‘ডায়ানা ক্যুপারের ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান আপনারা।
‘হ্যাঁ,’ বলল হোথর্ন। ‘পুলিশের সঙ্গে নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে কথা হয়ে গেছে আপনার?’
‘হয়েছে। তবে বেশিক্ষণ না।’ এগিয়ে গিয়ে ফ্রিজ খুললেন জুডিথ, দুধের একটা প্লাস্টিক-কার্টন বের করলেন। শুঁকলেন ওটা, তারপর রেখে দিলেন কাউন্টারের উপর। ‘আমাকে ফোন করেছিল ওরা। জানতে চেয়েছিল, মিসেস ক্যুপারকে দেখেছি কি না।’
‘দেখেছিলেন?’
ঘুরে তাকালেন জুডিথ, কেমন বেপরোয়া একটা দৃষ্টি দেখা দিয়েছে চোখে। ‘গত দশ বছরের মধ্যে ওই মহিলার সঙ্গে একবারের জন্যও দেখা হয়নি আমার।’ ঘুরলেন আবারও। একটা প্লেটে কিছু বিস্কিট সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ‘আর… ওই মহিলার সঙ্গে আমার দেখা করার দরকারটাই বা কী? তাঁর কাছে যাওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই আমার।’
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘মিসেস ক্যুপারের মৃত্যুতে খুশি হয়েছেন আপনি… এ-রকম ভাবতে চাই না আমি।’
কাজ করতে করতে থেমে গেল জুডিথের হাত। ‘মিস্টার হোথর্ন, কী যেন বলেছিলেন… কী পরিচয় যেন দিয়েছিলেন আপনি নিজের?’
‘বলেছিলাম, এই কেসে পুলিশকে সাহায্য করছি। তারাই খবর দিয়েছে আমাকে।
‘তার মানে আপনি একজন প্রাইভেট ডিটেক্টিভ?’
‘আমি একজন পরামর্শদাতা।
‘আর আপনার বন্ধু?’
‘আমরা একসঙ্গে কাজ করছি,’ বললাম আমি।
‘মিস্টার হোথর্ন, আপনি কি বলতে চান আমি খুন করেছি মিসেস ক্যুপারকে?’
‘না, সে-রকম কিছু তো বলিনি।
‘কিন্তু আপনার কথার মানে তো সেটাই, নাকি? আপনি জানতে চেয়েছেন, মিসেস ক্যুপারকে দেখেছি কি না। জানতে চেয়েছেন, তাঁর মৃত্যুতে খুশি হয়েছি কি না।’ পানি ফুটছে কেতলিতে, আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে ওটা চুলা থেকে নামালেন জুডিথ। ‘সত্যি বলতে কী, ওই মহিলার মৃত্যুতে খুশি হয়েছি আমি। আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন তিনি। ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আমার পরিবারের জীবন। ড্রাইভিং করা উচিত ছিল না তাঁর, অথচ সেটাই করছিলেন সেদিন, এবং সে-কাজ করতে গিয়ে মেরে ফেলেছেন আমার একটা ছেলেকে। আমার জীবন থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মিস্টার হোথর্ন, আমি একজন খ্রিস্টান। নিয়মিত গির্জায় যাই। ওই মহিলাকে ক্ষমা করে দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু যদি বলি তাঁর খুন হওয়ার খবরটা শোনার পর খুশি হইনি, তা হলে মিথ্যা বলা হবে। শত্রুর মৃত্যুর খবরেও খুশি হওয়াটা পাপ… অনুচিত; তারপরও বলবো, যে বা যারাই খুন করে থাকুক না কেন মিসেস ক্যুপারকে, উচিত কাজটাই করেছে। ও-রকম কোনো কাজেরই উপযুক্ত ছিলেন তিনি আসলে।
নীরবতা।
চুপ করে আছি আমরা।
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, কফি বানাচ্ছেন জুডিথ। বলতে গেলে থাবা চালিয়ে তুলে নিলেন পারকোলেটরটা। একই কায়দায় তুলে নিলেন কয়েকটা মগ আর দুধের জগ। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে রেগে গেছেন। ট্রে-টা নিয়ে এসে বসে পড়লেন আমাদের মুখোমুখি। দাবি জানানোর কায়দায় বললেন, ‘আর কী জানতে চাইছেন আপনারা?’
