‘শুনেছি আপনাদের দু’জনের মধ্যে নাকি পুরনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সে-সম্পর্কে বোধহয় ভাটা পড়েছিল, তা-ই না?’
‘ভাটা পড়েছিল!’ মনে হলো আশ্চর্য হয়েছেন কুন্স।
‘আপনার কোনো একটা নাটকে বিনিয়োগ করে নাকি টাকা খুইয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার?’
‘আপনি বোধহয় মরোক্কান নাইটসের কথা বলছেন। না, ভাটা পড়েনি আমাদের সম্পর্কে। তবে আশাহত হয়েছিল ডায়ানা। আশাহত হয়েছিলাম আমরা দু’জনই। ডায়ানার যত টাকা নষ্ট হয়েছিল ওই নাটকের পেছনে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা নষ্ট হয়েছে আমার। কিন্তু মন খারাপ করিনি আমি… ব্যবসার হিসেবটাই এ-রকম– কখনও লাভ, কখনও ক্ষতি। এবং ব্যাপারটা জানা ছিল ডায়ানার।’
‘মরোক্কান নাইটস নাটকটা কী নিয়ে?’
‘প্রেমকাহিনি। এখানে দুটো লোক আছে। একজন সৈন্য, আরেকজন সন্ত্রাসী ব্যবসাসফল একটা উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছিল নাটকটা, কিন্তু তারপরও কেন যেন দর্শকপ্রিয়তা পায়নি সেটা। হতে পারে মারামারির দৃশ্য একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল ওই নাটকে। …আপনারা কেউ দেখেছেন ওটা?’
‘না,’ বললাম আমি।
‘সমস্যা সেটাই। যাকেই জিজ্ঞেস করি, বলে, দেখিনি ওই নাটক।’
একটা ট্রে-তে তিন কাপ কফি নিয়ে ফিরে এল ব্রুস।
হোথর্ন বলল, ‘আপনি এমন কোনো নাটক কি কখনও বানিয়েছেন, যেটা ব্যবসাসফল হয়েছে?’
অপমানিত হলেন কুন্স। ‘আপনার চারপাশে একটু তাকিয়ে দেখুন, ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর। ব্যবসাসফল নাটক যদি একটাও বানাতে না-পারতাম, তা হলে এত কিছু যে জোগাড় করেছি, সেটা কীভাবে সম্ভব হতো?’
‘পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড খুইয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, তা-ই না?’
‘টাকাটা আপনার কাছে বড় একটা পরিমাণ হতে পারে, কিন্তু ডায়ানার জন্য তেমন কিছু ছিল না। যদি হতো, তা হলে নাটকের পেছনে টাকা-বিনিয়োগ করার কাজে এগিয়ে আসত না।’
‘সেদিন সকালে কোথায় গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, সে-ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছিলেন?’
‘সেদিন সকালে মানে লাঞ্চের আগে?’ চোখ পিটপিট করছেন কুন্স। ‘না।’
‘দক্ষিণ কেনসিংটনের একজন আন্ডারটেকারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন।’
ট্রে থেকে কফির একটা কাপ তুলে নিয়েছিলেন কুন্স, সেটা রেখে দিলেন আগের জায়গায়। ‘আসলেই? আশ্চর্য হলাম কথাটা শুনে।’
‘কেন, ক্যাফে মুরানোতে কথাটা আপনাকে বলেননি মিসেস ক্যুপার?
‘অবশ্যই না। যদি বলত, তা হলে আপনি বলার আগেই কথাটা বলতাম আমি আপনাকে। ওই কথা সহজে ভুলে যাওয়ার মতো না।’
‘আপনি বলেছেন, সেদিন লাঞ্চের সময় কেমন মনমরা মনে হচ্ছিল মিসেস ক্যুপারকে। ঠিক কী নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি, জানিয়েছিলেন?’
