়াল দিয়েছিল। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিল, কিন্তু কপালগুণে বেঁচে গেছে।’
‘মেরি ব্যথা পায়নি?’
‘না। ওর কপালও আসলে ভালো। ছেলে দুটোকে ধরার জন্য সামনের দিকে দৌড় দিয়েছিল সে। মিসেস ক্যুপারের গাড়িটা কয়েক ইঞ্চির জন্য মিস করেছে ওকে। …মিস্টার হোথর্ন, আদালতে যখন বিচারকাজ চলছিল, তখন এসব ব্যাপারে কথা হয়েছে। যা-হোক, আমার কথা হচ্ছে, মিসেস ক্যুপার কোন্ জাতের মহিলা? দু’-দুটো বাচ্চা ছেলেকে গাড়িচাপা দিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখলেন, তারপরও ফিরে গেলেন বাসায়? অথচ পুলিশের কাছে বললেন, তিনি নাকি আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলেন!’
‘নিজের ছেলের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।’
‘ঠিক। ড্যামিয়েন ক্যুপার। আজ সে একজন নামকরা অভিনেতা। দুর্ঘটনাটার সময় মায়ের সঙ্গে থাকত। অনেকেই তখন বলাবলি করছিল, মিসেস ক্যুপার নাকি তাঁর ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন… তিনি নাকি চাননি, তাঁর ছেলের নাম প্রেসে যাক। কথাটা যদি সত্যি হয়, তা হলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, মা-ছেলে দু’জনই হাড়ে হাড়ে শয়তান। যা-হোক, সেদিনই পুলিশের কাছে হাজির হয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, কিন্তু আমি বলবো, যেহেতু ওই কাজ না-করে কোনো উপায় ছিল না তাঁর সেহেতু করেছেন কাজটা। দুর্ঘটনাটা ঘটতে দেখেছে অনেকেই। ওই গাড়ির নম্বরপ্লেটও দেখতে পেয়েছিল। আরেকটা কথা। আমার দুই ছেলেকে গাড়িচাপা দিয়ে মিসেস ক্যুপার যে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, রায় ঘোষণার সময় সেটা মনে রাখা উচিত ছিল জাজের। কিন্তু… বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন মিসেস ক্যুপার।’
বিস্কিটের প্লেটটা তুলে নিলেন মিসেস গডউইন, সাধলেন আমাকে।
‘না, ধন্যবাদ,’ বললাম আমি। এ-রকম একটা কথোপকথনের সময় ঘরোয়া এই আয়োজন করলেন কী করে তিনি, ভেবে আশ্চর্য লাগছে।
হোথর্ন বলল, ‘বুঝতে পারছি এসব কথা বেদনাদায়ক হয়ে যাচ্ছে আপনার জন্য, তারপরও… আপনার সঙ্গে আপনার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হলো কবে?’
‘লম্বা কাহিনি। দুর্ঘটনাটার পর আমি আর অ্যালান দুষছিলাম একজন আরেকজনকে… কেন ওই সৈকতে যেতে দিয়েছিলাম আমাদের ছেলে দুটোকে, কেন সেখানে ছিলাম না আমরা ইত্যাদি ইত্যাদি। অ্যালান তখন ব্যবসার একটা কাজে ম্যানচেস্টারে ছিল… আগেও বলেছি বোধহয়। যা-হোক, ওই দুর্ঘটনাই ফাটল ধরাল আমাদের দু’জনের সম্পর্কে। যে-সত্যের মুখোমুখি হতে চাইনি কখনও, সেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হলো আমাদের দু’জনকে। শেষপর্যন্ত… এই তো… কয়েক মাস আগে চলে গেল অ্যালান। আমাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে… এটা বলাটা বোধহয় উচিত হবে না। বরং আমি বলবো, একসঙ্গে থাকাটা আর সহ্য করতে পারছিলাম না আমরা।’
‘তাঁর দেখা পেতে পারি কী করে, বলতে পারেন? তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো হতো।’
এক তা কাগজে কিছু-একটা লিখে সেটা হোথর্নের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন মিসেস গডউইন। ‘ওর মোবাইল নম্বর। চাইলে ফোন করতে পারেন ওকে। ভিক্টোরিয়ার একটা ফ্ল্যাটে থাকে সে। থামলেন তিনি, কিছু-একটা বলি-বলি করেও বোধহয় বলতে পারছেন না। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। ‘অ্যালানের ব্যবসা খুব-একটা ভালো যাচ্ছে না ইদানীং। এই বাড়ি আর রাখা সম্ভব হচ্ছিল না আমাদের পক্ষে। আমরা এই বাড়ি বিক্রি করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম। তারপরও এখানে আছি… শুধু জেরেমির কারণে।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘আপনি বললেন, ডায়ানা ক্যুপারের সঙ্গে নাকি দেখা করেননি। আপনার স্বামী দেখা করেছিলেন কি না ওই মহিলার সঙ্গে, জানেন?’
‘এই ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেনি সে। দেখা করার মতো কোনো কারণ ছিল কি না, তা-ও জানি না।’
‘আচ্ছা, যেদিন মারা গেলেন মিসেস ক্যুপার, মানে গত সপ্তাহের সোমবার, সেদিন কি তাঁর বাড়ির কাছাকাছি কোথাও গিয়েছিলেন?’
