‘কিন্তু আপনি যেসব সম্পর্কের কথা বললেন, রেমন্ড কুন্সের সঙ্গে সেসবের কোনোটাই ছিল না মিসেস ক্যুপারের।’
‘ছিল না জানলেন কী করে? রেমন্ড ক্লন্স তো মিসেস ক্যুপারের প্রেমিকও হতে পারেন?’
‘ছেলের কাছে পাঠানো টেক্সট মেসেজে মিসেস ক্যুপার কী লিখেছিলেন, ভুলে যাচ্ছেন কেন? ক্ষতবিক্ষত ওই ছেলেটাকে দেখে ফেলেছিলেন তিনি, এবং সে- কারণে ভয় লাগছিল তাঁর। …আপনি আসলে কেন শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন, বুঝতে পারছি না।’
‘চলন্ত ট্যাক্সিতে সিগারেট খাওয়া নিষেধ,’ ইন্টারকমে শোনা গেল ড্রাইভারের অভিযোগ।
জবাবে বিশ্রী একটা গালি দিল হোথর্ন। তারপর বলল, ‘আমি পুলিশের একজন অফিসার।’ খোলা জানালা দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, কিন্তু হু-হুঁ বাতাস সে-ধোঁয়া ফিরিয়ে নিয়ে এল ট্যাক্সির ভিতরে। ‘আমি আসলে কাজ শুরু করতে চাইছি এমন কিছু লোককে দিয়ে, যাঁদের সঙ্গে কোনো-না-কোনো সম্পর্ক ছিল মিসেস ক্যুপারের। যাঁদেরকে কোনো-না-কোনোভাবে চিনতেন তিনি।’ তাকাল আমার দিকে। ‘আপনার কোনো সমস্যা আছে?’
‘লন্ডনের এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ানোটা আসলে পাগলামি বলে মনে হচ্ছে আমার। তা-ও আবার আমার পকেটের পয়সায়।’
আর কিছু বলল না হোথৰ্ন।
বিরক্তিকর যাত্রা সব সময়ই দীর্ঘ বলে মনে হয়। সে-রকম একটা যাত্রা শেষ করে আমাদের ট্যাক্সিটা থামল সাউথ অ্যাক্টন এস্টেটের সামনে।
চারপাশে এখন স্ল্যাব ব্লক আর উঁচু উঁচু দালানের সারি। এসব দালান কয়েক দশক ধরে আছে এখানে। লন, গাছ, ফুটপাত ইত্যাদিও আছে আমাদের আশপাশে।
একটা স্কেটবোর্ড পার্কের পাশ দিয়ে হাঁটা ধরলাম আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হলাম একটা আন্ডারপাসে, ঢুকে পড়লাম সেটার ভিতরে। রঙ দিয়ে আজেবাজে কিছু ছবি এঁকে রাখা হয়েছে দু’পাশের দেয়ালে। কোনো কোনো ছবির রঙ চুঁইয়ে পড়েছে পাশের কোনো ছবির উপর
আন্ডারপাসের ভিতরে, ছায়া-ঢাকা একটা জায়গায় বসে আছে জনা বিশেক ছোকরা। তাদের প্রায় সবার পরনে হুডি, সঙ্গে সোয়েটশার্ট। গোমড়া চেহারায় আর সন্দিহান চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। কপাল ভালো… হোথর্ন জানে কোথায় যাচ্ছে সে। ওর কাছাকাছিই আছি আমি।
যেসব দালানের কথা বলেছি একটু আগে, সেগুলোরই একটাতে, দ্বিতীয় তলায় থাকে আন্দ্রিয়া কুভানেক। আসার আগে ফোন করেছিল হোথর্ন, কাজেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করার কথা মেয়েটার। পুলিশের ফাইল পড়ে জেনেছি, মেয়েটার দুটো বাচ্চা আছে। কিন্তু এখন হয়তো বাসায় থাকবে না বাচ্চা দুটো। কারণ ঘড়িতে এখন দুপুর দেড়টা… স্কুলে থাকার কথা তাদের। যা-হোক, আমরা দু’জন হাজির হলাম আন্দ্রিয়ার ফ্ল্যাটে