‘পোষা বিড়ালের কথাটা তো বলেছিই। আরেকটা কথা বলেছিল সে… টাকাপয়সা নিয়ে তখন আলোচনা শুরু হয়েছিল আমাদের মধ্যে… বলল, কেউ একজন কিছু-টাকা নিয়ে ঝামেলা করছে ওর সঙ্গে। ওই ঘটনার সঙ্গে একটা দুর্ঘটনার যোগসূত্র আছে… কেন্টে যখন থাকত সে…’
‘তখন একটা গাড়ি-দুর্ঘটনায় দুটো বাচ্চা ছেলেকে চাপা দিয়েছিলেন তিনি, ‘ ক্রুন্সের মুখের কথা কেড়ে নিল হোথর্ন।
মাথা ঝাঁকালেন কুন্স। কফির কাপটা তুলে নিলেন আবার, ছোট করে চুমুক দিলেন। ‘ঘটনাটা আজ থেকে বছর দশেক আগের। তখন ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছে ডায়ানার স্বামী, ফলে একা একা থাকতে হতো ওকে। লোকটা ডেন্টিস্ট ছিল। এমন কিছু ক্লায়েন্ট ছিল তার, যারা সেলিব্রেটি। তাদের বাসাটাও ছিল চমৎকার, সাগরপাড়ে। যে-দুর্ঘটনার কথা বললেন, সেটা যখন ঘটে, তখন ডায়ানার সঙ্গে থাকত ড্যামিয়েন। যা-হোক, আমি যতদূর জানি, দোষ ডায়ানার ছিল না। বাচ্চা দুটো হঠাৎই দৌড় দেয়… রাস্তার অপর পাশে আইসক্রিম বিক্রি করা হচ্ছিল, সেখানে যেতে চাইছিল তারা। সময়মতো ব্রেক কষতে পারেনি ডায়ানা। পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে জাজের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে কথা বলেছিলাম আমি। তিনি ও বলেছিলেন, ডায়ানাকে কোনোভাবেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। কারণ কেউ যদি ছুটে এসে হাজির হয় চলন্ত গাড়ির সামনে, তা হলে কী করার থাকতে পারে?’
‘টাকা নিয়ে কে ঝামেলা করছিল মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে, সে-ব্যাপারে কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন তিনি?’
‘হ্যাঁ, বলেছে। লোকটার নাম অ্যালান গডউইন… ওই দুই ছেলের বাবা। ইদানীং নাকি প্রায়ই দেখা করত লোকটা ডায়ানার সঙ্গে, এটা-সেটা বিভিন্ন কিছু চাইত ওর কাছে।’
‘কী চাইতেন?’
‘মূলত টাকা। ওই লোককে পাত্তা দিতে নিষেধ করেছিলাম আমি ডায়ানাকে। বলেছিলাম, ওই দুর্ঘটনা অনেক বছর আগের। এবং সে-ব্যাপারে কিছুই করার নেই ওর।’
‘মিসেস ক্যুপার কি কখনও কোনো চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন আপনার কাছে?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘চিঠি? মানে?’
‘মানে অ্যালান গডউইন কি কখনও কোনো চিঠি লিখেছিলেন মিসেস ক্যুপারকে?’
‘লিখেছিল নাকি?’ শূন্যতা দেখা দিয়েছে কুন্সের চেহারায়। ‘না, আমার তা মনে হয় না। ডায়ানা শুধু বলেছিল, ওর সঙ্গে ওই গডউইন লোকটা নিয়মিত দেখা করছে ইদানীং। বলেছিল, এই ব্যাপারে কী করা যায়, বুঝতে পারছিল না।’
‘আপনি বললেন, জাজের সঙ্গে নাকি কথা বলেছিলেন। কীভাবে সম্ভব হলো ব্যাপারটা?’
‘জাজ নাইজেল ওয়েস্টন আমার বন্ধু। শুধু তা-ই না, আমার কিছু নাটকে টাকাও বিনিয়োগ করেছিল।’
