এগুলো না-হয় বাদ দিলাম। আসল কথা হচ্ছে, গডউইন পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য ভিতরে ভিতরে কৌতূহলী হয়ে উঠেছি। বিশেষ করে জেরেমি গডউইনকে দেখতে ইচ্ছা করছে খুব। মনে পড়ে যাচ্ছে মিসেস ক্যুপারের সেই টেক্সট মেসেজ…
যে-ছেলেটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল…
আমি যদি এখন কাজ না-করি হোথর্নের সঙ্গে, তা হলে হয়তো অন্য কাউকে জুটিয়ে নেবে সে। হয়তো ওরা দু’জনে মিলে সমাধান করে ফেলবে এই রহস্যের, আর সেটা খবরের কাগজে পড়তে হবে আমাকে। এবং ব্যাপারটা মোটেও সুখকর হবে না আমার জন্য।
টের পেলাম, এই রহস্যের যখন সমাধান করা হবে, তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে চাই আমি।
ফোনটা এখনও আমার হাতে। আগামীকাল সকাল ন’টা ত্রিশ মিনিট। হ্যাঁরো অন দ্য হিল।
ফিরতি মেসেজ পাঠিয়ে দিলাম হোথর্নকে:
দেখা হবে।
তারপর গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ইউনিকো ক্যাফেটা হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিল স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে, জীর্ণশীর্ণ একসারি দোকানের শেষপ্রান্তে, রেললাইনের কাছে অবস্থিত। সময়মতো সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখি, ইতোমধ্যেই ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিয়ে ফেলেছে হোথর্ন: ডিম, বেকন, টোস্ট আর চা। এই প্রথমবার স্বাভাবিক খাবারের অর্ডার দিতে দেখলাম ওকে।
খাবার যখন হাজির হলো, ক্লান্ত ভঙ্গিতে খেতে শুরু করল সে… ভাবখানা এমন, কী খাচ্ছে, সে-ব্যাপারে যেন সন্দেহ আছে ওর মনে। দেখে মনে হচ্ছে না, খেয়ে কোনো মজা পাচ্ছে। আমি ওর মুখোমুখি বসেছি বেশ কিছুক্ষণ, কিন্তু এই সময়ে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকি হেসেছে একবার, কিছু বলেনি। ওর মনের ভিতরে কী চলছে আসলে, বুঝতে পারলাম না।
নিজের জন্য ব্রেকফাস্টের অর্ডার করলাম আমি: একটা বেকন স্যান্ডউইচ।
কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন।
‘ভালো।’
উৎসাহের ছিটেফোঁটাও নেই আমার কণ্ঠে। কিন্তু সেটা হোথর্ন টের পেল কি না, বুঝলাম না।
বলল, ‘গডউইন পরিবারের ব্যাপারে কিছু হোমওয়ার্ক সেরে নিয়েছি।’
খেতে খেতে কথা বলছে সে। খেয়াল করলাম, ওর পাশে একটা নোটপ্যাড রাখা আছে।
‘পরিবারের কর্তাব্যক্তির নাম অ্যালান গডউইন। নিজের একটা ব্যবসা আছে তাঁর… ইভেন্ট অরগানাইযার। তাঁর স্ত্রীর নাম জুডিথ গডউইন। বাচ্চাদের একটা দাঁতব্য-প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করেন। দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ছেলেটা ছাড়া আর কোনো সন্তান নেই ওই দম্পতির। ওই ছেলের নাম জেরেমি গডউইন, বয়স এখন আঠারো। ওর ব্রেইন ড্যামেজ্ড্। ডাক্তারদের কথা হচ্ছে, সার্বক্ষণিক সেবা-শুশ্রূষার দরকার আছে ছেলেটার।’ একটুখানি চা খেল হোথর্ন। ‘এখন কথা হচ্ছে, ডায়ানা ক্যুপারের যদি কোনো ভুল হয়ে না-থাকে, তা হলে এ-রকম হওয়াটা কিন্তু অসম্ভব না, ওই ছেলে হয়তো বিছানা অথবা তার হুইলচেয়ার থেকে নেমেছিল… যেদিন খুন হয়েছেন মিসেস ক্যুপার সেদিন হয়তো ব্রিটানিয়া রোড ধরে হেঁটে-চলে বেড়িয়েছিল।’
