দরজায় টোকা দিল কিশোর।
খুলে দিল একজন বেঁটে লোক। বুড়ো হয়ে গেছে। ভাঁজ পড়া, খসখসে মুখের চামড়া। তিন গোয়েন্দাকে দেখে অবাকই হলো। যেন ওদের মত কাউকে এখানে দেখতে পাবে আশা করেনি।
আপনি রিক ডেলভার? প্রশ্ন করল কিশোর।
মাথা ঝাঁকাল লোকটা। হাসল।
মূসার গাড়িটা দেখিয়ে কিশোর বলল, গাড়িটা রাখলাম। কোন অসুবিধে হবে?
না, অসুবিধে হবে না। ঘুরতে যাবে নাকি? কতক্ষণ লাগবে তোমাদের? ঘণ্টাখানেক?
আসলে কয়েকদিন থাকব ভাবছি। যদি আপনার কোন অসুবিধে না হয়…
গুহা দেখতে আসোনি তো? মুখের ভাব বদলে গেছে বুড়োর। চোখ পিটপিট করে একবার এর দিকে, একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে।
ঠিকই ধরেছেন, গুহা দেখতেই এসেছি।
হাসি চলে গেছে বুড়োর। ভারী গলায় বলল, ভাল চাও তত বাড়ি ফিরে যাও। গুহার অবস্থা ভাল না। খামোকা কেন প্রাণটা খোয়াতে যাবে।
কে, রিক? ঘরের ভেতর থেকে প্রশ্ন করল একটা মহিলাকণ্ঠ, কার সঙ্গে কথা বলছ?
এই তো, কয়েকটা ছেলে, বেড়াতে এসেছে, ফিরে তাকিয়ে জবাব দিল রিক। গুহা দেখতে যেতে চায়।
বলে কি! ভেতর থেকে বেরিয়ে এল গোলগাল এক মহিলা।
এত ভয় পাচ্ছেন কেন আপনারা? জিজ্ঞেস করল কিশোর। কি আছে গুহায়?
আলো আর গুলি! রহস্যময় স্বরে জবাব দিল বুড়ো।
লোকজন দেখেছেন? আছে ভেতরে?
কারও ছায়াও নেই।
তাহলে গুলি করে কারা?
জানি না!
অবাক কাণ্ড!
অবাক বলে অবাক! এক্কেবারে ভূতুড়ে কাণ্ড! খোদাই জানে এ কোন ধরনের ভূত, গুলিও চালায়!
হাঁ হয়ে গেছে মুসা। চট করে তাকাল চারপাশে। গায়ে কাঁটা দিল ওর। মনে হলো, গুহা থেকে বেরিয়ে এই বুঝি ওর ঘাড় মটকাতে এল কোন ভূত।
ওই গুহায় কখনও ঢুকেছেন আপনি, মিস্টার ডেনভার? জানতে চাইল কিশোর।
এত লম্বা নামের দরকার নেই, আমাকে শুধু রিক ডাকলেই চলবে, বুড়ো বলল। জানাল কয়েকদিন আগে নাকি রাতে মাছ ধরতে বেরিয়েছিল। আবহাওয়া ভাল ছিল না। বাতাস আর সেই সঙ্গে বড় বড় ঢেউ। তীর থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখল আলো। বুড়ো বলল, গুহার কাছে দুটো আলো দেখলাম। খানিক পর দুতিনটে গুলির শব্দ। চিৎকার করে উঠল কে যেন।
চিৎকারটা কেমন? আর্তনাদ? মানে কাউকে খুন করা হচ্ছে, এমন?
সে বলে বোঝানো যাবে না। এমন চিৎকার জীবনে শুনিনি আমি। ভয়ঙ্কর!
তারমানে বোঝা যাচ্ছে, বিড়বিড় করল রবিন, ভেতরে কেউ আছে। দোকানদার হ্যারির কাছেও শুনলাম এই গপ্পো। পুলিশকে জানালেই পারেন?
জানানো হয়েছে। পুলিশ এ সব বিশ্বাস করে না। বুড়ো জেলেদের কুসংস্কার বলে হেসে উড়িয়ে দেয়। একটিবার দেখতেও আসেনি গুহাটা।
ভয় দেখিয়ে নিরস্ত করা গেল না তিন গোয়েন্দাকে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, গুহায় যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথটা বলতে পারেন?
