আরও একবার টের পেলাম, কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আমার ভিতরে। ‘কে ওই মহিলা?’
‘এই মুহূর্তে তাঁর নামটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তবে কথা হচ্ছে, তিনি ধনী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর একটা ছেলে আছে, সে-লোক আবার নিজনামে পরিচিত। আরেকটা কথা। যতদূর জানতে পেরেছি, এই পৃথিবীতে শত্রু বলে কেউ ছিল না ওই মহিলার। যে-ক’জনের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ, সবাই পছন্দ করত তাঁকে। কেসটা জটিল, আর সে কারণেই তলব করা হয়েছে আমাকে।’
লোভ জাগল আমার মনে।
একটা হত্যারহস্য নিয়ে যদি কোনো কাহিনি লিখতে হয়, তা হলে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে প্লট দাঁড় করানো। যে-সময়ের কথা বলছি, তখন আমার মাথায় ও-রকম কোনো প্লট নেই। কারণ টেলিভিশনের জন্য ধারাবাহিকভাবে নাটক লিখে- লিখে প্রায় সব রকমের প্লট ‘শেষ’ করে ফেলেছি আমি। টাকার জন্য কেউ কাউকে খুন করছে… লিখে ফেলেছি। অন্যের স্ত্রী বা চাকরি হাতিয়ে নিতে চায় কেউ… তা- ও লেখা হয়ে গেছে। কেউ কাউকে ভয় পাচ্ছে, আর সে-কারণে ঘটে গেছে একটা হত্যাকাণ্ড; সেটাও দেখে ফেলেছে আমার দর্শকরা। কেউ কারও গোপন কোনো কথা জেনে ফেলেছে, ফলে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে তাকে… এ-রকম কাহিনিও উপহার দিয়েছি আমার পাঠকদের। বদলা নেয়ার জন্য খুন করা, অথবা দুর্ঘটনাক্রমে খুন করে ফেলা… লিখেছি ওসব নিয়েও।
আরও কথা আছে। মৌলিক কোনো কাহিনির জন্য অপরিহার্য একটা শর্ত হচ্ছে রিসার্চ বা গবেষণা। আমি যদি কোনো হোটেলের বাবুর্চিকে খুনি বানাতে চাই, তা হলে আগে ওই হোটেলটা ভালোমতো দেখতে হবে আমাকে। তাদের ক্যাটারিং বিযনেসটা ভালোমতো বুঝতে হবে। উদ্ভাবন করতে হবে আরও বিশ কি ত্রিশটা চরিত্র। তারপর আমাকে বুঝতে হবে পুলিশি তদন্ত কীভাবে চলে–ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফরেনযিক সাইন্স, ডিএনএ… এবং এ-রকম আর যা-যা আছে তার সব। অর্থাৎ মৌলিক কোনো উপন্যাসের প্রথম শব্দটা লেখার আগে কয়েক মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে আমাকে। কিন্তু যে-সময়ের কথা বলছি, তখন অত উদ্যম ছিল না আমার ভিতরে…. টিভি সিরিয়ালের জন্য দিনের-পর-দিন পরিশ্রম করে আমি যারপরনাই ক্লান্ত। দ্য হাউস অভ সিল্ক শেষ করার পর হোমসকে নিয়ে নতুন কী লিখবো, তা-ও ছিল না আমার মাথায় তখন। হোমসকে নিয়ে নতুন কিছু লেখার মতো উদ্যম ছিল কি না আমার ভিতরে তখন, সন্দেহ ছিল তা নিয়েও।
অর্থাৎ সোজাসুজি যদি বলি, শর্টকাট একটা পদ্ধতির প্রস্তাব দিচ্ছে আমাকে হোথর্ন। পুরো খাবারটা প্লেটে তুলে দিয়ে পরিবেশন করছে সে আমাকে। তা ছাড়া একটা কথা ঠিকই বলেছে সে– অজ্ঞাতনামা সেই মহিলার কেসটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে আমার কাছে। কথা নেই বার্তা নেই, একটা ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে হাজির হলেন তিনি। উপন্যাসের শুরুটা যদি ওভাবেই করতে পারি… নাহ্, মন্দ হয় না তা হলে। বরং সত্যি বলতে কী, একেবারেই ব্যতিক্রমী কিছু-একটা দেয়া যায় পাঠকদের।
টের পেলাম, ওই উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার যেন চলে এসেছে আমার মাথায় ি বসন্তের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। শহরের একটা ঝকঝকে-তকতকে এলাকা। রাস্তা পার হলেন ওই মহিলা…
‘আপনি জানলেন কীভাবে?’ হুট করে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘কী?’
