আন্দ্রিয়ার চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম, কোনো একটা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছে সে, এবং সে-চেষ্টা করতে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে তার। হয়তো ভাবছে, নিজের আরও কিছু কুকীর্তির কথা স্বীকার করবে কি না… সেসব কথা স্বীকার করে নতুন কোনো ঝামেলায় জড়াবে কি না। অথবা হয়তো ভাবছে, মিথ্যা কথা বলে হোথর্নের রাগ আরও বাড়িয়ে দেবে কি না।
শেষপর্যন্ত সুমতি হলো মেয়েটার। উঠে গিয়ে কিচেন ড্রয়ার থেকে বের করল এক তা কাগজ, সেটা নিয়ে ফিরে এল। দিল হোথর্নের হাতে।
ভাঁজ খুলে পড়ল হোথর্ন :
মিসেস ক্যুপার,
আপনি হয়তো ভাবছেন, সহজেই আমার কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। কিন্তু এত সহজে ছাড়ছি না আমি আপনাকে। কসম খেয়ে বলছি, যা বলেছি আপনাকে, সেটা তো কেবল শুরু। আপনার উপর নজর রেখেছি আমি, জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে। যা করেছেন, তার জন্য মূল্য দিতে হবে আপনাকে। বিশ্বাস করুন।
চিঠিটা হাতে লেখা হয়েছে। লেখার শেষে স্বাক্ষর করেনি কেউ। কোনো তারিখ নেই, কোনো ঠিকানা নেই।
চোখ তুলে আন্দ্রিয়ার দিকে তাকাল হোথর্ন। দৃষ্টিতে প্রশ্ন।
‘সপ্তাহ তিনেক আগে ওই বাড়িতে একটা লোক এসেছিল,’ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলতে শুরু করল মেয়েটা। ‘লিভিংরুমে বসেছিল মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে। আমি তখন উপরতলায় বেডরুমে ছিলাম। কিন্তু ওই দু’জনের কথাবার্তার আওয়াজ আমার কানে আসে। লোকটা খুব রেগে গিয়েছিল… চিৎকার করে কথা বলছিল মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে।’
‘কবে?’ জানতে চাইল হোথর্ন। ‘কখন?’
‘বুধবার। দুপুর একটার দিকে।’
‘ওই লোককে কি দেখেছিলেন আপনি?’
‘লোকটা যখন চলে যাচ্ছে তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখেছিলাম তাকে। কিন্তু বৃষ্টি পড়ছিল তখন… ছাতা মেলে রেখেছিল লোকটা। তাই তার চেহারাটা দেখতে পাইনি।’
‘আপনি কি নিশ্চিত ওই মানুষটা একজন পুরুষলোক?’
জবাব দেয়ার আগে কিছুক্ষণ ভাবল আন্দ্রিয়া। ‘আমার তা-ই মনে হয়… হ্যাঁ।’
হাতেধরা কাগজটা মেলে ধরল হোথর্ন। ‘এটার কাহিনি কী?
‘ওটা আমি পেয়েছি মিসেস ক্যুপারের বেডরুমের টেবিল থেকে,’ আন্দ্ৰিয়াকে দেখে মনে হচ্ছে, কুকীর্তির কথা স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছে। তার কথা শুনে হোথর্নের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, ভেবে ত্রিতও বোধ করছে হয়তো। ‘মিসেস ক্যুপার মারা যাওয়ার পর বাড়ির ভিতরে এখানে-সেখানে নজর বুলিয়েছিলাম আমি। তখন এই চিঠি দেখতে পাই।’ একটুখানি থামল, কী যেন ভাবছে। ‘আমার মনে হয় ওই লোকই খুন করেছে মিস্টার টিবসকে। ‘
‘মিস্টার টিবস? কে সে?’
