ওই বিল্ডিং দেখতে নাটকের মঞ্চের মতো। লাল রঙের ইট দিয়ে বানানো হয়েছে সেটা। অবাস্তব কোনো দ্বিমাত্রিক ভাব যেন আছে ওই দালানের গঠনকাঠামোতে। সদর দরজাটা এত বেশি চোখে পড়ে যে, ওটাকে কর্তৃত্বব্যঞ্জক বলে মনে হয়। জানালাগুলোয় উজ্জ্বল রঙ করা। নিখুঁত প্রতিসাম্যের ছাপ পাঁচতলা ওই বাড়িতে। আদিম একটা ভাব আছে এখানকার সব কিছুতে… এমনকী ধাতব রেলিঙের প্রান্ত ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে-থাকা ডাস্টবিনগুলোও ঝকঝকে- তকতকে। কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে বেসমেন্টের দিকে, সেখানে যাওয়ার আলাদা প্রবেশপথ আছে।
হোথর্নকে দেখে মনে হচ্ছে না, খুব একটা সন্তুষ্ট হয়েছে। ডোরবেলের গায়ে এত জোরে থাবা চালাল যে, মনে হলো, ওই জিনিসের সঙ্গে শত্রুতা আছে ওর। সারা রাস্তার কোথাও কেউ নেই। এখানকার বেশিরভাগ বাসাই বোধহয় ফাঁকা। হতে পারে, এখানকার বেশিরভাগ বাসার মালিক বিদেশি ব্যবসায়ীরা। আচ্ছা, এই জায়গার কাছাকাছি কোথায় যেন থাকতেন টনি ব্লেয়ার? এদিক-ওদিক তাকালাম। জায়গাটাকে কেন যেন ঠিক লন্ডন বলে মনে হচ্ছে না আমার।
ক্রুন্সের বাসায় একজন বাটলার আছে। পিনস্ট্রাইপের স্যুট আর ওয়েস্টকোট পরে আছে লোকটা। হাতে গ্লাভস। বয়সে আমার সমান প্রায়। মাথার কালো চুল ব্যাকব্রাশ করা। কেমন একটা গৌরবের ছাপ চেহারায়। সে-ছাপ, যতদূর মনে হলো, চর্চিত
‘গুড আফটারনুন, স্যর। প্লিজ ভিতরে আসুন।’ আমাদের নাম জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করল না লোকটা। তার মানে আমাদের আসার খবর আগেই জানিয়ে রাখা হয়েছিল তাকে।
দুটো রিসিপশন রুমের মাঝখানে বড় একটা হলওয়ে আছে, সেখানে হাজির হলাম আমরা। অবিশ্বাস্য সুন্দর কার্পেট বিছানো আছে মেঝেতে। ছাদ অনেক উঁচু। দেখে মনে হচ্ছে, কারও বাসায় আসিনি, বরং এমন কোনো হোটেলে হাজির হয়েছি, যেখানে কোনো পেয়িং গেস্ট নেই।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে হাজির হলাম উপরতলার ল্যান্ডিঙে। সেখান থেকে লিভিংরুমে। যেখানেই চোখ যায়, আসবাব, ল্যাম্প, আয়না আর চিত্রকর্মের ছড়াছড়ি। সব কিছুই দামি, তারপরও সব কিছুতেই কেমন একটা উদাসীনতার ছাপ। অবহেলায় ফেলে-রাখা কোনো পত্রিকা অথবা কাদার দাগ লেগে থাকা কোনো জুতোর খোঁজে তাকালাম এদিক-ওদিক, কিন্তু সে-রকম কিছু দেখতে পেলাম না। খেয়াল করলাম, লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে আছি, তারপরও এই বাসা একেবারে নীরব। এই বাসা আমাকে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশাল কোনো শবাধারের কথা… বাসার মালিক যেন মারা গেছেন, তবে তার আগে নিজের ঐশ্বর্যের নমুনা রেখে গেছেন যত্রতত্র।
