বুঝতেই পারছি, ওর কোন খবর নেই, বলল রবিন। কিশোর, মমির ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সঙ্গে আলোচনা করেছি। বলল, ব্যাপারটা ভেন্ট্রিলো কুইজমের কারসাজি। প্রফেসরের কোন প্রতিবেশীর কাজ।
সেটা আগেই ভেবেছি আমি, খুব একটা উৎসাহ দেখাল না কিশোর। প্রফেসরের বাড়ির কাছাকাছি কোন প্রতিবেশী নেই।
তবু, ভেবে দেখ, ভেবেছিল সাংঘাতিক একটা তথ্য দিয়ে চমকে দেবে। কিশোরকে, হতাশই হল রবিন। হয়ত জাদুঘরের ঠিক বাইরে, কিংবা দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকে লোকটা। ওখান থেকে কফিন লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেয় কথা।…যাক গে, মুসার কি অবস্থা? প্রফেসরের বাড়িতে একবার ফোন করে দেখ না। আমরা চলে আসার পর গিয়েও থাকতে পারে।
তাই করব এখন, বলল কিশোর। আর হ্যাঁ, ভেন্ট্রিলোকুইজম নিয়ে আরও ভাবব। একেবারে বাতিল করে দেয়া যায় না সম্ভাবনাটা এখনই।—গুড নাইট।
রিসিভার নামিয়ে রাখল রবিন। নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। কাপড় ছেড়ে বিছানায় গেল। কিন্তু ঘুম আসছে না। হাজারটা ভাবনা এসে ভিড় করছে মনে। সবচেয়ে বেশি ভাবছে মুসার কথা। কোন বিপদে পড়ল না তো? রা-অরকনের। অভিশাপ তারই ওপর নামল না তো প্রথম…
.
অভিশাপ নামেনি, তবে মস্ত বিপদেই আছে মুসা আর জামান। দুজনে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে ডালা খোলার! কিন্তু এতই শক্ত বাধন, একটুও ঢিল হচ্ছে না।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাকটা তখনও, ইঞ্জিনের শব্দেই বোঝা যাচ্ছে। হঠাৎ থেমে গেল ইঞ্জিনের শব্দ। পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। নিশ্চয় আবার ফিরে আসছে দুই চোর। কেন?
ভাল কথাই মনে করেছ, মেথুর গলা। দিনের বেলা কেউ ঢুকলে এটা চোখে পড়বেই। একটা কফিন পড়ে আছে দেখলে কৌতূহলী হয়ে উঠবে। ক্যানভাস দিয়ে ঢেকে রাখাই ভাল।
সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছি, বলল ওয়েব। ঢাকা দেখলে কেউ ফিরেও তাকাবে না। ভাববে ট্রাকের কোন মাল।
কাম সারছে! ফিসফিস করে বলল মুসা। এতক্ষণ তো বাতাস পেয়েছি, এবার সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে! দম বন্ধ হয়েই মরব! তারচেয়ে, চেঁচিয়ে উঠি! কয়েকটা চড়থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিতেও পারে!
আমিও সে কথাই ভাবছি! বলল জামান।
চেঁচানর জন্যে মুখ খুলেও থেমে গেল মুসা। একটা বিশেষ কথা কানে ঢুকেছে।
.
১২.