কোনভাবেই নিরস্ত করতে না পেরে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল বুড়ো। জেলে। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। তারপর নেমে এল দরজা থেকে। ওদেরকে নিয়ে সৈকত ধরে কিছুদূর চলার পর হাত তুলে পাহাড়ে উঠে যাওয়া রাস্তাটা দেখিয়ে বলল, ওটা ধরে চূড়ায় উঠে যাও। নিচে তাকালে ওপাশে একটা খাদ দেখতে পাবে। ওই খাদ ধরে এগোতে থাকলে পেয়ে যাবে গুহাটা।
গাড়ির কাছে ফিরে এল ওরা। ক্যাম্প করার জিনিসপত্র বের করে কাঁধে তুলে নিল। জেলে দম্পতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা হয়ে গেল পাহাড়ের দিকে।
দূর থেকে যতটা মনে হয়েছিল, তারচেয়ে খাড়া পাহাড়টা। চূড়ায় উঠতে পুরো একটা ঘণ্টা লেগে গেল।
এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল ওপর থেকে। অনেক নিচে সৈকতে জেলেদের ঘরগুলোকে খেলনার মত লাগছে। সাগরকে মনে হচ্ছে বিশাল এক নীল রঙের মেঝে, ঘরের মেঝের মতই সমান।
চুড়ার অন্যপাশে সাগরের দিকটার একেবারে কিনারে গিয়ে নিচে তাকাল রবিন। পাথরের খাড়া দেয়াল নেমে গেছে। নিচে আছড়ে পড়ছে। উত্তাল ঢেউ। শক্ত জাতের কিছু ঝোপঝাড় জন্মে রয়েছে এখানে ওখানে।
সৈকত ধরে হেঁটে গুহায় যাওয়া অসম্ভব, অনুমান করল সে। সাগরের দিক দিয়ে যেতে হলে নৌকায় করে যেতে হবে।
ঝোড়ো বাতাসে ভর করে ভেসে এল মেঘের শুড়গুডু। আকাশের দিকে তাকিয়ে মুসা বলল, জলদি চলো। ঝড় আসছে। এখানে থাকলে মরব।
বড় বড় পাথরের চাঙড়ের মধ্যখান দিয়ে চলে গেছে সরু পায়ে চলা পথ। সেটা ধরে হাঁটতে শুরু করল ওরা। একটু পর পরই সরে গিয়ে নিচে তাকাচ্ছে রবিন। গিরিখাদটা দেখতে পাচ্ছে না। অবিশ্বাস্য দ্রুত মেঘে ঢেকে ফেলছে। আকাশ। অন্ধকার করে ফেলেছে। এর মধ্যে খাদটা চোখে পড়বে কিনা তাতেও সন্দেহ আছে। হয়তো দেখা যাবে হঠাৎ করেই ওটাতে নেমে পড়েছে। ওরা।
মুখে এসে পড়ল বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা। কালো আকাশকে চিরে দিয়ে ছুটাছুটি শুরু করল বিদ্যুতের তীব্র উজ্জ্বল নীলচে-সাদা সাপগুলো। কানফাটা বিকট শব্দে ঘন ঘন বাজ পড়তে লাগল। শুরু হলো ঝমঝম করে মুষলধারে বৃষ্টি।
তা বাড়ছে বাতাসের বেগ। অনেক নিচে পাথুরে দেয়ালে কামানের গর্জন তুলে ভাঙছে ঢেউ। চলতে গিয়ে বার বার হোঁচট খাচ্ছে গোয়েন্দারা। সামনের পথ ঠিকমত চোখে পড়ছে না। ভোতা গোঁ গোঁ শব্দ তুলছে বাতাস, আকাশে বিদ্যুতের চমক, আর চলছে একনাগাড়ে বজ্রপাত।
আগে আগে চলেছে মুসা। মাঝে কিশোর, সবার শেষে রবিন। বৃষ্টি আর বাতাসের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যে মাথা নুইয়ে রেখেছে। বুঝতে পারছে না এই দুর্যোগের মধ্যে আদৌ খুঁজে পাবে কিনা গিরিখাদটা।
