এ পর্যন্ত বলে কার্নেহান বিরতি দিল। আমি ওকে আরেক গ্লাস হুইস্কি। ঢেলে দিলাম। জানতে চাইলাম ও দেশের প্রকৃতির কথা তার কিছু মনে আছে কি না।
যতটুকু মনে আছে বলছি, শুরু করল কার্নেহান। তবে আমার মাথাটা তেমন কাজ করছে না। ওরা আমার মাথায় পেরেক ঢুকিয়ে দিয়েছিল, বোঝাতে ড্রাভটের মৃত্যু আরও কত ভয়ঙ্কর ছিল। দেশটার চারদিকে ছিল পাহাড়, লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করত, ছিল নিঃসঙ্গচারী। আমরা একটার পর একটা পাহাড় পাড়ি দিতে থাকি। জোরে কথা বলার সাহসও ছিল না। তখন ছিল শীতকাল। ভয় হত পাহাড় ধসিয়ে কখন হিমবাহ নেমে আসে গায়ের ওপর। কিন্তু বেপরোয়া ড্রাভট চুপ করে থাকার পাত্র নয়। সে বলত, একজন রাজাকে চুপ করে থাকা মানায় না। তাকে অবশ্যই গান গাইতে হবে। সে খালি খচ্চরের পাছায় লাথি মারত আর ক্রমাগত পথ চলত। অমন ভীষণ-ঠান্ডার মধ্যেও কোথাও থামেনি সে। ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রমে খচ্চরগুলোর অবস্থা মরো-মরো হয়ে যায়। আমরা পাহাড় ঘেরা একটা উপত্যকায় ঢোকার পরে খচ্চরগুলো মেরে ফেলি। তবে ওগুলোকে দিয়ে উদরপূর্তির উপায় ছিল না। ওদিকে এত জিনিসপত্র নিয়ে কীভাবে পথ চলবে ভেবে না পেয়ে অস্ত্রশস্ত্র ভরা বাক্সের ওপরেই বসে থাকি, আগডুম বাগডুম চিন্তা করতে থাকি।
এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। দেখলাম জনা দশেক লোক, হাতে তীর ধনুক, দৌড়ে আসছে উপত্যকা দিয়ে। লোকগুলোর চুলের রঙ হলুদ, সুঠাম শরীর। তাদেরকে ধাওয়া করছে কমপক্ষে বিশ জনের একটা দল। ড্রাভট বলল সে দশ জনের দলটার পক্ষ নেবে। তারপর দুহাতে দুই রাইফেল নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে গুলি করতে লাগল। গুলি করে একজনকে ফেলে দিল ড্রাভট। তারপর একের পর এক ওদের গুলি করতে লাগলাম দু জনে মিলে। ওদের বেশিরভাগ গুলি খেয়ে মারা গেল, বাকিরা পালাল প্রাণ ভয়ে। আমাদের রণংদেহী মূর্তি দেখে দশ জনের ওই দলটাও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাদের দিকে এগোতে তারা আমাদের লক্ষ করে তীর ছুঁড়তে লাগল। ড্রাভট তখন ওদের মাথার ওপরে শূন্যে গুলি ছুঁড়ল। ভয় পেয়ে সবাই শুয়ে পড়ল মাটিতে। ড্রাভট ওদেরকে লাথি মেরে দাঁড় করাল। তারপর সবার সাথে হাত মিলিয়ে বুঝিয়ে দিল আমরা ওদের শত্রু নই, বন্ধু। ওদের হাতে গোলাবারুদের বাক্সগুলো তুলে দিল ড্রাভট বহন করার জন্যে, এমনভাবে নির্দেশ দিল যেন ইতোমধ্যে রাজা বনে গেছে সে।
বাক্সগুলো নিয়ে ওরা উপত্যকা ধরে পাহাড়ের ওপরে একটা পাইনের বনে ঢুকল, ওখানে পাথরের তৈরি বড়-বড় বেশ কয়েকটা মূর্তি।
ওই দশ জনের দলে সবচে বলিষ্ঠ এবং লম্বা লোকটির নাম ছিল ইমব্রা, সে দলপতি। ইব্রা নিজের নাকের সাথে ড্রাভটের নাক ঘষে আনুগত্য প্রকাশ করল। এরপর তারা ড্রাভটের জন্য খাবার নিয়ে এল। কিন্তু ওদের দেয়া প্রত্যেকের খাবার সে প্রত্যাখ্যান করল। শেষে গ্রাম থেকে যখন ধর্মযাজক এবং মোড়ল খাবার নিয়ে এল, ড্রাভট সেই খাবারটা খেল। ওরা আমাদের বোধহয় দেবতাটেবতা কিছু ভেবেছিল। মনে করেছে আকাশ। থেকে ছিটকে পড়েছি।
বুঝলাম সবই, বললাম আমি। তা রাজা হলে কী করে?
