বিকেলের দিকে আকাশের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। মুসা আর রবিনদের বাড়িতে ফোন করে জানল কিশোর, বেরোতে দিচ্ছেন না ওর মায়েরা। সবে জ্বর থেকে না উঠলে হয়তো এভাবে বাধা দিতেন না।
কি আর করবে? মনমরা হয়ে বসে রইল কিশোর।
পুতুলের কাপড়গুলো নিজের পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে খানিকক্ষণ টিভি দেখল। মন বসল না তাতে। বই পড়ার চেষ্টা করল! তাও মন বসাতে পারল না।
সন্ধ্যার পর চাচা-চাচী বেরিয়ে গেলেন। এক বন্ধুর বাড়িতে পার্টি আছে। ফিরতে অনেক রাত হবে।
সকাল সকাল খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল কিশোর।
অনেক রাতে টিটুর চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল।
থামার জন্যে ওকে ধমকানো শুরু করল কিশোর।
কিন্তু থামল না কুকুরটা। দরজার কাছে গিয়ে আরও জোরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।
সন্দেহ হলো কিশোরের। চোর এল না তো?
দরজার দিকে এগোল। পান্নাটা খুলতে না খুলতে একদৌড়ে বেরিয়ে গেল টিটু। নিচ থেকে কে? কে? বলে চিৎকার করে উঠল মিসেস বারজি।
কয়েক সেকেন্ড পর গেটের বাইরে রাস্তায় একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিল। দ্রুত চলে গেল গাড়িটা। জানালা দিয়ে ওটার টেল লাইট দেখতে পেল কিশোর।
সারা বাড়ির আলো জ্বেলে দিল সে। রান্নাঘরের একটা জানালার কাঁচ ভাঙা। ওখান দিয়ে ছিটকানি খুলেই ঘরে ঢুকেছিল কেউ। হুবারের বাড়িতে চোর ঢোকার কথা মনে পড়ল কিশোরের। ঠিক একই ভাবে ওদের ঘরেও ঢুকেছিল লোকটা। কে? কেন?
হঠাৎ পেয়ে গেল জবাবটা। হুবারের বাড়িতে যে জিনিসের জন্যে ঢুকেছিল, ওদের বাড়িতেও সেই একই জিনিসের জন্যে এসেছিল লোকটা।
পুতুলের পোশাক!
নিশ্চয় সেই গালকাটা লোকটা। কিশোর তখন ভেবেছিল চলে গিয়েছে, আসলে যায়নি। নদীর পাড়ে কোথাও লুকিয়ে থেকে দেখেছে ফগ ওগুলো নিয়ে কি করে। সব দেখেছে। তারপর কিশোরের পিছু নিয়ে এসে ওদের বাড়িটা দেখে গেছে। এখন রাত দুপুরে এসে হানা দিয়েছে ওগুলোর জন্যে।
নিশ্চয় কোন মূল্যবান সূত্র লুকিয়ে আছে ওগুলোর মধ্যে। কোন সন্দেহ নেই আর।
অনেক রাতে বাড়ি ফিরলেন চাচা-চাচী।
চোর ঢাকার কথা জোর গলায় জানাল তাদের মিসেস বারজি। পুলিসে খবর দিতে বললেন মেরিচাচী।
রাজি হলেন না রাশেদ পাশা। পুলিস মানেই তো ফগর্যাম্পারকট। তাঁর মতে ওটা একটা হাঁদা। পারে কেবল ঝামেলা বাধাতে আর হই-হট্টগোল করতে। কাজের কাছ কিছুই পারে না। কিছু যখন নিতে পারেনি চোরে, অহেতুক রাত দুপুরে ফগকে খবর দিয়ে আর যন্ত্রণা বাড়ানোর দরকার নেই।
পরদিন সকালে আকাশ ভাল হয়ে গেল। বৃষ্টি নেই। নাস্তা সেরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসে কিশোরদের বাড়িতে হাজির হলো ফারিহা, মুসা আর রবিন।
