‘ঠিক আছে!’ কণ্ঠ শুনে মনে হলো, আমার কথায় বিস্মিত হয়েছে হোথর্ন।
ওয়ালেট বের করল সে, তারপর সেটার ভিতর থেকে বের করল দশ পাউন্ডের একটা নোট। ওই নোট এত মলিন হয়ে গেছে যে, ওটা আসলেই দশ পাউন্ডের নোট কি না, সন্দেহ হলো আমার। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, হোথর্নের ওয়ালেটে আর কোনো টাকা নেই।
ভীষণ লজ্জিত হলাম মনে মনে। বুঝতে পারলাম, ছোটলোকের মতো একটা কাজ করে ফেলেছি। যা-হোক, এই ঘটনার পর যতবারই কোনো বিল চুকাতে হয়েছে আমাদেরকে, প্রতিবারই আমি করেছি কাজটা, হোথর্নকে একটা পয়সাও দিতে হয়নি। এবং সে-ব্যাপারে কখনও কোনো আপত্তি করিনি।
আমরা দু’জন একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম ক্যাফে থেকে। হ্যাঁরো অন দ্য হিল ভালোমতোই চেনা আছে আমার। ফয়েল’স ওয়ার-এর বেশ কিছু দৃশ্য এখানে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে। শুধু তা-ই না, আমার প্রথম বোর্ডিংস্কুলটাও ধারেকাছেই। আশপাশে তাকিয়ে একটু আশ্চর্যই হলাম। গত পঞ্চাশ বছরে বলতে- গেলে কোনো পরিবর্তনই হয়নি এই জায়গার।
তাকালাম হোথর্নের দিকে। ‘গতকাল রাতে কী করলেন?’
‘মানে?’
‘মানে গতকাল রাতে কী করেছেন আপনি সেটা জানতে চাইছি। ডিনার সারতে কোথাও গিয়েছিলেন? নাকি কাজ করেছেন এই কেস নিয়ে?’
কোনো জবাব দিল না হোথর্ন।
‘আপনার জবাবটা এই বইয়ে ব্যবহার করতে পারবো আমি।’
‘ডিনার করেছি। কিছু নোট লিখেছি। তারপর ঘুমিয়ে পড়েছি।’
কী খেয়েছিল সে? কার সঙ্গে বিছানায় গিয়েছিল? ঘুমিয়ে পড়ার আগে টিভি দেখেছিল? টিভি কি আদৌ আছে ওর বাসায়?
জানি, এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে একটারও উত্তর পাবো না। জিজ্ঞেস করার মতো সময়ও নেই আমার হাতে।
কারণ আমরা দু’জন হাজির হয়ে গেছি রক্সবরো অ্যাভিনিউ’র একটা ভিক্টোরিয়ান বাড়ির সামনে। বাড়িটা তিন তলা, গাঢ় লাল রঙের ইট দিয়ে বানানো। এ-রকম কোনো বাড়ি দেখতে পাওয়ামাত্র চার্লস ডিকেন্সের কথা মনে পড়ে যায় আমার।
মেইনরোড থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এই বাড়ি। নুড়িপাথরে ছাওয়া একটা রাস্তা এগিয়ে গেছে সেটার দিকে। একটা ডাবল গ্যারেজ আছে এককোনায়। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, খুবই জীর্ণশীর্ণ অবস্থা বাড়িটার। বাগানের কথা যদি বলি অথবা বাড়ির রঙের কথা… সব কিছুরই হতশ্রী অবস্থা। কয়েকটা জানালার গোবরাটে টবে চাষ করা হচ্ছে ফুলগাছ, কিন্তু সবগুলো ফুলই মরা। আলোর কোনো চিহ্নই নেই কোনো জানালায়।
গডউইন পরিবার এই বাড়িতেই থাকে। বলা ভালো, ওই পরিবারের যে- তিনজন সদস্য বেঁচে আছে, তাঁদের আবাসস্থল এই ভগ্নপ্রায় বাড়ি।
৮. ক্ষতিগ্রস্ত জিনিসপত্র
