যাবে, যদি উড়তে পার।
না উড়েও হয়ত পারব। এস, চেষ্টা করে দেখি। গাড়িটা—স্কাইলাইটের ঠিক নিচে রয়েছে।
ঠিক! উত্তেজিত হয়ে পড়েছে জামান। চল উঠে দেখি। নাগাল পাই কিনা!
ধীরে, বন্ধু, ধীরে, জামানের হাত চেপে ধরেছে মুসা। এত তাড়াহুড়া কোরো না। জুতোর সুখতলার ঘষায় রঙ ছাল তুলে ফেলবে। গাড়িটার অ্যানটিক মূল্যই খতম হয়ে যাবে।
জুতো খুলে নিল দুজনেই। একটার সঙ্গে আরেকটার ফিতে বেঁধে যার যার জুতো গলায় ঝুলিয়ে নিল। বেয়ে উঠে পড়ল গাড়ির ছাদে। কিন্তু দাঁড়িয়ে উঠে দুহাত টান টান করে তুলে দিয়েও নাগাল পেল না মুসা। আরও ফুটখানেক ওপরে থেকে যায় স্কাইলাইট।
লাফিয়ে ধরার চেষ্টা করব, বলল মুসা। যে করে থোক বেরোতেই হবে এখান থেকে।
লাফ দিল মুসা। আঙুলে ঠেকল স্কাইলাইটের ধাতব কিনারা। আঁকড়ে ধরল। ঠেলে খুলে ফেলতে একটা মুহূর্ত ব্যয় করল। দুহাতে ভর দিয়ে টেনে তুলল। শরীরটা। বেরিয়ে এল ধুলোবালিতে ঢাকা ছাদে। বসে পড়ে একটা হাত বাড়িয়ে দিল নিচে। লাফ দাও, জামান! আমার কব্জি চেপে ধর।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল জামান। নিচে কংক্রীটের মেঝের দিকে তাকাল একবার। তারপর আবার মুখ তুলল। লাফ দিল হঠাৎ। তার আঙুল ছুল মুসার হাত। কিন্তু আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছে না, পিছলে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে জামানের কব্জি ধরে ফেলল মুসা। টেনে তুলে আনল ওপরে।
প্রচণ্ড শক্তি তোমার গায়ে, মুসা! দুঃসাহসীও বটে! গোয়েন্দা হওয়ারই উপযুক্ত তুমি।
হয়েছে হয়েছে, প্রশংসা থামাও, হাত তুলল মুসা। ফুলে ফেঁপে শেষে পেট ফেটেই মরব। গলায় ঝোলানো জুতো নামিয়ে এনে ফিতে খুলতে শুরু করল। জলদি খোল! এখানে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।
বিল্ডিঙের পেছন দিকে ছাতে ওঠার লোহার সিঁড়ি। অন্ধকার একটা সরু গলিতে নেমে এল ওরা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেও। কেউ আসছে কিনা কিংবা লক্ষ্য করছে কিনা, দেখল। কেউ নেই। নির্জন।
পকেট থেকে নীল চক বের করল মুসা। লোহার বড় দরজাটা খুঁজে বের। করল। ওটার নিচে বাঁ দিকে চক দিয়ে বড় বড় কয়েকটা প্রশ্নবোধক আঁকল। আমাদের বিশেষ চিহ্ন, সঙ্গীকে বলল সে। আগামীকাল ফিরে আসব। চিহ্ন দেখেই বুঝতে পারব, কফিনটা কোথায় রয়েছে। চল, মোড়ের ওদিকে গিয়ে এই রাস্তার নাম দেখি। আরে, কে জানি আসছে! চোর-টোর না তো!
