‘বাইরে গিয়েছিলাম আমি। কথাটা ইতোমধ্যেই বলেছি পুলিশকে। কী ঘটেছিল, সেটা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল পুলিশ। তাদেরকে সব কথা বলেছি আমি।’
আন্দ্রিয়ার ইংরেজি উচ্চারণ ভালো না। ওর বাক্যগঠনও অসম্পূর্ণ। তবুও যা বলছে সে, সেটা বুঝে নিলাম। খেয়াল করলাম, সে যত রেগে যাচ্ছে, ওর ইংরেজি তত অসংলগ্ন হয়ে উঠছে।
‘জানি, আন্দ্রিয়া,’ বলল হোথর্ন। ‘পুলিশকে যে-বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেটা পড়েছি আমি। তারপরও সেই লন্ডন থেকে এতদূর এসেছি… শুধু আপনার মুখোমুখি বসে আপনার কাছ থেকে সত্যি কথাটা শুনতে।’
নীরবতা।
ভিতরে ভিতরে চমকে গেছি আমি।
সত্যি কথা?
নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি আন্দ্রিয়ার দিকে।
অনেকক্ষণ পর মেয়েটা বলল, ‘যা বলেছি, সত্যিই বলেছি।’
কিন্তু শুনে মনে হলো না, তেমন একটা জোর দিয়ে বলেছে সে কথাটা। ‘না, বলেননি,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল হোথর্ন। ‘এই দেশে ক’বছর ধরে আছেন?’
‘পাঁচ বছর।’
‘আর ডায়ানা ক্যুপারের বাসায় কাজ করছিলেন বছর দু’-এক?’
‘হ্যাঁ।’
‘সপ্তাহে ক’দিন কাজ করতেন সেখানে?’
‘দু’দিন। বুধবার আর শুক্রবার।‘
‘ছোটখাটো একটা সমস্যায় যে ভুগছিলেন আপনি, সেটা কি কখনও বলেছিলেন মিসেস ক্যুপারকে?
‘আমার কোনো সমস্যা নেই।
মাথা নাড়ল হোথর্ন… এমন ভঙ্গিতে যে, দেখে মনে হলো আন্দ্রিয়ার কথায় মনে চোট পেয়েছে। ‘আপনার অনেক সমস্যা। আপনি আগে থাকতেন হাডার্সফিল্ডে। চুরিচামারি করে বেড়াতেন দোকানে-দোকানে। কতই বা পেতেন ওসব কাজের জন্য? বড়জোর এক শ’ পঞ্চাশ পাউন্ড।’
‘আপনি কিছুই বোঝেন না!’ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আন্দ্রিয়া হোথর্নের দিকে। যে-কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে হোথর্নের উপর।
আমার মনে হচ্ছে, এই জায়গা যদি আরেকটু বড় হতো, তা হলে ভালো হতো।
‘খাওয়ার মতো কিছু নেই আমার!’ অসহ্য কোনো আক্ষেপে ফুঁসছে আন্দ্ৰিয়া। ‘স্বামী নেই। দুটো বাচ্চা… একটার বয়স চার, অন্যটার ছয়। খাওয়ার মতো কিছুই নেই আমাদের এখানে!’
‘আর সে-কারণেই ‘সেইভ দ্য চিলড্রেন’ প্রজেক্ট হাতে নিয়ে এটা-সেটা তুলে নিতেন বিভিন্ন দোকান থেকে, নাকি? যা-হোক, আপনি আসলে সৌভাগ্যবতী… আপনার ‘কন্ডিশনাল ডিসচার্জের’ রায় দেয়ার সময় খোশমেজাজে ছিলেন জাজ।’
‘দুটো বছর মিসেস ক্যুপারের বাসায় কাজ করেছি আমি। আমার বাচ্চাদের দেখভাল করতেন তিনি। কাজেই আমার আর-কিছু চুরি করার দরকার হতো না। গত দুই বছরে সৎ জীবন যাপন করেছি আমি। পরিবারের দেখভাল করেছি।’
‘কিন্তু জেলে যদি যান, তা হলে পরিবারের এই দেখভাল আর করতে হবে না আপনাকে।’ কথাটা আন্দ্রিয়ার মনে ঢুকে যাওয়ার মতো সময় দিল হোথর্ন। তারপর বলল, ‘আমাকে মিথ্যা কথা বলেছেন আপনি। আপনার দুই বাচ্চার জন্য চিন্তা করবেন না… কোনো-না-কোনো প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেবে ওদের, অথবা স্লোভাকিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে ওদেরকে। …আমি শুধু জানতে চাই, কত টাকা নিয়েছেন আপনি।’
‘কীসের টাকা?’
