ইচ্ছে করে কেউকেটা ভঙ্গি দেখিয়ে ফগের পিত্তি জ্বালিয়ে দিতে দিতে সাইকেলের প্যাডালে চাপ দিল কিশোর। যেদিকে যাচ্ছিল, দল বেঁধে সেদিকে রওনা হলো আবার। পেছনে তাকালে দেখতে পেত, চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ফগ। আর শাপ-শাপান্ত করে ওর চোদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে। এটা অবশ্য তাকালে দেখতে পেত না। কারণ এই বিশেষ কাজটা করছে ফগ মনে মনে।
.
১৪.
লাঞ্চের আরও ঘন্টাখানেক বাকি। চকলেট খাওয়ার পর তাই আবার কিশোরদের বাড়িতে ফিরে এল সবাই।
বাগানে ঢুকে ছাউনির দিকে তাকিয়েই থমকে গেল কিশোর।
কি হলো? পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল মুসা।
নীরবে হাত তুলে দেখাল কিশোর। তারপর দৌড় দিল ছাউনির দিকে। হাঁ হয়ে খুলে আছে দরজা। তালা লাগিয়ে গিয়েছিল সে। কজা ভেঙে খোলা হয়েছে। চাচা চাচী বাড়ি নেই। কোথাও গেছে হয়তো বেড়াতে। মিসেস বারজি গেছে বাজারে। এই সুযোগে কাজটা করেছে কেউ।
লোকটা কে, সেটা অনুমান করতে অসুবিধে হলো না কারোরই। নিশ্চয় সেই গালকাটা। ভেতরে ঢুকে দেখে সেটা আরও পরিষ্কার হলো। জিনিসপত্র সব তছনছ হয়ে আছে।
ওই ব্যাটা আবার এসেছিল পুতুলের কাপড়ের খোঁজে, মুসা বলল।
এবার নিশ্চয় নিয়েও গেছে, বলল রবিন।
কথাটা ঠিক। জুতোর বাক্সটা আছে বটে, কিন্তু ভেতরে পোশাকগুলো নেই। খালি করে সব নিয়ে গেছে। যে জিনিস হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল লোকটা, অবশেষে হাতে পেল সেগুলো।
ইস, কেন যে অন্য কোথাও রেখে যাওয়ার কথা মনে হলো না! কেঁদে ফেলবে যেন ফারিহা। ঘরে রেখে গেলেই হত। এখন কি নিয়ে হুবারের কাছে যাব আমরা?
ঘরে রেখে গেলেও আজ নিয়েই যেত লোকটা, কিশোর বলল। গাধার মত বাড়ি খালি ফেলে চকলেট খেতে বেরিয়েছিলাম। দোষটা আমাদেরই। চমৎকার সুযোগ করে দিয়ে গেছি লোকটাকে। কি আর করা। যা গেছে গেছে। এখন অনুশোচনা করে আর লাভ নেই। এসো, ঘরটা গুছিয়ে ফেলি।
কিন্তু আমাদের তদন্তের কি হবে?
সে দেখা যাবে। উপায় একটা বেরিয়ে যাবেই।
জিনিসপত্রগুলো যেখানে যেটা ছিল, গুছিয়ে রাখতে আরম্ভ করল সবাই মিলে। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল ফারিহা, আরি, ভুলেই গিয়েছিলাম।
কাজ থামিয়ে দিয়েছে সবাই।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কি?
রুমালটা! ওটা নিতে পারেনি। আমার পকেটে আছে।
ও, বিশেষ আগ্রহ দেখাল না কিশোর। ওটা দিয়ে আর কোন লাভ হবে না এখন আমাদের। রেখে দাও তোমার কাছেই।
পকেট থেকে রুমালটা বের করে ফেলেছিল ফারিহা, কিশোরের অনাগ্রহ দেখে জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার রেখে দিল পকেটে।
আবার জিনিস গোছানোয় মন দিল ওরা। সবাই খুব মনমরা। তীরে এসে তরী ডোবার অবস্থা। সূত্রগুলো হাতে পেয়েও খোয়াতে হলো।
লাঞ্চের আগে যার যার বাড়ি চলে গেল মুসা, ফারিহা আর রবিন। টিটুকে নিয়ে কিশোর এসে ঘরে ঢুকল। মিসেস বারজি ফিরেছে। কিশোরকে দেখেই বলল, এক ভদ্রলোক তোমাকে ফোন করেছিলেন।
কে?