‘মিসেস ক্যুপারের একটা বিড়াল ছিল। বিশাল ধূসর একটা বিড়াল।’ দুই হাত প্রসারিত করে প্রাণীটা-কত-বড়-ছিল দেখাল আন্দ্রিয়া। ‘বৃহস্পতিবার আমাকে ফোন
করেছিলেন মিসেস ক্যুপার। বললেন, ওই বাড়িতে সেদিন যাওয়ার দরকার নেই আমার। কারণ তিনি খুব আপসেট। বললেন, মিস্টার টিবসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
‘চিঠিটা নিলেন কেন আপনি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
হোথর্নের দিকে তাকাল আন্দ্রিয়া। ভাবখানা এমন, আমাকে উপেক্ষা করার অনুমতি চাইছে।
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ইতোমধ্যে ভাঁজ করে ফেলেছে চিঠিটা, তারপর চালান করে দিয়েছে পকেটে।
আমার প্রশ্নের জবাব দিল না আন্দ্রিয়া।
মেয়েটাকে বোধহয় আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই হোথর্নের, তাই উঠে দাঁড়াল সে। ওই অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা।
একটা ট্যাক্সি ডেকে সেটাতে উঠে পড়ল হোথর্ন। ওর পাশে বসলাম আমি!
‘চিঠিটা আন্দ্রিয়া নিয়েছিল,’ বলল হোথর্ন, ‘কারণ সে ভেবেছিল, ওটা কাজে লাগিয়ে কিছু টাকা কামাই করবে। সেদিন যে-লোক দেখা করতে গিয়েছিল মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে… মানে ছাতাওয়ালা লোকটার কথা বলছি… কেন যেন মনে হচ্ছে আমার, ওই লোককে চেনে আন্দ্রিয়া। অথবা হয়তো ভেবেছিল, খুঁজে বের করতে পারবে লোকটাকে। চিঠিটা নিয়ে গিয়ে ওই লোককে দেখানোর ইচ্ছা ছিল মেয়েটার… ব্ল্যাকমেইলিঙের উদ্দেশ্য ছিল। একটা সুযোগ পেয়েছিল সে, সেটা কাজে লাগানোর চিন্তা করছিল।’
শহরে ফিরে চলেছি আমরা। আরও একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা আছে আমাদের। রেমন্ড ক্লুন্স– মঞ্চনাটকের প্রযোজক, মিসেস ক্যুপার যেদিন খুন হলেন সেদিন তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ করেছিলেন।
আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, সময়ের অপচয় করছে হোথর্ন। কারণ আসল খুনির পরিচয় ওর পকেটেই আছে। যে-লোক লিখেছে ওই চিঠি, সে বলেছে, যা করেছেন, তার জন্য মূল্য দিতে হবে আপনাকে। কাজেই সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকার কথা না।
ভেবেছিলাম, আন্দ্রিয়া কুভানেকের সঙ্গে ইন্টারভিউর ব্যাপারে আরও কিছু বলবে হোথর্ন। কিন্তু মুখে তালা দিয়ে রাখল সে। একটু আগে যা বলেছে, তার পর থেকে তন্ময় হয়ে ভাবছে কী যেন। তন্ময় শব্দটা ঠিক হলো না মনে হয়। আমার বলা উচিত ছিল, আত্মচিন্তায় মগ্ন হয়ে গেছে সে।
পাশে-বসা লোকটাকে যেন নতুন করে চিনছি আমি। যখন কোনো কেস নিয়ে কাজ করে না সে, তখন ওর সঙ্গে একটা মরা মানুষের কোনো তফাৎ নেই। সে যে বেঁচে আছে, সেটা বোঝানোর জন্য ওর দরকার খুন… নিদেনপক্ষে সহিংস কোনো অপরাধ।
যা-হোক, একসময় পৌঁছে গেলাম রেমন্ড কুন্সের ঠিকানায়।
আন্দ্রিয়া ক্লুভানেকের সেই অ্যাপার্টমেন্টের সঙ্গে যদি তুলনা করা হয়, তা হলে বলতেই হবে, রেমন্ড ক্রুন্সের আবাসস্থলের সঙ্গে ওই মেয়ের মাথা-গুঁজবার-ঠাঁইয়ের আকাশ-পাতাল ব্যবধান আছে। ক্রুন্সের বাসাটা মার্বেল আর্চের পেছনে, কনোট স্কোয়ারের কাছে। বিল্ডিংটা দেখে হয়তো আশ্চর্য হওয়া উচিত ছিল আমার, কিন্তু হলাম না। মঞ্চনাটকের কোনো প্রযোজকের বাসগৃহ এ-রকম হওয়াই স্বাভাবিক।
