‘মিস্টার ওয়েস্টন কি বিবাহিত?’
‘জানি না। …কেন জানতে চাইছেন?’
‘এমনি।’
আর তেমন কোনো কথা হলো না। মিস্টার কুন্সকে বিদায় জানিয়ে নিচে নেমে এলাম আমরা।
রাস্তায় বের হয়েই একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ঘন ঘন টান দিচ্ছে, ঘন ঘন ধোঁয়া ছাড়ছে। আমার দিকে তাকাচ্ছে না।
‘ঘটনা কী?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জবাব দিল না হোথর্ন।
‘হোথৰ্ন?’
এবার আমার দিকে তাকাল সে। ‘মিস্টার ক্লন্স আর সেই জাজ মিলে মুক্ত করেনি তো জালে-আটকা-পড়া মিসেস ক্যুপারকে?
কথাটা ভাবছিলাম আমিও। ‘সেজন্যই কি জিজ্ঞেস করেছিলেন জাজ ওয়েস্টন বিবাহিত কি না?’
‘কথাটা জানতে চেয়েছিলাম, কারণ আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, জাজ ওয়েস্টন সমকামী। মিস্টার কুন্সও তা-ই হয়ে থাকতে পারেন। তিনিও বিয়ে-থা করেননি।’
একটুখানি থমকে গেলাম। কিছুক্ষণ পর মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘হুঁ। এখন তা হলে বাসায় ফিরে যাই আমি, নাকি? আগামীকাল ফোন করবো আপনাকে।’
হাঁটা ধরলাম আমি। কিছুদূর এসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।
যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে হোথর্ন। তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
পরিত্যক্ত কোনো বাচ্চার মতো মনে হচ্ছে ওকে।
৭. হ্যারো-অন-দ্য-হিল
সেদিন রাতে আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম ন্যাশনাল থিয়েটারে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নাটকটা দেখলাম, কিন্তু সত্যি বলতে কী উপভোগ করতে পারলাম না। সাড়ে এগারোটার দিকে ফিরে এলাম বাসায়। আমার স্ত্রী সোজা গিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়, কিন্তু আমার কেন যেন ঘুম আসছে না। জেগে থাকলাম অনেক রাত পর্যন্ত। হোথর্নকে নিয়ে যে-বই লিখছি, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। এ-ব্যাপারে অবশ্য এখনও কিছু বলিনি আমার স্ত্রীকে।
খুনের কোনো সত্যি কাহিনি নিয়ে যদি কিছু লিখতে চাইতাম, সেটার প্রধান চরিত্র হিসেবে বেছে নিতাম না হোথর্নের মতো কাউকে। ওর মতো শ্বেতাঙ্গ, মাঝবয়সী আর বদমেজাজী গোয়েন্দা আরও অনেক আছে। তবে এই ব্যাপারে, কোনো সন্দেহ নেই, লোকটা চতুর। আন্দ্রিয়া কুভানেক যে টাকা চুরি করেছে, সেটা অনুমান করে ফেলেছে সে। মিসেস ক্যুপারের বিড়ালের ব্যাপারটাও কীভাবে যেন চলে এসেছে ওর মাথায়। তারপরও, মুশকিল হচ্ছে, এখনও ওকে ঠিক পছন্দ করতে পারছি না। আর এ-রকম একটা অবস্থায় ওকে নিয়ে কিছু লেখাটাও কষ্টকর। বললে কেউ বুঝবে কি না জানি না… উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের সঙ্গে সেটার লেখকের সম্পর্ক কিন্তু সম্পূর্ণ অন্যরকম। উদাহরণ হিসেবে অ্যালেক্স রাইডারের কথাই বলি। গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই ছেলেকে নিয়ে একের-পর-এক কাহিনি লিখছি। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, ওর ব্যাপারে কখনও কখনও পরশ্রীকাতরতায় ভুগেছি; তারপরও পছন্দ করেছি ওকে। ওর নতুন নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথা পাঠককে জানানোর জন্য আমার লেখার-টেবিলে ফিরে যাওয়ার তাগাদা অনুভব করেছি বার বার। সে সিগারেট খায় না। গালি দেয় না। পিস্তল বা বন্দুক কিছুই নেই ওর। তারপরও কমপক্ষে একডজন কেসে পৃথিবীটাকে উদ্ধার করেছে ধ্বংসের হাত থেকে। সবচেয়ে বড় কথা, সে হোমোফোবিক না… মানে, যারা সমকামী, তাদের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই ওর
আচ্ছা, রেমন্ড ক্লন্স অথবা জাজ ওয়েস্টন সমকামী কি না, সে-কথা আমাকে অত অকপটে বলল কেন হোথর্ন? আর কোনো কিছু তো অত খোলামেলা বলে না সে?
কেমন হতাশ লাগছে। বসে আছি নিজের অফিসে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে। ক্রসরেইলের নির্মাণকাজ চলছে ফ্যারিংডনে, বেশ কিছু লাল লাইট জ্বলছে সেখানে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি সে-দৃশ্য। মনে মনে জিজ্ঞেস করছি নিজেকে, হোথর্নের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চাই কি না।
রাত বারোটা বেজে গেছে আরও আগেই। ক্লান্তি বোধ করছি। রেবেকা ওয়েস্টের দ্য মিনিং অভ ট্রিন পড়ছিলাম, ওটা খোলা অবস্থায় উপুড় করে রাখা আছে আমার কম্পিউটারের পাশে। হাত বাড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিলাম বইটা। ঘুম যখন আসছেই না, এই বইয়ে মনোনিবেশ করা যাক আবার। ১৯৪০-এর দশকে ফিরে যাওয়াটাই বোধহয় ভালো হবে আমার জন্য।
ঠিক তখনই টুং করে একটা আওয়াজ হলো আমার মোবাইলে। তাকালাম স্ক্রীনের দিকে।
একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছে হোথর্ন।
ইউনিকো ক্যাফে
হ্যারো অন দ্য হিল
সকাল ৯:৩০
ব্রেকফাস্ট
হ্যারো অন দ্য হিল… মানে, গডউইন পরিবার যেখানে থাকে।
অর্থাৎ আগামীকাল সকালে সেখানে যেতে বলছে আমাকে হোথৰ্ন।
কী করবো? আবারও প্রশ্ন করলাম নিজেকে। যাবো?
ডায়ানা ক্যুপারকে কে খুন করেছে, সত্যিই জানতে চাই আমি। আসলে সত্যি কথাটা জানতে চাই। আমার ভালো লাগুক বা না-লাগুক, এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। ওই মহিলার লিভিংরুমে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, নিজের চোখে দেখেছি কীভাবে জীবনযাপন করতেন তিনি। কীভাবে মারা গেছেন, দেখেছি সেটাও। তাঁর কার্পেটের এককোনায় বিশেষ একটা দাগ দেখেছি। এবং, স্পষ্ট টের পাচ্ছি, তাঁর কাছে ওই হুমকি-চিঠি কে পাঠিয়েছিল, জানতে চাইছি। আরও জানতে চাইছি, ওই একই লোক তুলে নিয়ে গেছে কি না অথবা খুন করেছে কি না মহিলার বিড়ালটাকে।
হোথর্ন আমাকে বলেছে, মিসেস ক্যুপার নাকি জানতেন, তিনি মরতে চলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সম্ভব হলো ব্যাপারটা? আর যদি সম্ভব হয়েও থাকে, তা হলে পুলিশের কাছে গেলেন না কেন তিনি?
