এই যে, এখানে, ম্যাপে বুড়ো আঙুল ঠেকাল ড্রাভট। জগদ্দালকের কাছে, পিচি আর আমি রাস্তাটা ভালো করেই চিনি। রবার্টের সেনাবাহিনীর সঙ্গে গিয়েছিলাম ওখানে। জগদ্দালক থেকে ডানে মোড় নিয়ে ল্যাংমান অঞ্চল দিয়ে এগোতে হবে। তারপর চৌদ্দ-পনেরো হাজার ফুট উঁচু পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। ওখানে নিশ্চয়ই এ সময় খুব ঠান্ডা পড়বে। ম্যাপে দেখলে বোঝা যায় না জায়গাটা কতদূর।
দেশটা সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে। বললাম আমি। নাও, ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের এই লেখাটা পড়।
কার্নেহান লেখাটা পড়ল। বলল, ড্যান, এ দেশে বেশিরভাগই দেখছি চ্ছে। তবে বইতে লিখেছে ইংরেজদের সাথেই ওদের সম্পর্ক রয়েছে।
ঠিক আছে, বলল ড্রাভট, যা জানার মোটামুটি জেনে নিয়েছি। এখন চারটে বাজে। তুমি ইচ্ছে করলে ঘুমিয়ে নিতে পার। ভয় নেই, তোমার কোনকিছু নিয়ে কেটে পড়ব না। কাল সন্ধ্যায় আমরা রওনা হয়ে যাব, ইচ্ছে করলে সেরাইতে এসো। দেখা হবে।
তোমরা আসলে পাগল হয়ে গেছ, বললাম আমি। ভালো চাইলে ফিরে এসো নইলে কপালে সত্যি দুর্গতি আছে তোমাদের।
তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। বলল ড্যান। ইচ্ছে হলে সেরাইতে এসো। না হলে নাই।
ওদের সাথে আর তর্ক করতে মন চাইল না। দুজনকে আমার অফিস রুমে রেখে বাড়ি ফিরে এলাম। খুব ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে হবে।
কুমহারসেন সেরাই হলো বড় একটা বাজার। এখানে উত্তর থেকে পণ্য নিয়ে উট আর ঘোড়ার দল আসে। পন্য খালাস হয়, পূর্ণ হয় সেরাই বাজারে। মধ্য এশিয়ার প্রায় সব জাতের মানুষের মিলন মেলা এ বাজার। তবে বেশিরভাগই ভারতের গ্রামের লোকজন। বলখ আর বোখারা এখানে মিলিত হয় বেঙ্গল এবং বোম্বের সাথে। এমন কোনো জিনিস নেই যা সেরাইতে পাওয়া যায় না। অনেক অদ্ভুত জিনিসও মেলে যা মানুষের কাজে লাগে না। আমি পরদিন বিকেলে এখানে এলাম দেখতে ওরা দুজন সত্যি সেরাইতে এসেছে নাকি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে শুয়ে আছে বাড়িতে।
আমাকে অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। দুই শ্রীমানই ছদ্মবেশ নিয়ে হাজির হয়ে গেল সেরাইতে। একজন সেজেছে ধর্মযাজক, অন্যজন তার ভৃত্য। ছদ্মবেশি ধর্মযাজক অনেকগুলো মাটির খেলনা নিয়ে এসেছে। সেরাই-এর লোকজন তাকে দেখে হাসাহাসি শুরু করে দিল।
এক ঘোড়া ব্যবসায়ী আমাকে বলল, প্রীস্ট আসলে একটা পাগল। কাবুল যাচ্ছে আমিরের কাছে খেলনা বিক্রি করতে। হয় আমির ওকে খাতির করবেন নতুবা কল্লা নামিয়ে দেবেন। লোকটা আজ সকালে এসেছে। এসেই পাগলামী শুরু করে দিয়েছে।
আমি জবাবে কিছুই বললাম না। রাজপুতনার ঘোড়া ব্যবসায়ী ইউসুফ জাই হেঁড়ে গলায় বলল, ওহে, যাজক মশাই, কোত্থেকে এসেছেন আপনি, যাবেনই বা কোথায়?