‘আপনি আমাদেরকে যা-যা বলতে পারেন তার সব,’ বলল হোথর্ন। ‘দুর্ঘটনার কাহিনি দিয়েই শুরু করুন না?’
‘দুর্ঘটনা?’ তিতা আর সংক্ষিপ্ত হাসি হাসলেন জুডিথ। ‘ঠিকই বলেছেন আসলে… দুর্ঘটনা। ওই শব্দ ছাড়া আর কী ব্যবহৃত হতে পারে বিশেষ সে-ঘটনার জন্য? আমি তখন ওই শহরেই ছিলাম। ফোন করা হলো আমাকে, বলা হলো, ‘কিছু মনে করবেন না… খারাপ একটা খবর আছে আপনার জন্য… একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।’ ভেবেছিলাম, তেমন গুরুতর কিছু না। কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি, আমার টিমি ততক্ষণে লাশ হয়ে শুয়ে আছে মর্গে। কল্পনা করতে পারিনি, আমার অন্য ছেলেটা আর কোনো দিন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না।’
‘ওদের সঙ্গে ছিলেন না কেন আপনি?’
‘একটা কন্সফারেন্সে ছিলাম আমি তখন। ওই সময় ‘শেল্টার’ নামের একটা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছিলাম। ওয়েস্টমিনিস্টারে দু’দিন ব্যাপী একটা ইভেন্ট চলছিল আমাদের। আর আমার স্বামী তখন একটা ব্যবসার কাজে গিয়েছিল ম্যানচেস্টারে।’ একটুখানি থামলেন জুডিথ। ‘আমরা এখন আর একসঙ্গে থাকি না। এবং সেটার জন্যও ওই দুর্ঘটনাকে দায়ী করতে পারেন।’ আবারও কিছুক্ষণের নীরবতা। ‘আমাদের দুই ছেলের স্কুলের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা তখন শেষ। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ওদেরকে ওদের আয়ার সঙ্গে কোথাও ঘুরতে পাঠাবো। ডিলের সাগরসৈকতে নিয়ে গেল সে ওই দু’জনকে। যে-হোটেলে উঠেছিল ওরা, সেখানে স্পেশাল একটা অফার চলছিল তখন। আর সে-কারণেই ওই হোটেল বেছে নেয়া হয়েছিল। খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল আমার দুই ছেলে। চোখের সামনে দুর্গ দেখতে পাচ্ছিল ওরা, সৈকতে খেলতে পারছিল, ইচ্ছা হলে চুঁ-ও মেরে আসতে পারছিল র্যাসগেটের টানেলগুলো থেকে। টিমির কল্পনাশক্তি ছিল দারুণ। জীবনের সব কিছুই ছিল ওর কাছে অ্যাডভেঞ্চার।’
আলাদা তিনটা কাপে কফি ঢাললেন তিনি। প্রয়োজনমতো দুধ আর চিনি মেশানোর দায়িত্বটা ছেড়ে দিলেন আমাদের উপর।
বলতে লাগলেন, ‘মেরি… মানে, সেই আয়ার কথা বলছি… এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখভাল করছিল আমার দুই ছেলের। কাজেকর্মে বেশ ভালো ছিল সে। ওকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতাম। দুর্ঘটনাটার কারণ জানার চেষ্টা করেছি আমরা বার বার, কিন্তু একবারের জন্যও ভাবিনি, দোষ মেরির। পুলিশ আর সাক্ষীরা সবাই একই কথা বলেছে। যা-হোক, মেরি এখনও আছে আমাদের সঙ্গে।’