‘মিসেস ক্যুপারের কিচেনে ফ্রিজের উপর একটা টিনের কৌটা আছে। ওটা খুলেছিলাম আমি। ভিতরে কয়েকটা কয়েন ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। যদি বলি, ওই কৌটার ভিতরে টাকা রাখতেন মিসেস ক্যুপার? যদি বলি, তিনি মারা গেছেন… বলা ভালো, তাঁকে খুন করা হয়েছে টের পেয়ে ওই কৌটার ভিতর থেকে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আপনি, তা হলে?’
‘হ্যাঁ, ওই কৌটার ভিতরে টাকা রাখতেন মিসেস ক্যুপার। কিন্তু সে-টাকা আমি নিইনি। চোর নিয়েছে।’
‘না,’ রাগ দেখা দিল হোথর্নের দৃষ্টিতে। মুঠি পাকিয়ে ফেলেছে সিগারেট-ধরা হাতটা। ‘ওই বাড়িতে চোর ঢুকেছিল… সত্যি। বাড়ির এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছে সে… এটাও ঠিক। ব্যাপারটা যেন এ-রকম: সে চেয়েছে, কোথায় কোথায় গেছে ওই বাড়ির, সেটা জানাতে চায় আমাদেরকে। কিন্তু টিনের কৌটাটার কথা আলাদা। জায়গামতোই ছিল ওটা। ঢাকনাটা লাগানো ছিল ঠিকমতো। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি ওটার গায়ে, অথচ পাওয়ার কথা ছিল। কারণ মিসেস ক্যুপার যদি একাই ব্যবহার করে থাকেন ওই কৌটা, তা হলে সেটার গায়ে তাঁর আঙুলের-ছাপ থাকতে বাধ্য। তার মানে এমন কেউ একজন ধরেছিল ওই কৌটা, যে-মানুষটা টিভিতে গোয়েন্দাকাহিনি দেখেছে প্রচুর। যে-মানুষটা জানে, ফিঙ্গারপ্রিন্টের মানে কী। আর সে-কারণেই কিছু-একটা দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে সমস্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট গায়েব করে দিয়েছে সে ওই কৌটা থেকে।’
থামল হোথর্ন। তাকিয়ে আছে আন্দ্রিয়ার দিকে। দেখছে, ওর কথার কী প্রভাব পড়েছে মেয়েটার উপর।
কিছুক্ষণ পর বলল, ‘আমার কী ধারণা, জানেন? কৌটাটা খুলেছিলেন আপনি সেখান থেকে একগাদা নোট বের করে নিয়েছেন। কিন্তু তাড়াহুড়োর কারণে কয়েনগুলো নজরে পড়েনি আপনার, অথবা পড়লেও ওগুলো সরিয়ে ফেলাটা জরুরি মনে করেননি। … ঠিক বলেছি না?’
বিষণ্ণ দৃষ্টিতে হোথর্নের দিকে তাকিয়ে আছে আন্দ্রিয়া। ‘হ্যাঁ, টাকাগুলো সরিয়েছে আমি।’
‘কত?’
‘পঞ্চাশ পাউন্ড।’
‘ঠিক করে বলুন।’
‘এক শ’ ষাট।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘হুঁ, এবার কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে। যা-হোক, আপনি যে পুলিশের কাছে বলেছেন, বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সেটাও ঠিক না। কারণ বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। কাজেই আমার অনুমান, আপনি তখন বাড়ির ভিতরেই ছিলেন। এবার বলুন, তখন আর কী কী করেছিলেন? আর কী কী নিয়েছেন?