এসেছি রোয়াম থেকে, হাতে একটা লাঠি বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে জবাব দিল প্রীস্ট। এসেছি অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করে। তবে কোনো কিছুই আমাকে দমাতে পারেনি। যাব উত্তরে আমিরের কাছে। আমাকে কি কেউ সেখানে নিয়ে যেতে পারবে। তা হলে তাকে আমি দোয়া করব। এমন দোয়া করব যাতে তার উটের দল কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়বে না। তার সন্তান কখনো অসুস্থ হবে না। স্ত্রী থাকবে বিশ্বস্ত।
হুজুর, ইউসুফ জাই বলল, দিন কুড়ির মধ্যে একটা ক্যারাভান রওনা হবে পেশোয়ার থেকে কাবুলের পথে। আমার উটের দলও যাবে তাদের সাথে। আপনি ইচ্ছে করলে যেতে পারেন।
আমার এখনই যাওয়া দরকার। হুংকার ছাড়ল প্রীস্ট। আমি আমার ডানাঅলা উটের পিঠে চড়ে এক দিনের মধ্যে পেশোয়ার পৌঁছে যেতে পারি। ওহে হাজার মির খান, চেঁচাল সে তার চাকরকে উদ্দেশ্য করে, উটগুলো বের কর। তবে সবার আগে আমাকে চড়তে দাও।
পশুটা হাঁটু গেড়ে বসল, এক লাফে তার পিঠে উঠল প্রীস্ট, আমার দিকে ঘুরে হাঁক ছাড়ল, ইচ্ছে করলে আপনিও সঙ্গে আসতে পারেন, সাহেব। কিছুটা রাস্তা না হয় এক সাথে গেলাম। আপনাকে এমন এক কবচ দেব যা আপনাকে কাফিরিস্তানের রাজা বানিয়ে দেবে।
ভণ্ড প্রীস্ট আর কী করে দেখার আগ্রহ নিয়ে ওর সাথে উঠের পিঠে চড়ে বসলাম। সেই থেকে বেরিয়ে একটা খোলা রাস্তায় এসে বাহনের রাশ টেনে ধরল প্রীস্ট।
বুদ্ধিটা কেমন বের করেছি, বল তো? বলল সে ইংরেজিতে। কার্নেহান ওদের ভাষা জানে না। তাই ওকে আমার চাকর বানিয়ে দিয়েছি। আমরা এরপর একটা ক্যারাভান ধরব পেশোয়ারের, জগদ্দালক পর্যন্ত যাব, তারপর ঘোড়া বা গাধা যা-ই পাই, ওতে চড়ে ঢুকে পড়ব কাফিরিস্তানে। আমিরের জন্যে জিনিস নিয়ে যাচ্ছি বটে। একবার বস্তাগুলোয় হাত বুলিয়েই দেখ না।
আমি বস্তায় হাত দিতেই মার্টিনির একটা বাট ঠেকল, তারপর একটা, তারপর আরো একটা।
মোট বিশটা বন্দুক, গর্বের সাথে বলল ড্রাভট।
লাটিম আর মাটির পুতুলের নিচে লুকিয়ে প্রচুর গোলাবারুদও নিয়ে যাচ্ছি।
একবার এই জিনিস নিয়ে ধরা পড়লে তোমাদের কিন্তু খবর হয়ে যাবে, বললাম আমি। পাঠানদের কাছে একটা মার্টিনির মূল্য তাদের নিজের ওজনের সমান রুপোর মতো।
শোন, বহু কষ্টে যোগাড় করা পনেরো শ রুপী এই উট দুটোর পেছনে ব্যয় করেছি, বলল ড্রাভট। কাজেই সহজে ধরা পড়ছি না। আমরা খাইবার গিরিপথ ধরে যাব রেগুলার ক্যারাভানের সাথে। একজন গরিব প্রীস্টকে কে সন্দেহ করবে বা ঘাটতে আসবে?
যা যা চেয়েছিল সব পেয়েছ? জানতে চাইলাম আমি।