ফ্ল্যাটটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কিন্তু খুবই ছোট। যে-ক’টা আসবাব দরকার, ঠিক সে-ক’টাই আছে… একটা বেশিও না, একটা কমও না। কিচেন টেবিলের সঙ্গে তিনটা চেয়ার। টিভির সামনে একটা সিঙ্গেল সোফা। বেডরুমের সংখ্যা মাত্র এক। আন্দ্রিয়া তার বাচ্চাদের নিয়ে রাতের বেলায় ঘুমায় কী করে, ভেবে পেলাম না। হতে পারে, তার বাচ্চারা ঘুমায় ওই বিছানায়, আর সে ঘুমিয়ে থাকে সোফার উপর।
কিচেন টেবিলের ধারে বসলাম আমরা। আমাদের মুখোমুখি বসেছে আন্দ্রিয়া। দেয়ালে লাগানো হুকে ঝুলছে কয়েকটা পাত্র আর প্যান। আমাদের মাথা থেকে সেগুলোর দূরত্ব কয়েক ইঞ্চি মাত্র। আমাদেরকে চা বা কফি কোনোটাই অফার করল না আন্দ্রিয়া। ফর্মিকার আচ্ছাদনে আবৃত কিচেন টেবিলের ও-ধারে বসে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দু’জনের দিকে। ছোটখাটো শরীর তার, গায়ের রঙ গাঢ়। সেই ফটোতে বাস্তবজীবনের-কঠোরতার ছাপ যতটা না পড়েছিল চেহারায়, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর দেখাচ্ছে তাকে এখন। একটা টি-শার্ট আর জিন্স পরে আছে। প্যান্টটা ছিঁড়ে গেছে কয়েক জায়গায়। আসলেই ছিঁড়ে গেছে… কারণ যেসব জায়গায় যেভাবে ছেঁড়াফাটা দেখতে পাচ্ছি, সেটা হাল-আমলের ফ্যাশন হতে পারে না।
একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ওর কাছ থেকে আরেকটা সিগারেট চেয়ে নিল আন্দ্রিয়া। আমার চারপাশে এখন তামাকপোড়া ধোঁয়া। ভাবছি, পরোক্ষ ধূমপানজনিত কোনো অসুখে ভুগে মরার আগে এই বই লিখে শেষ করতে পারবো কি না।
আন্দ্রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পেরে হোথর্ন খুব খুশি… অন্তত সে-রকমই মনে হচ্ছে ওকে। পুলিশের কাছে যে-বিবৃতি দিয়েছিল মেয়েটা, যেটা ইতোমধ্যেই লিখে ফেলেছি আমি, সেটা আরেকবার শুনে নিল হোথর্ন ওই মেয়ের কাছ থেকে।
আন্দ্রিয়ার বক্তব্যে তেমন কোনো গরমিল পেলাম না আমি: যেদিন খুন হয়েছেন মিসেস ক্যুপার, সেদিন তাঁর বাসায় গিয়েছিল সে, লাশটা দেখতে পেয়েছে, ঘাবড়ে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাসার বাইরে, খবর দিয়েছে পুলিশে। তারা না-আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে বাসার বাইরেই।
‘তা হলে তো একেবারে কাকভেজা অবস্থা হয়েছিল আপনার,’ বলল হোথর্ন।
‘কী?’ সন্দেহের দৃষ্টি আরও ঘনীভূত হলো আন্দ্রিয়ার চোখে।
‘আপনি যখন লাশটা খুঁজে পেলেন সেদিন, তখন সমানে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি যদি আপনার জায়গায় থাকতাম, তা হলে বাসার বাইরে যেতাম না, বরং গিয়ে ঢুকতাম রান্নাঘরে, এবং সেখানেই অপেক্ষা করতাম। মিসেস ক্যুপারের কিচেনটা চমৎকার। বাইরের ঠাণ্ডা আবহাওয়ার তুলনায় সে-জায়গা অনেক গরম। সবচেয়ে বড় কথা, বাড়ির ভিতরে ফোনও আছে। শুধু শুধু নিজের মোবাইল ব্যবহার করে পুলিশে খবর দিয়েছিলেন আপনি।’