হাজির হয়ে গেল আমার বেকন স্যান্ডউইচ।
নোটপ্যাডের কয়েকটা পাতা উল্টাল হোথর্ন। পরিষ্কার হস্তাক্ষরে গুছিয়ে নোট লিখেছে সে। কিন্তু এত ছোট অক্ষরে লিখেছে যে, দূর থেকে চশমা ছাড়া পড়তে পারছি না।
‘বিশেষ ওই দুর্ঘটনার একটা সারসংক্ষেপ তৈরি করেছি,’ বলল সে। ‘যদি শুনতে কোনো অসুবিধা না-থাকে আপনার… মানে, আট বছরের একটা বাচ্চা গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে…
‘অসুবিধা নেই আমার
‘ডিলের রয়্যাল হোটেলে উঠেছিল ওই দুই ভাই আর তাদের আয়া… মেরি ও’ব্রায়ান। সেদিন সারাটা সকাল সৈকতে ছিল তারা তিনজন, তারপর ফিরে যাচ্ছিল হোটেলে। পথে এক আইসক্রিমের দোকান দেখতে পেয়ে সেদিকে ছুটে যায় দুই ভাই। মেরি পরে পুলিশের কাছে শপথ করে বলেছে, রাস্তাটা নাকি ফাঁকাই ছিল। কিন্তু ভুল প্রমাণিত হয়েছে কথাটা। অর্ধেকটা রাস্তা পার হয়েছে কি হয়নি দুই ভাই, একটা মোড় ঘুরে হাজির হয়ে যায় মিসেস ক্যুপারের গাড়ি, চাপা দেয় ওই দু’জনকে। মেরি বেঁচে যায় অল্প কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকার কারণে। মারা পড়ে এক ভাই, আরেকজন গুরুতর আহত হয়। ওদিকে মিসেস ক্যুপার গাড়ির গতি না- কমিয়ে বলতে-গেলে পালিয়ে যান। রাস্তার দু’পাশে অনেক লোক ছিল তখন, তাদের অনেকে চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে ঘটনাটা। এবং ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশের কাছে যদি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না-দিতেন মিসেস ক্যুপার, তা হলে তাঁর অবস্থা হয়তো খারাপ হতো।’
‘জাজ ওয়েস্টনের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল তাঁর।’
‘বলা ভালো, এমন কাউকে ভালোমতো চিনতেন তিনি, যে-লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল জাজ ওয়েস্টনের।
‘একই কথা।’
‘না, এক না। বিচারকেরা অনেককেই চেনেন। কিন্তু তার মানে এ-ই না, যাদেরকেই চেনেন তাঁরা, তাদের ব্যাপারেই পক্ষপাতিত্ব করেন।’
আর কোনো কথা হলো না। নিঃশব্দে ব্রেকফাস্ট শেষ করলাম আমরা। ওয়েইট্রেস বিল নিয়ে এল। সেটার দিকে তাকালও না হোথর্ন। সে আশা করছে, বিলটা আমি দিয়ে দেবো।
কিন্তু এবার একটু শক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বললাম, ‘খেয়াল করেছি, এখন পর্যন্ত যতবার কফি আর ট্যাক্সির বিল চুকাতে হয়েছে আমাদেরকে, প্রতিবারই কাজটা করেছি আমি। অথচ আধাআধি বখরার কথা ছিল আমাদের মধ্যে। যদি তা- ই হবে, তা হলে খরচও আধাআধি ভাগ করে নেয়া উচিত।’
