দুটো ফিতেই খুলল ফারিহা। ভাল করে দেখল। খুব সুন্দর। আবার আগের মত জুতোতে বেঁধে রাখতে লাগল। একটার ফিতে বেধে জুতোটা পাশে রেখে আরেকটা বাধছে সে, এই সময় মাটিতে রাখা জুতোটা এসে ওকতে শুরু করল টিটু।
ওর দিকে তাকাল ফারিহা। হেসে জিজ্ঞেস করল, তোর নাক তো খুব কড়া। কার গন্ধ পাচ্ছিস?
বার দুই খুফ খুফ করল টিটু। তারপর মুখে নিয়ে একদৌড়ে চলে গেল ঘরের কোণে। জুতোটাকে ওখানে রেখে বসে পড়ল তার ওপর। যেন বোঝাতে চাইল, এটা এখন আমার।
তোর ওই খেলা বাদ দে তো! কদিন থেকেই শুরু করেছে। যা পায় নিয়ে গিয়ে দখল করে। কাল নিয়েছে আমার একটা রঙিন পেন্সিল। সকালে স্যান্ডেল। এখন জুতো, ধমক দিল কিশোর। আন ওটা। কাজ আছে।
আনল না টিটু। যেমন ছিল, বসে রইল।
হেসে বলল মুসা, কাল রাতে চোর তাড়িয়ে নিজেকে খুব বাহাদর ভাবছে আরকি। কাউকেই আর কেয়ার করে না। ব্যাটা শয়তানের হাড্ডি।
জুতোটা দেখা হয়ে যাওয়ার পরই নিয়েছে টিট, তাই আর ওটা নিয়ে মাথা ঘামাল না কিশোর বাক্স থেকে একটা কোর্ট বের করল। তাতে উঁচু কলারও আছে, বোতামও আছে।
ভালমত পরীক্ষা করে দেখল কিশোর। কোটের ভেতরে-বাইরে তো দেখলই, লাইনিংও বাদ দিল না। কিছুই লুকানো নেই। কোন কিছু ঠেকল না আঙুলে।
কিশোরের দেখা হয়ে গেলে অন্যেরাও দেখল কোটটা। ভাল কাপড়ে তৈরি পোশাকটা প্রায় নতুন। তেমন ব্যবহার করা হয়নি।
যতই দেখছি, ততই অবাক হচ্ছি, কিশোর বলল, কাকে পরানো হত এই পোশাক? চুরিই বা করা হলো কেন এগুলো?
চুরিটা কে করেছে? রবিনের প্রশ্ন। হুবার?
সে করে থাকলে ওগুলো নিয়ে গিয়ে আবার পানিতে ফেলে দেবে কেন? আমাকে খোঁচাচ্ছে আসলে একটা প্রশ্নই-সাধারণ এই জিনিসগুলো এত দামী হয়ে উঠল কেন? এর জবাব পাওয়া গেলেই সমাধান করে ফেলা যাবে এই রহস্যের।…এই যে, নাও, টাইটা দেখো। আর এই যে ক্যাপ।
ওর দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না বলেই বোধহয় সেটা বোঝানোর জন্যে কাছে এসে দাঁড়াল টিটু। এর-ওর গা ঘেষাঘেষি করেও পাত্তা না পেয়ে খুকখুক শুরু করল।
বিরক্ত হয়ে কিশোর বলল, তোর সঙ্গে খেলার সময় এখন কারও নেই। যা তো এখান থেকে। তোকে বললাম পাহারা দিতে, আর তুই করছিস শয়তানী। যা, ভাগ।
মনমরা হয়ে গিয়ে আবার ঘরের কোণে বসে পড়ল টিটু।
ক্যাপটাও দেখা হয়ে গেলে ফারিহা বলল, এই তো শেষ, তাই না? পেলাম না তো কিছুই।
সেকথাই তো ভাবছি, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। এ ভাবে নিরাশ হব ভাবিনি। এক কাজ করা যেতে পারে।
তিন জোড়া চোখ ঘুরে গেল ওর দিকে। কি?
এগুলো নিয়ে হুয়ের কাছে চলে যাব। তাকে জিজ্ঞেস করব, কার জিনিস? এত দামী কেন?