ক্যাপ্টেন রবার্টসন।
ক্যাপ্টেন! কি বললেন?
বললেন তুমি বাড়ি এলেই যেন জানাই তিনি ফোন করেছিলেন। জরুরী কথা আছে।
সোজা টেলিফোনের দিকে দৌড় দিল কিশোর।
কে, কিশোর? ভেসে এল ক্যাপ্টেনের ভারী গলা। মেসেজটা তাহলে দিয়েছে তোমাকে। তা কেমন আছো?
ভাল, স্যার। কিজন্যে ফোন করেছিলেন?
ফগ একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছে। উদ্ভট সব কথা লিখেছে। তোমার নামেও বিস্তর আজেবাজে কথা লিখেছে। আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটছে গ্রীনহিলসে। কি, বলো তো?
ভেনট্রিলোকুইজম।
কি!
ভেনট্রিলোকুইজম, স্যার। বিদ্যেটার কথা নিশ্চয় জানা আছে আপনার।
তা আছে। কিন্তু তোমার কথা তো কিছু বুঝতে পারছি না।
ইউরিক্লেসের নাম শুনেছেন না, স্যার?সেই যে প্রাচীন গ্রীসে…
কি হয়েছে ইউরিক্লেসের?
ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, স্যার।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরব থেকে ক্যাপ্টেন বললেন, কিশোর, কি আবল-তাবল বকছ! এত বছর পর তাকে খুঁজে পাবে কোথায়? তার কবরের হাড়ও এখন পাওয়া যাবে না।
ওকে নয়, স্যার, অন্য এক ইউরিপ্লেসকে খুঁজছি আমরা। এখনকার মানুষ।
অন্যপাশে হঠাৎ সতর্ক হয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন, তার কথা থেকেই বোঝা গেল। কিশোর, বেরিয়ো না কোথাও। আমি এখুনি আসছি। আর অপরিচিত কেউ এসে যদি ইউরিক্লেসের কথা জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে না।
.
১৫.
ওপাশে লাইন কেটে গেল। বিমূঢ় হয়ে হাতের রিসিভারটার দিকে তাকিয়ে রইল কিশোর। রীতিমত অবাক। ব্যাপার কি? ক্যাপ্টেন কি তাহলে রহস্যটার কথা কিছু জানেন? ইউরিক্লেসকে চেনেন? সাংঘাতিক কোন ব্যাপার আছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। নইলে হুট করে এ ভাবে আসার জন্যে অস্থির হয়ে যেতেন না।
নাক ডলল কিশোর। সেদিনই বিকেলে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল না তার। রহস্যটার কিনারা হয়নি এখনও। তবু ক্যাপ্টেন যখন নিজেই আসতে চাইছেন, কি আর করা।
তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে মুসা আর রবিনকে ফোন করল কিশোর। ক্যাপ্টেনের আসার খবরটা জানিয়ে ওদের আগেভাগেই চলে আসতে বলল।
কিন্তু ওদের আগেই ক্যাপ্টেন চলে এলেন তার সেই বিরাট কালো গাড়িতে চড়ে। সঙ্গে আরেকজন লম্বা লোক। সাদা পোশাক পরা হলেও বুঝতে অসুবিধে হলো না কিশোরের, এই লোক সাধারণ কেউ নন। হয় পুলিসের গোয়েন্দা বিভাগের হোমরা-চোমরা কেউ, নয়তো অন্য কোন ধরনের সিক্রেট সার্ভিসের; সিআইএর লোকও হতে পারে।
