সব পাইনি, তবে পেয়ে যাব। কবে আবার দেখা হবে জানি না, দোস্ত। তাই তোমার স্মৃতি হিসেবে কিছু দাও আমাকে। তোমাকে আমার সত্যি ভালো লেগেছে।
আমি ঘড়ির চেইন থেকে কম্পাসটা খুলে ড্রাভটকে দিলাম। সে খুব খুশি হলো। আন্তরিকতার সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, বিদায়, কার্নেহান, দোস্তের সাথে হাত মিলাও।
দ্বিতীয় উটে ছিল কার্নেহান। সে-ও আমার সাথে হাত মিলাল। তারপর দুজনে মিলে অদৃশ্য হয়ে গেল ধূলি ধূসরিত পথে। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। ওরা যে ছদ্মবেশ নিয়েছে তাতে ধরা পড়ার ভয় ক্ষীণ। সেরাইতেই এর প্রমাণ পেয়েছি। হয়তো কোনো সন্দেহের উদ্রেক না করেই কার্নেহান এবং ড্রাভট আফগানিস্তানে ঢুকতে পারবে। তবে কোনোভাবে যদি ধরা পড়ে যায় তা হলে ওদের কপালে কঠিন মৃত্যু লেখা আছে।
দিন দশেক পরে আমার স্থানীয় এক বন্ধুর চিঠি পেলাম পেশোয়ার থেকে। সে লিখেছে, এক পাগলা প্রীস্টের কান্ডকারখানায় এখানে দিন কয়েক মানুষজন খুব হাসাহাসি করেছে। এই লোক জপমালা নিয়ে যাচ্ছে বোখারার আমিরের কাছে বিক্রি করতে। সে কাবুলগামী এক ক্যারাভানের সঙ্গী হয়েছে পেশোয়ার থেকে। অবশ্য ব্যবসায়ীরা তাকে সাথী হিসেবে পেয়ে অখুশি নয়। কারণ এরা সবাই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। তাদের ধারণা একজন ধর্মযাজক সাথে থাকলে রাস্তায় বিপদ-আপদ হবে না।
ওরা হয়তো এত দিনে সীমান্ত ছাড়িয়েছে, ভাবলাম আমি। তবে ওদের নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবার সময় হলো না। কারণ ওই সময় ইউরোপের একজন রাজা মারা যাবার কারণে সেই খবর নিয়ে খবরের কাগজের আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
.
সময় কারো জন্যে অপেক্ষা করে না। রাত গড়িয়ে দিন হয়, কালের আবর্তে বদলায় ঋতু। গ্রীষ্ম শেষে শীত আসে, তারপর বসন্ত…এভাবে যায় সময়। চাকরিতে দেখতে দেখতে দুবছর হয়ে গেল আমার। এই সমযের মধ্যে কয়েকজন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলেন, আমার প্রেসের যন্ত্রগুলো আরো জীর্ণ হলো, অফিসের বাগানের গাছগুলো লম্বায় আরো খানিকটা বাড়ল।
একদিন, বেলা তিনটার দিকে অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ছাপা বন্ধ হুকুম দিয়ে অফিসে ঢুকেছি আমি, দেখি একলোক শরীরটা ঝুঁকিয়ে কাঁধের মধ্যে মালা ঢুকিয়ে মৃদু-মৃদু দুলছে। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে চাইল সে, ফিসফিস করে বলল, আমাকে একটা ড্রিঙ্ক দিতে পার? ঈশ্বরের দোহাই, তেষ্টায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
আমি ঘরের বাতি জ্বেলে দিলাম।
আমাকে চিনতে পারছো না? ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল সে, মুখ দিয়ে হাঁপিয়ে ওঠার মতো শব্দ করল। আলোতে এবার তার মুখটা দেখতে পেলাম। মাথার চুল ধূসর, চেহারা ভীষণ বিবর্ণ। চেনা-চেনা লাগল আগন্তুককে, কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম না।
তোমাকে ঠিক চিনতে পারছি না, হুইস্কির গ্লাসটা ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম। তোমার জন্যে কী করতে পারি?
তরল আগুনটা এক ঢোক গিলল সে, এত প্রচণ্ড গরমেও কেন জানি শিউরে উঠল।
আমি চলে এসেছি, বলল সে, আমি রাজা ছিলাম কাফিরিস্তানের আমি এবং ড্রাভট –মুকুট পরা রাজা! এই অফিসে শলা পরামর্শ করেছিলাম আমরা–তুমি ওখানে বসেছিলে, আমাদের হাতে বই দিয়েছ। আমি পিচি পিচি টালিয়াফেরো কার্নেহান, তুমি এখনো এখানেই পড়ে আছ–ওহ্! লর্ড!