জবাব দেবে? রবিনের প্রশ্ন।
কি জানি!
তারচেয়ে বরং আরেকবার খুঁটিয়ে দেখা যাক; ফারিহা বলল। হয়তো প্রথমবারে আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে।
আরে, দূর! থাবা মারার ভঙ্গিতে হাত নাড়ল মুসা। এতগুলো চোখ, এমন করে দেখলাম, চোখ এড়িয়ে যায় কি করে?
তবে কিশোর তাচ্ছিল্য করল না ফারিহার কথাকে। মন্দ বলনি। যতক্ষণ সন্দেহ না যায়, সন্তুষ্ট না হওয়া যায়, বার বার দেখা উচিত। কখন যে কি জিনিস চোখ এড়িয়ে যাবে, বলা মুশকিল।
সুতরাং আবার প্রথম থেকে দেখা শুরু হলো।
এবং ফারিহার ধারণাই ঠিক। জিনিসটা পাওয়া গেল লাল কোটের উল্টে রাখা হাতার ভাঁজে। খুদে একটা সাদা রুমাল। সে-ই খুঁজে বের করল জিনিসটা। চিৎকার করে উঠল, দেখো দেখো, এমব্রয়ডারি করে ডেইজি ফুল আঁকা!
প্রায় ছোঁ মেরে তার হাত থেকে রুমালটা নিয়ে নিল কিশোর। ফুলের দিকে নজর নেই। ওর চোখ অন্যখানে। ফুলগুলোকে ঘিরে লেখা রয়েছে কতগুলো অক্ষর।
সবগুলো সাজালে একটা নাম হয়ে যায়।
ইউরিক্লেস! কপাল কুঁচকে ফেলেছে মুসা। এ রকম উদ্ভট নাম তো আর শুনিনি কখনও। এ তো মনে হচ্ছে গ্রীক!
আমারও মনে হচ্ছে গ্রীক, রবিন বলল। কিন্তু মিথলজিতে এ রকম কোন নাম আছে বলে তো মনে পড়ছে না।
আমি জানি ওটা কার নাম, উত্তেজিত হয়ে বলল কিশোর। দারুণ একখান সূত্র! ফারিহা, কাজের কাজই করেছ একটা!
.
১৩.
শোনো, গল্প বলার ঢঙে বলল কিশোর, বহুকাল আগে ইউরিক্লেস নামে এক লোক বাস করত গ্রীসে। সেকালে সবাই চিনত তাকে। বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল বিশেষ একটা গুণের জন্যে ভেনট্রিলোকুইজম জানত। অনেক ছাত্র তৈরি করে নিয়েছিল সে। ওরাও একেকজন দক্ষ ভেনট্রিলোকুইস্ট হয়ে ওঠে।
ও, এই ব্যাপার, মুসা বলল। আমি তো ভাবতাম ভেনট্রিলোকুইজম বিদ্যাটা বুঝি আধুনিক। তাহলে এই কারবার। প্রাচীন গ্রীকরা তো দেখি সব ব্যাপারেই ওস্তাদ ছিল।
বিদ্যাটা আধুনিক তো নয়ই, বরং বহু পুরানো। যতদূর জানা যায়, গ্রীকরাই এ বিদ্যার প্রচলন করেছিল। তারপর পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এটা। আফ্রিকার জুল থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চলের এস্কিমোরা পর্যন্ত এ জিনিস প্র্যাকটিস করেছে। কিছুদিন আমিও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। প্র্যাকটিস করেছি। কিন্তু করতে বড় কষ্ট। তা ছাড়া আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম বলে ছেড়ে দিয়েছি।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল ফারিহার, তুমি ভেনট্রিলোকুইজম জানো!
অতি সামান্য, হাসল কিশোর। হঠাৎ ফুলে উঠল তার গাল। ঠোঁট দুটো গোল হয়ে গেল শিস দেয়ার ভঙ্গিতে। পরক্ষণে ঘরের কোণে একটা বেড়াল ডেকে উঠল। কান খাড়া হয়ে গেল টিটুর। সেদিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিল।