রাতে চোর আসার কথা ওদের জানাল কিশোর। কেন এসেছিল, কি তার উদ্দেশ্য সেটা নিয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা হলো। কিশোরের সঙ্গে অন্য তিনশনও একমত হলো, গালকাটা লোকটাই এসেছিল, পুতুলের পোশাকের খোঁজে। অতএব আর দেরি না করে জলদি জলদি দেখে ফেলা দরকার কি এমন মূল্যবান জিনিস লুকিয়ে আছে ওগুলোর মধ্যে।
জিনিসগুলো নিয়ে কিশোরদের বাগানের ছাউনিতে ঢুকল সবাই।
টিটুকে পাহারা দিতে বলল কিশোর।
এত কড়াকড়ি কেন? জানতে চাইল ফারিহা।
বলা যায় না, বেড়ার ফাঁকফোকরগুলো দেখতে দেখতে জবাব দিল কিশোর, কাল রাতের লোকটা এসে উঁকি দিয়ে শুনে ফেলতে পারে আমাদের কথা। আমরা কি পেলাম, দেখে ফেলতে পারে।
হেসে ফেলল ফারিহা, এত সতর্কতা! নিজেরদেরকে পাই মনে হচ্ছে আমার। একেবারে পাই হেডকোয়ার্টারের সাবধানতা।
কথা অনেক হয়েছে, অধৈর্য হয়ে উঠল মুসা, এবার আসল কাজটা সেরে ফেলা দরকার। পোশাকগুলোর ভেতরে কি আছে জানার জন্যে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?
এই যে, শুরু করছি, বলে একটা জুতোর বাক্সের ডালা খুলল কিশোর। এর ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে পুতুলের পোশাকগুলো। প্রথমে বের করল নীল রঙের পাজামাটা। বেশ সুন্দর। ওপর দিকে বোম লাগানো।
পকেট-টকেট কিছু নেই। ফারিহার দিকে তাকাল কিশোর, পুতুলের পোশাকের পকেট থাকে না, ফারিহা?
থাকে তো, হাত বাড়াল ফারিহা। দেখি? এটা ছেলে পুতুলের গায়ে মানাবে ভাল।
উল্টেপাল্টে ভাল করে দেখল সে। কিছু পাওয়া গেল না। রবিনের হাতে দিল। ও দেখে মুসাকে দেবে। প্রতিটি জিনিস সবাই মিলে দেখবে। তাতে কোন কিছু থেকে থাকলে চোখ এড়িয়ে যাওয়ার ভাবনা কম।
এরপর একটা লাল বেল্ট বের করল কিশোর। নিজে দেখে ফারিহার হাতে দিল। হাত থেকে হাতে ঘুরতে লাগল জিনিসটা। পাওয়া গেল না কিছু।
এরপর মোজালো দেখা হলো।
পুতুলের নাম কিংবা কোন চিহ্ন দেয়া আছে কিনা দেখল ফারিহা। নেই।
মুসা বলল, পুতুলের কাপড়ে আবার নাম লেখা থাকে নাকি?
থাকবে না কেন? ফারিহা বলল। অনেকেই নাম লিখে রাখে, কিংবা চিহ্ন দিয়ে রাখে, আলাদা করে বোঝার জন্যে। আমিই তো দিই।
মোজাতে পাওয়া গেল না কিছু। জুতোজোড়া বের করল কিশোর।
পুতুলের জন্যে বড়, বলল সে, কিন্তু বাচ্চা ছেলের জন্যে হোট। শক্ত করে বানানো, দেখো। পুতুলের জিনিস মনে হয় না। ফিতেগুলোও আসল। ইচ্ছে করলে বাঁধা যায়।
হয়তো কোন শিশুর জুতোই হবে, রবিন বলল। কোন বামন শিশু। স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে পা ছোট তার।
তা নাহয় হলো, নিজের অজান্তে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল একবার কিশোর। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না এ জিনিসের এত গুরুত্ব হয়ে গেল কেন? কি এমন দামী জিনিস আছে এর মধ্যে যে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দুটো বাড়িতে হানা দিল লোকটা?