এবার আর ওকে চিনতে কষ্ট হলো না। অবাক ভাবটা গোপন করে ওকে সহানুভূতি জানাবার চেষ্টা করলাম।
ঘটনা সত্য, কর্কশ গলায় বলল কার্নেহান, ছেঁড়া তেনায় ব্যান্ডেজ করা পায়ে হাত বোলাচ্ছে। বাইলেলের মতোই সত্য ঘটনা। আমরা রাজা হয়েছিলাম, মাথায় রাজমুকুটও পরেছি-আমি এবং ড্রাভট-বেচারা ড্যান–আহা, বেচারা, কখনো আমার পরামর্শ নিতে চাইত না, শত অনুরোধ। করলেও!
হুইস্কিটা শেষ কর, বললাম আমি। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে সম্ভব হলে পুরো ঘটনা আমাকে খুলে বল। তোমরা সীমান্ত পার হয়েছ জানতাম। ড্রাভট পাগলা গ্রীস্টের ছদ্মবেশ নিয়েছিল, তুমি সেজেছিলে তার চাকর। মনে। আছে?
আমি এখানে পাগল হইনি–তবে হয়তো শ্রীঘই মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটবে। আমার। সব মনে আছে আমার। সব বলব তোমাকে। আমার চোখের দিকে তাকাও। নইলে হয়তো উল্টোপাল্টা বকতে শুরু করব আমি।
আমি ওর দিকে তাকালাম। কার্নেহান একটা হাত রাখল টেবিলের উপর, কব্জিটা ধরলাম আমি। পাখির থাবার মতো কুঁচকে গেছে হাতের চামড়া, উল্টোপিঠে হীরের ছাপের দগদগে, লাল ঘা।
ওদিকে না। আমার চোখের দিকে তাকাও। বলল কার্নেহান।
এ ব্যাপারটা পরে ব্যাখ্যা করব তোমাকে। তবে ঈশ্বরের দোহাই, আমার মাথার গোলমাল করে দিও না। আমরা ওই ক্যারাভানের সাথে রওনা হয়ে যাই, আমি এবং ড্রাভট। সাথের লোকজনদের ভেড়া বানিয়ে রাখার জন্যে নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলাম দুজনে। সেগুলো বেশ কাজেও লেগেছে। ড্রাভট সন্ধ্যাবেলায় মজার মজার গল্প বলে সবাইকে খুব আনন্দ দিত। একবার হাসতে-হাসতে তো ড্রাভটের লম্বা দাড়িতে আগুনই ধরে গিয়েছিল। সে নিয়েও কত হাসাহাসি।
তোমরা তো জগদ্দালক পর্যন্ত গিয়েছিলে, বললাম আমি।
ওখান থেকে কাফিরিস্তানে ঢুকলে কী করে?
না, জগদ্দালকে আমরা যাইনি। ওদিকে রাস্তাঘাট ভালো শুনলেও পরে দেখি উট চলার মতো ভালো নয়। আমরা ক্যারাভান ছেড়ে একা এগোবার সময় ড্রাভটের পরামর্শে স্থানীয় স্ট্রেচ্ছদের ছদ্মবেশ নিই। ড্রাভট বলেছিল কাফিররা পাদ্রী বা ধর্মযাজকের ছদ্মবেশ পছন্দ নাও করতে পারে। আমরা এমনকি মাথাও কামিয়ে ফেলি। ওই দেশটা ছিল পর্বত সঙ্কুল, খাড়া চড়াই উত্রাই পার হতে পারছিল না আমাদের উট দুটো। শেষে উট দুটোকে মেরে ফেলতে হয়। আমরা উটের মাংসও খেয়েছি। শেষে এত অস্ত্র আর গোলাবারুদ নিয়ে কি করব ভেবে যখন দিশা পাচ্ছিলাম না, এমন সময় দেখলাম দুটো লোক চারটে খচ্চর নিয়ে আসছে। ড্রাভট ওদের কাছে গিয়ে বলল, আমার কাছে খচ্চরগুলো বিক্রি করে দাও। তখন একজন বলল, খচ্চর কেনার টাকা যখন তোমাদের আছে, বোঝাই যাচ্ছে তোমরা বেশ ধনী। এই বলে সে ডাকাতি করার চেষ্টায় ড্রাভটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ড্রাভট ওকে ধরে এমন আছাড় দেয়, এক আছাড়েই সে শেষ। বাকি লোকটা সঙ্গীর অমন দশা দেখে চো চো দৌড় দেয়। আমরা তখন খচ্চরের গায়ে অস্ত্রের বোঝা চাপিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে দিই।