ওয়েব, বলছে মেথু। দড়িটা খুলে নাও আগে। কাল দরকার পড়বে।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, বলল ওয়েব। খুলে নিচ্ছি।
দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে রইল মুসা আর জামান। দড়ি খোলার শব্দ শুনল। কফিনের ওপর ক্যানভাস টেনে দেয়ার খসখস আওয়াজ আসছে।
আবার দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল। খানিক পরেই শোনা গেল ইঞ্জিনের শব্দ। চলে গেল ট্রাক।
আরও কয়েক মিনিট অপেক্ষা করল মুসা। তারপর ঠেলা দিল ডালায়। তার সঙ্গে হাত লাগাল জামান।. ডালা খুলে গেল। তবু অন্ধকার। ক্যানভাসে ঢাকা রয়েছে। দাঁড়িয়ে উঠে ঠেলে ক্যানভাস সরিয়ে ফেলল মুসা, জামান বেরিয়ে গেল আগে। তারপর বেরোল সে।
অন্ধকার। মাথার ওপরে স্কাইলাইট। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলো আসছে। ঘরের জিনিসপত্র আবছা চোখে পড়ল ওদের। একটা স্টোররুম। উঁচু ছাদ, কংক্রীটের দেয়াল, কোন জানালা নেই। বড় একটা লোহার দরজা। ধাক্কা দিল। বাইরে থেকে শক্ত করে আটকানো। ঝন ঝন আওয়াজ হল শুধু। খুলল না।
ঘরে কি কি আছে জানার চেষ্টা করল মুসা আর জামান। বেরিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছে। আধো অন্ধকার। ভালমত দেখা যাচ্ছে না। কিছু দেখে কিছু হাতের আন্দাজে খোঁজাখুঁজি চালাল ওরা। প্রথমেই চোখে পড়ল একটা পুরানো মোটরগাড়ি। বোঝা গেল, ওটা একটা প্রাচীন পিয়ার্স-অ্যারো সিডান। ঝরঝরে হয়ে গেছে।
পুরানো মোটরগাড়ি! জামানের কণ্ঠে বিস্ময়। এটা এখানে কেন?
কেউ সংগ্রহ করে রেখেছে হয়ত। উনিশশো বিশ সালের জিনিস হবে। গ্রাহকদের কাছে খুব দামি।
এরপর কিছু পুরানো আসবাবপত্র দেখল। ভারি! সূক্ষ্ম কারুকাজ-আঙুল চালিয়ে দেখে বুঝল। জিনিসগুলো রাখা আছে একটা কাঠের মঞ্চের ওপর।
শুকনো রাখার জন্যে, জামানকে বলল মুসা। জমা করে রাখা হয়েছে।—কিন্তু এগুলো কি?—গাদা করে রাখা?
ছুঁয়ে দেখল জামান। রোল পাকিয়ে জিনিসগুলো একটার ওপর আরেকটা রেখে পিরামিড বানিয়ে ফেলা হয়েছে যেন। কার্পেট! মধ্যপ্রাচ্যের জিনিস! খুবই ভাল, অনেক দামি!
কি করে বুঝলে? মুসা অবাক। ভালমত দেখাই যাচ্ছে না।
আট বছর বয়েস থেকেই কার্পেট ঘাটাঘাটি করছি। এগুলো তো আবছামত দেখা যাচ্ছে। না দেখে শুধু ছুঁয়েই বলে দিতে পারি কোনটা কেমন কার্পেট, কি ধরনের সুতো দিয়ে বানানো, বুনট কেমন। আমাদের কোম্পানির জিনিস নয় এগুলো। তবে দামি। একেকটা দুতিন হাজার ডলারের কম হবে না।
ওরেব্বাবা! নিশ্চয় চুরি করে আনা হয়েছে, বলল মুসা। বাজি ধরে বলতে পারি, এই ঘরের সব জিনিসই চোরাই মাল। ওয়েব আর মেথু, দুই ব্যাটাই পেশাদার চোর। এজন্যেই রা-অরকন আর কফিনটা চুরি করার জন্যে ওদেরকে ডাকা হয়েছে।
হ্যাঁ, তাই হবে, একমত হল জামান। কিন্তু এখন এখান থেকে বেরোই কি করে?
এই যে, আরেকটা দরজা! অন্ধকারে প্রায় ঢাকা পড়ে ছিল ছোট দরজাটা। একটা দেয়াল, বোধহয় অন্য ঘরগুলো থেকে আলাদা করে রেখেছে স্টোররুমটাকে।
হাতল ধরে টান দিল মুসা। খুলল না দরজা। আরেকটা দরজা খুঁজে পেল। ওরা। ওটা বাথরুমের।
মনে হয়, মুসা বলল। ঘরটা তৈরিই হয়েছে চোরাই মাল রাখার জন্যে। দরজাগুলোও তৈরি হয়েছে সে কথা চিন্তা করেই। মেথু আর ওয়েব জানে কি করে ঢুকতে হয়, বেরোতে হয়। কিন্তু আমরা বেরোই কি করে? ওপরের দিকে চেয়ে কি ভাবল। ওখান দিয়ে যাওয়া যাবে! বলল আপনমনেই।
