হঠাৎ কি মনে হতে ফিরে তাকাল কিশোর। ধড়াস করে উঠল বুক। চিৎকার করে উঠল, আরি, রবিন গেল কোথায়!
উধাও হয়েছে রবিন। শত চিৎকার করেও তার সাড়া পাওয়া গেল না।
.
০৮.
গেল কোথায়? বিমূঢ় হয়ে গেছে মুসা।
প্রবল বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যে দৃষ্টি চলে ভালমত। কয়েক গজ দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।
ফিরে যাওয়া দরকার, কিশোর বলল। কোন কারণে আমাদের কাছ থেকে পিছিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। কিংবা ক্লান্ত হয়ে গিয়ে কোথাও বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।
বলল বটে, কিন্তু কথাটা সে নিজেও বিশ্বাস করল না।
প্রায় গা ঘেষাঘেঁষি করে ভেজা পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে ফিরে চলল দুজনে। বার বার চিৎকার করে রবিনের নাম ধরে ডাকছে। জানে, ঝড়ের গর্জনের মধ্যে এই চিৎকার রবিনের কানে পৌঁছার সম্ভাবনা খুব কম।
অ্যাই, শঙ্কিত হয়ে বলল মুসা, পা পিছলে পড়েটড়ে যায়নি তো! হাত পা ভেঙে পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে হয়তো কোথাও এখন।
থমকে দাঁড়াল কিশোর। হতে পারে। দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘ একটা মুহূর্ত। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি। কান পেতে শুনতে লাগল কোথাও কিছু শোনা যায় কিনা।
বাতাসের শব্দকে ছাপিয়ে আগে মুসার কানে ঢুকল শব্দটা। অতি মৃদু চিৎকার।
খাইছে! শুনছ!
কিশোরও কান পাতল।
আবার শোনা গেল চিৎকার, মুসা! কিশোর!
পিছলে পড়ার ভয়কে পরোয়া না করে পাহাড়ের কিনারে ছুটে গেল দুজনে। উঁকি দিয়ে নিচে তাকাল। ফুট চারেক নিচে একটা কালো দেহ চোখে পড়ল।
রবিন, কোন সন্দেহ নেই। একটা ঝোপ আঁকড়ে ধরে ঝুলছে। ওদেরকে উঁকি দিতে দেখে প্রায় ককিয়ে উঠল, জলদি করো! গাছের গোড়া উপড়ে আসছে।
ধরে রাখো! মুসা বলল। রবিনকে ধরে তুলে আনার চেষ্টা করল। নাগালই পেল না। দমে গেল সে।
এ ভাবে পারবে না, কিশোর বলল। দাঁড়াও, ব্যবস্থা করছি।
দড়ি বের করল সে। এক মাথা পাথরের সঙ্গে বেঁধে আরেক মাথা ঝুলিয়ে দিল রবিনের নাগালের মধ্যে।
এক হাত বাড়িয়ে থাবা দিয়ে দড়িটা ধরে ফেলল রবিন। একেবারে শেষ মুহূর্তে। সেও দড়ি ধরল, ঝোপের গোড়াটাও উপড়ে এল পাহাড়ের গা থেকে। ধক করে উঠল বুক। একটা হার্টবীট মিস হয়ে গেল তার।
দড়ি ধরে টেনে ওকে ওপরে তুলে আনল মুসা আর কিশোর।
ওপরে উঠে ভেজা মাটিতেই গড়িয়ে পড়ল রবিন। জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে। ভীষণ ক্লান্ত।
ওখানে গেলে কি করে? জানতে চাইল মুসা।
একটু শান্ত হওয়ার পর রবিন বলল, জুতোর ফিতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছিল বলে বসে ছেঁড়া মাথাটা বাধলাম। উঠে দেখি তোমরা নেই। ধরার জন্যে দৌড়াতে শুরু করলাম। এত কিনারে যে চলে গিয়েছিলাম, বুঝতে পারিনি। হঠাৎ একটা পাথর ভেঙে সরে গেল পায়ের নিচ থেকে। পিছলে পড়ে গেলাম। গাছটা কখন কিভাবে ধরেছি বলতে পারব না।
কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার এগিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা। এবার আর কেউ পেছনে পড়ে রইল না। দেয়ালের বেশি কিনারেও গেল না।
আচমকা চিৎকার করে উঠল মুসা, পেয়ে গেছি। খাদ!