গলি ধরে দ্রুত উল্টো দিকে রওনা হয়ে গেল ওরা। মোড় নিয়ে দুটো দোকানের মাঝের অন্ধকার গলি ধরে বেরিয়ে এল অন্য পাশে। কানা গলিই বলা চলে এটাকে। ল্যাম্পপোস্ট নেই। একটা দোকানের দরজার কপালে জ্বলছে ম্লান আলো, তাতে বিশেষ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বুঝতে পারল মুসা, এই অঞ্চলে আগে কখনও আসেনি। একেবারেই অচেনা।
কোথায় এসেছি, যেভাবেই হোক জানা দরকার, বলল মুসা। জামানের হাত ধরে টানল, এস, ওই মোড়টায় চলে যাই। ফলকে নিশ্চয় রাস্তার নাম লেখা আছে।
ফলকটা পাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু নাম পড়ার উপায় নেই। অনেক দূরে ল্যাম্পপোস্ট, আলো ঠিকমত পৌঁছাচ্ছে না এখানে। তাছাড়া কলাকটার ওপৰ্ব কাদা লেপে দিয়েছে বোধহয় কোন দুষ্ট ছেলে।
বদমাশ ছেলেগুলোকে ধরে পেটানো উচিত বিড়বিড় করল মুসা আপনমনেই। আরও কিছু একটা বলতে গিয়েই থেমে গেল।
যে গলি থেকে বেরিয়েছে ওরা ওটার শেষ মাথায় কাঁচ ভাঙার ঝনঝন আওয়াজ উঠল। চেঁচিয়ে উঠল কেউ। ছুটে এল দুটো লোক। ল্যাম্পপোস্টের কাছ থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়িতে গিয়ে ঢুকল। স্টার্ট দিয়ে মুসা আর জামানের পাশ দিয়েই ছুটে বেরিয়ে গেল গাড়িটা।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনে চিৎকার অনলা ওরা। চোর! চোর! বিশালদেহী এক লোক ছুটে আসছে। ছেলেদেরকে দেখেই ঘুসি পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, হারামজাদা, বদমাশেরা! চোর! আমার জানালা ভেঙেছিস! চুরি করেছিস। দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা!
লোকটার চেঁচামেচিতে কয়েকটা বাড়ির দরজা খুলে গেছে। বেরিয়ে এসেছে। আরও কয়েকজন লোক। সবাই ছুটে আসছে।
খপ করে জামানের হাত চেপে ধরুল মুসা। দৌড় দাও! ধরতে পারলে হাড় গুড়ো করে ফেলবে!
ছুটল ওরা। এ-গলি, ও-গলি, এ-রাস্তা, সে-ব্রাতা, এ-বাড়ির পাঁশ, ও দোকানের কোণ পেরিয়ে এসে পড়ল একটা বড় রাস্তায়। পেছনে তখনও তাড়া করে আসছে লোক। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে দুটো কুকুর। হাঁপাচ্ছে মুসা আর জামান। আর বেশিক্ষণ পারবে না। বুকের ভেতর ভীষণ লাফালাফি করছে হৃৎপিণ্ড। তবু থামল না ওরা। ছুটে ঢুকে পড়ল আরেক গলিতে।
অবশেষে তাড়া করে আসা লোকদেরকে হারিয়ে দিল ওরা। ততক্ষণে দম। ফুরিয়ে গেছে একেবারে। ধূপ করে পর্থের ওপরই বসে পড়ল দুজনে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।
খামোকা—দৌড়েছি! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মুসা। আমরা চোর নই, জানালাও ভাঙিনি ওদেরকে সে কথা বুঝিয়ে বললেই হত।
হত না, বলল জামান। চোর বলে কেউ তেড়ে এলে প্রথম কাজ ছুট লাগানো। ঠিকই করেছ। ওরা হয়ত বুঝত শেষ অবধি, কিন্তু ততক্ষণে কিল খেয়ে থেঁতলে যেত আমাদের শরীর। ঠিকই হয়েছে, ছুট লাগিয়েছি।
কিন্তু…কাজটা খারাপ হয়ে গেল, তিক্ত কষ্ঠ মুসার। কোন জায়গা থেকে ছুট লাগিয়েছি, জানি না। কোথায় কোন্দিকে ছুটেছি, তা-ও বলতে পারব না। স্টোর হাউসটা কোথায় সামান্যতম ধারণাও নেই।