কিছুক্ষণ পর আমাদের সামনে হাজির হলেন রেমন্ড কুন্স। সাদামাটা কাপড় পরে আছেন তিনি। ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক লাগল আমার কাছে। তাঁর বয়স পঞ্চাশের মতো। নীল রঙের ভেলভেটের-জ্যাকেট পরেছেন, ভিতরে রোল-নেকের জার্সি। একটা সোফায় বসে পড়লেন, পায়ের উপর পা তুলে দিয়েছেন। শক্তসমর্থ শরীর তাঁর, চুলগুলো রূপালি, নীল দুই চোখে খেলা করছে কৌতুক। মনে হচ্ছে, আমাদেরকে দেখে সন্তুষ্ট হয়েছেন।
‘বসুন,’ মুখোমুখি আরেকটা সোফা দেখিয়ে দিলেন তিনি। ‘কফি খাবেন?’ আমাদের জবাবের জন্য অপেক্ষা না-করে তাকালেন বাটলারের দিকে। ‘ব্রুস, মেহমানদের জন্য কফি নিয়ে এসো।’
‘হ্যাঁ, স্যর,’ চলে গেল ব্রুস।
বসে পড়লাম আমি আর হোথর্ন।
‘বেচারী ডায়ানার ব্যাপারে কথা বলার জন্য এখানে এসেছেন আপনারা,’ হোথর্নকে কিছু বলার সুযোগ না-দিয়ে নিজেই বলতে শুরু করলেন কুন্স। ‘যা ঘটেছে, সে-ব্যাপারে মনে কতখানি চোট যে পেয়েছি আমি, বলে বোঝাতে পারবো না। গ্লোব থিয়েটারে একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে ডায়ানার সঙ্গে পরিচয় আমার। সেখানেই প্রথম দেখা হয় আমাদের। ওর ছেলে ড্যামিয়েনের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। ছেলেটা খুবই প্রতিভাবান। আমার প্রযোজনায় একটা নাটক বানানো হয়েছিল… দ্য ইম্পর্টেন্স অভ বিইং আর্নেস্ট… সেটাতে কাজ করেছিল সে। ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিল নাটকটা। যা-হোক, পুলিশ যখন বলল খুন করা হয়েছে ডায়ানাকে, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার মনে হয় না এই পৃথিবীতে এমন কেউ আছে, যে ডায়ানার কোনো ক্ষতি করতে চায়। ডায়ানা এমন একজন মানুষ, যারা, যাদের সঙ্গেই পরিচয় হোক না কেন, তাদের ভালো চায়।’
‘যেদিন খুন করা হয়েছে তাঁকে,’ মুখ খুলল হোথর্ন, ‘সেদিন তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ করেছিলেন আপনি। ‘
‘হ্যাঁ… ক্যাফে মুরানোতে। স্টেশন থেকে যখন বেরিয়ে আসছিল সে, তখন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। আমাকে দেখে হাত নেড়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, সব ঠিকই আছে। কিন্তু যখন খেতে বসলাম, টের পেলাম, কিছু-একটা হয়েছে ওর। কেমন যেন মনমরা দেখাচ্ছিল ওকে। কারণ কী জিজ্ঞেস করায় বলল, ওর পোষা বিড়াল মিস্টার টিবসকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। …কী একখানা নাম … মিস্টার টিবস! যা-হোক, চিন্তা করতে মানা করলাম ডায়ানাকে। বললাম, বিড়ালটা হয়তো তাড়া করেছিল কোনো ইঁদুরকে, এবং সে-কাজ করতে গিয়ে বাসার বাইরে চলে গেছে। অথবা অন্য কোনো কারণেও বাইরে গিয়ে থাকতে পারে ওটা। আসল কথা হচ্ছে, যেখানেই যাক না কেন, ফিরে আসবে আবার। কিন্তু আমার কথার তেমন কোনো প্রভাব ডায়ানার উপর পড়ল বলে মনে হয়নি। বেশিক্ষণ থাকতেও পারল না সে। অবশ্য… সেদিন বিকেলে ওর একটা বোর্ডমিটিং ছিল।’