হুড়াহুড়ি করে তার দুপাশে চলে এল অন্য দুজন। সামনে গলা বাড়িয়ে তাকাল। পাহাড়ের গায়ে গভীর একটা ক্ষতের মত হয়ে আছে খাদটা।
সাবধানে তিনজনেই পা রাখল ওটাতে। অনেক নিচে আবছাভাবে চোখে পড়ল সৈকত। বড় বড় ঢেউ আছড়ে ভাঙছে তীরে। চওড়া একটা বিরাট ফাটলের মত পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে গিরিখাদ। পথ গেছে তার মধ্যে দিয়েই। নামতে শুরু করল তিনজনে।
সবার আগে নিচে নামল রবিন।
ওই দেখো! গুহা! হাত তুলে চিৎকার করে বলল সে।
কিশোর আর মুসাও দেখল। সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সামান্য দূরে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালে একটা কালো ফোকর।
গুহার দিকে আগে এগোনোর সাহস হলো না মুসার। কোমরে ঝোলানো টর্চ খুলে পা বাড়াল কিশোর। আগে আগে চলল। তার পেছনে এগোল অন্য দুজন।
গুহামুখে দাঁড়িয়ে ভেতরে আলো ফেল কিশোর। তিনজনেই দেখল, গুহা না বলে ওটাকে সুড়ঙ্গ বলা ভাল। কালো কক্ষটার পেছন দিকটা হারিয়ে গেছে ভেতরের ঘন কালো অন্ধকারে।
ইচ্ছে করলে কি আছে ভেতরে এখনই দেখা যায়, কিশোর বলল।
মাথা খারাপ! আঁতকে উঠল মুসা। রাতের বেলা এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে যাব গুহায় ঢুকতে!
গুহার ভেতরে তো আর বৃষ্টি নেই।
তাতে কি? বাইরে তাঁবু পাতব আগুন জ্বালতে হবে। ভিজে একেবারে হাত-পা সিটিয়ে গেছে।
দেখো, গুহায় থাকলে আরামে থাকতে পারতাম…
এখন আমি ঢুকতে পারব না, সাফ মানা করে দিল মুসা।
আগুন জ্বালার লাকড়ি পাবে কোথায়? প্রশ্ন করল রবিন।
তাই তো? একথা তো ভাবেনি। জবাব দিতে পারল না মুসা। আশোঁপাশে গাছপালা আছে, লাকড়ির অভাব হত না, কিন্তু সব ভিজে চুপচুপে।
লাকড়ির যা হোক একটা ব্যবস্থা করো তোমরা, কিশোর বলল, আমি আসছি। গুহায় ঢোকার জন্যে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারল না সে। টর্চ হাতে ঢুকে পড়ল। কয়েক পা এগিয়েই চিৎকার করে উঠল, অ্যাই, দেখে যাও কাণ্ড!
তার চিৎকারে মুসাও সাবধান হবার কথা ভুলে গেল। রবিনের সঙ্গে ছুটে এল।
কি দেখেছে টর্চের আলো নেড়ে দেখাল কিশোর, লাকড়ি! শুকনো?
সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা লাকড়ির স্তূপটা দেখল রবিন। কে রাখল?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না!
আ-আমি জানি…
ভূতে…
তাড়াতাড়ি রবিনের মুখে হাতচাপা দিল মুসা, খবরদার, ওই নাম মুখে এনো না! ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল সে।