আমি রাজা হইনি, বলল কার্নেহান। রাজা হয়েছিল ড্রাভট। ড্রাভটের মাথায় সোনার মুকুট খুব মানিয়ে গিয়েছিল। সে প্রতিদিন সকালে ইমব্রাকে সাথে নিয়ে বসে থাকত, গ্রামবাসী এসে তাকে পুজো করত। এটা ছিল ড্রাভটের আদেশ। একবার একদল দস্যু গ্রাম আক্রমণ করে। আমরা এমনভাবে গুলি ছুঁড়তে শুরু করি যে ওরা পালাবার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। এভাবে একের পর এক গ্রামে আমরা আমাদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকি। গ্রামে কোনো সমস্যা হলেই গ্রামবাসী সমাধানের জন্য আসত। ড্রাভটের কাছে। ড্রাভট সব সমস্যার সুন্দর সমাধান করে দিত। সে একাই ছিল বিচারপতি। ড্রাভট বলত তার আদেশ না মানলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। অশিক্ষিত গ্রামবাসী আমাদের ভয়ে তাই সব সময় থর থর করে কাঁপত।
আমরা এক-এক করে অনেকগুলো গ্রামে ভয়-ভীতি দেখিয়ে এবং নানা কৌশল খাঁটিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকি। একবার বরফ ঢাকা এক গ্রামে লোকজন কেউ ছিল না, কয়েকজন পাহারাদার ছাড়া। ওরা আমাদেরকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমরা ওদের আরও ভয় পাইয়ে দিতে গুলি করি। তারপর পাশের গ্রামে চলে যাই।
ওই গ্রামের গ্রাম প্রধান প্রথমে বীরত্ব দেখাতে চাইলেও পরে আমাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়। আমরা কিছু গ্রামবাসীকে ড্রিল, মার্চপাস্ট ইত্যাদিও শিখিয়েছিলাম। বেশিরভাগ লোকজন আমাদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। এদিকে আমাদের সাম্রাজ্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেতেই থাকে।
আমরা শেষের দিকে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলাম। কয়েকটি গ্রাম শাসন করত ড্রাভট, আমি করতাম বাকিগুলো। তবে আমার একার পক্ষে এই বিশাল রাজ্য শাসন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি ড্রাভটকে আমার সমস্যার কথা লিখে জানাই, বলি সে যেন এই রাজ্যভার গ্রহণ করে। তারপর আমি প্রথম উপত্যকায় ফিরে যাই প্রীস্টরা কী করছে দেখতে। ওই গ্রামের নাম ছিল এরহেব। এরহেবের প্রীস্টরা কাজ কাম ভালোই করছিল। তবে তারা অভিযোগ করল, পাশের গ্রাম থেকে নাকি মাঝে-মাঝে রাতের বেলা তীর ছুঁড়ে মারা হয়। আমি ঐ গ্রামে ঢুকে পরপর চার রাউন্ড ফায়ার করে এলাম। সাবধান করে দিলাম যাতে আর কেউ কেরানি দেখানোর সাহস না পায়।