ঢুকে পড়লাম বাড়ির ভিতরে। হলটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। বাইরে যতটা ঠাণ্ডা, তার চেয়ে বেশি শীতলতা এই হলের ভিতরে। শুধু তা-ই না, পর্যাপ্ত আলোও নেই এখানে। মনে হলো, নতুন সাজসজ্জার ব্যাপারে যেন চিৎকার করে কাঁদছে এই জায়গা। পায়ের নিচে কার্পেটের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি, কিন্তু সেটা নিতান্তই মামুলি…. ছেঁড়াফাটা আর জায়গায় জায়গায় দাগেভরা; কোথাও আবার বিবর্ণ। বাতাসে কেমন একটা ছাতলা-পড়া গন্ধ।
আমাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলেন পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়সী এক মহিলা। একটু পর পর তাকাচ্ছেন আমাদের দিকে, তাঁর সে-দৃষ্টিতে সন্দেহ দেখতে পাচ্ছি। অনুমান করে নিলাম, তিনিই জুডিথ গডউইন। তাঁর মতো কোনো মহিলা যে কোনো দাঁতব্য-প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, তা আর আশ্চর্যের কী? একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম… বিয়োগান্ত যে-ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে, এত বছর পরও সেটা যেন ছেড়ে যায়নি তাঁকে।
জানতে চাইলেন, ‘আপনি হোথৰ্ন?’
‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল,’ বলল হোথর্ন, আবারও সেই তোষামোদের-মুখোশে আড়াল করেছে নিজের চেহারা। ‘আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য ধন্যবাদ।
‘রান্নাঘরে আসতে কোনো অসুবিধা নেই তো আপনাদের? কফিটা না-হয় সেখানেই পরিবেশন করতাম…’
আমি কে, তা বলল না হোথর্ন। জুডিথ গডউইনও মনে হয় আমার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন, কারণ আমার পরিচয় জানতে চাইলেন না।
তাঁর পিছন পিছন কিচেনে গিয়ে হাজির হলাম আমি আর হোথর্ন। রান্নাঘরটা সিঁড়ির অন্য পাশে। এখানে বেশ গরম। কোথাও কোনো বৈচিত্র্য নেই। কালের ছোবল দেখতে পাচ্ছি জায়গায় জায়গায়। একধারে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রিজটা। ওটা যখন কেনা হয়েছিল তখন দামি ছিল, কিন্তু এতদিনে জীর্ণ অবস্থা হয়েছে। চুম্বকের সাহায্যে কয়েকটা পোস্ট-ইট নোট আটকে দেয়া হয়েছে ওটার বড়িতে। কোনো কোনো নোটে লেখা আছে রেসিপি, কোনোটাতে আবার টেলিফোন নম্বর। আবার কোনো নোটে দেখতে পাচ্ছি জরুরি ঠিকানা। ওভেনটা কেমন তেল চিটচিটে। বহুল ব্যবহারের কারণে পুরনো হয়ে গেছে ডিশওয়াশারটা। আরেকধারে দেখা যাচ্ছে একটা ওয়াশিং মেশিন। চলছে ওটা, নোংরা পানি ছিটকে ছিটকে এসে ঘোলা করে দিচ্ছে ওটার জানালা। এমনিতে রান্নাঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নই, তারপরও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই ঘরের পিছনে আরও কিছু টাকা বিনিয়োগ করা দরকার এ-বাড়ির বাসিন্দাদের। ওয়াইমেরানার জাতের একটা ঘেয়ো কুকুর আধবোজা চোখে শুয়ে ছিল এককোনায়, আমাদেরকে ঢুকতে দেখে লেজ নাড়তে লাগল।
পাইন কাঠে বানানো বড় একটা টেবিল আছে কিচেনে, সেটার একধারে দুটো চেয়ারে বসে পড়লাম আমি আর হোথর্ন। সিঙ্ক থেকে একটা পারকোলেটর তুলে নিলেন জুডিথ গডউইন, কলের পানিতে ধুলেন সেটা। তারপর ওটাতে কফি চাপিয়ে দিলেন চুলায়। কাজ করতে করতে কথা বলতে লাগলেন আমাদের সঙ্গে।