‘একটু আগে বললেন, আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বললেন, একটা কুকুরছানা পেয়েছি। এসব কথা আপনি জানলেন কী করে? কে বলেছে আপনাকে ওসব?’
‘কেউ বলেনি।’
‘তা হলে জানতে পারলেন কীভাবে?’
চোখমুখ কুঁচকে ফেলল হোথর্ন… জবাবটা যেন দিতে চাইছে না আমাকে। কিন্তু একইসঙ্গে বুঝতে পারছে, নিজের কাহিনি যদি আমাকে দিয়ে লেখাতে চায়, তা হলে আমার কথামতো কিছু-না-কিছু করতে হবে ওকে। বলল, ‘আপনার জুতোর তলায় বালি লেগে আছে। পায়ের উপর পা তুলে যখন বসলেন আপনি, তখন খেয়াল করলাম ব্যাপারটা। ঘটনাটার দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে। নির্মাণকাজ চলছে, এমন কোনো বিল্ডিঙের নিচ দিয়ে হেঁটে এসেছেন। অথবা কোনো গ্রামাঞ্চলে গিয়েছিলেন, কারণ লন্ডনের পথেঘাটে বালির অস্তিত্ব বলতে-গেলে নেই। এখানে যে-জায়গায় থাকেন, সেখান থেকে সোজা পথে এই রেস্টুরেন্টে আসতে নির্মাণাধীন কোনো বাড়ি আছে বলে মনে পড়ে না আমার। আর অনেক আগে একবার শুনেছিলাম, অরফোর্ডে আপনাদের যে-গ্রামের বাড়ি আছে, মাঝেমধ্যেই সেখানে যান। তাই দুইয়ে দুইয়ে যোগ করে অনুমান করে নিলাম, সেখানেই গিয়েছিলেন আপনি।’
মনে মনে হোথর্নের পর্যবেক্ষণশক্তির প্রশংসা না-করে পারলাম না। সে দেখছি শার্লক হোমসের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে শুরু করেছে!
বললাম, ‘আর কুকুরছানার ব্যাপারটা?’
‘খেয়াল করে দেখুন, আপনার জিন্সের হাঁটুর ঠিক নিচে কুকুরছানার থাবার দাগ লেগে আছে। তার মানে আপনাকে আদর করার জন্য, অথবা আপনার কাছ থেকে আদর পাওয়ার জন্য আপনার-গায়ে পা তুলে দিয়েছিল সেটা।’
তাকালাম আমার জিন্সের হাঁটুর দিকে। সত্যিই, কুকুরছানার থাবার অস্পষ্ট দাগ লেগে আছে সেখানে। দাগটা এত হালকা যে, আমি খেয়ালই করিনি। কিন্তু হোথর্ন ঠিকই খেয়াল করেছে।
একটা কথা মনে পড়ে গেল। ‘দাঁড়ান… দাঁড়ান… এক মিনিট! আপনি কী করে জানলেন ওটা কুকুরছানা? ওটা তো কোনো ছোট জাতের কুকুরও হতে পারে? তা ছাড়া… ওটা যে দেয়া হয়েছে আমাকে, মানে… রাস্তায় কোনো কুকুরের সঙ্গে যে মোলাকাত হয়নি আমার, নিশ্চিত হলেন কীভাবে?’
